সার্বক্ষণিক নাক থেকে রক্তক্ষরণ বা অব্যাহত মূত্রক্ষরণ রোগী (মা‘যূর) একই কাপড়ে একাধিক ওয়াক্ত নামাজ পড়তে পারবেন কি না? তারাবি ও ফরজে ইমামতি করতে পারবে কি না? এবং প্রতিষ্ঠানে জামাতে নামায পড়তে পারবে কি না?

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 7613
Questioner: mdmusfikur.rahman
Question Asked: 30 Oct 2026, 02:52 PM
Reviewed & Published: 30 Oct 2026, 03:28 PM
Views: 18
Tokens: 7,993
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুয়ালাইকুম
প্রশ্ন
সার্বক্ষণিক নাক থেকে রক্তক্ষরণ রোগী অথবা অব্যাহত মূত্রক্ষরন রোগী একই কাপড় দিয়ে(ধৌত করা ছাড়া) পাঁচ ওয়াক্ত বা তার চেয়ে বেশি ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে পারবে কিনা? অর্থাৎ এমন রোগীর তো প্রতি ওয়াক্তেই নামাজে নাজাসাত লেগে থাকে।সুতরাং প্রতি ওয়াক্তেই পবিত্র কাপড় দিয়ে নামাজ শুরু করা শর্ত কিনা।(হানাফী মাযহাব অনুযায়ী)

১) এমন ব্যক্তি যদি হাফেজ হয় কোরআন শরীফের ইয়াদ রাখার জন্য তারাবি নামাজের ইমামতি করতে পারবে কিনা?
২) যদি এমন হয় কোন মজলিসে এই রোগী ব্যতীত অন্য কারো কিরাত সহিহ নাই তাহলে এই ব্যক্তি ফরজ নামাজের ইমামতি করতে পারবে কিনা?
৩)স্বাভাবিক অবস্থায় ইমামতি করতে পারবে কিনা?
৪) যদি এই ব্যক্তি কোন প্রতিষ্ঠানে জড়িত থাকে সেখানে মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ পড়া বাধ্যতামূলক হয় কিন্তু সে রুমে বসে নামাজ পড়তে পারে মাঝেমধ্যে এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানিক কারণে জামাতে যাবে কিনা কারণ প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন পর পর দায়িত্বশীল পরিবর্তন হওয়ার কারণে দায়িত্বশীল বারবার এটি জানিয়ে নামাজের সময় রুমে থাকার অনুমতি নেওয়া যাচ্ছে না
বিস্তারিত জানার অনুরোধ

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

সার্বক্ষণিক নাক থেকে রক্তক্ষরণ বা অব্যাহত মূত্রক্ষরণের মতো জটিলতায় আক্রান্ত রোগী ফিকহে হানাফীর পরিভাষায় 'মা'যূর' (معذور - ওজরবিশিষ্ট ব্যক্তি) হিসেবে গণ্য হন। এমন রোগীর সালাত (নামাজ), পরিধেয় কাপড়ের পবিত্রতা, ইমামতি এবং জামাআতে উপস্থিতি সংক্রান্ত মাসআলাসমূহের হানাফী ফিকহ ও প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্ট শরঈ সমাধান নিচে তুলে ধরা হলো:


মূল প্রশ্ন: একই কাপড় দিয়ে (ধৌত করা ছাড়া) একাধিক ওয়াক্তের নামায আদায় করা যাবে কি?

উত্তর: মা'যূর ব্যক্তির পরিধেয় কাপড়ে ক্রমাগত রক্ত বা প্রস্রাব নির্গত হয়ে নাজাসাত (নাপাকী) লেগে থাকলে কাপড়ের হুকুম নিম্নরূপ:

১. যদি সালাতের সময়টুকু নাপাক হওয়া ছাড়া কাটানো অসম্ভব হয়: যদি রোগী কাপড় ধৌত করার পর বা পরিবর্তন করার পর সালাত শেষ করার আগেই পুনরায় কাপড় নাপাক হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে (অর্থাৎ অনবরত ঝরতেই থাকে এবং পবিত্র কাপড় পরে সালাত শেষ করা সম্ভব নয়), তবে উক্ত কাপড়ে এক দিরহামের চেয়ে বেশি পরিমাণ নাপাকী লেগে থাকা সত্ত্বেও কাপড় না ধুয়ে বা না বদলে ঐ একই কাপড়ে পাঁচ ওয়াক্ত বা তার চেয়ে বেশি ওয়াক্তের সালাত আদায় করা সম্পূর্ণ জায়েয। প্রতি ওয়াক্তে কাপড় ধোয়া বা পরিবর্তন করা ফরয/শর্ত নয়। ২. যদি সালাতের সময়টুকু নাপাক হওয়া ছাড়া কাটানো সম্ভব হয়: পক্ষান্তরে, যদি এমন সুযোগ থাকে যে কাপড় ধুলে বা পরিবর্তন করলে সালাত আদায় করার পুরো সময়টুকু আর নাপাক হবে না (যেমন: নির্গমন সাময়িক বন্ধ থাকে বা প্যাড/টিস্যু বদলে নিলে পুরো সালাত পবিত্র কাপড়ে আদায় করা সম্ভব হয়), তবে সে ক্ষেত্রে কাপড়ে এক দিরহামের বেশি নাপাকী থাকলে তা ধৌত করা বা পবিত্র কাপড় পরে সালাত আদায় করা আবশ্যক।

সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):

  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১২৩ (অধ্যায়: তাহারাত, ৭ম পরিচ্ছেদ: 'নাজাসাত ও তার আহকাম / মা'যূরের কাপড়ের মাসাইল' — মা'যূর ব্যক্তির কাপড়ে রক্ত বা পেশাব লাগলে এবং ধুয়ে সালাত শেষ করার পূর্বে পুনরায় নাপাক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে ধোয়া ব্যতিরেকেই সালাত আদায় জায়েয হওয়ার ফতোয়া)।
  • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩৮৫–৩৮৬ (অধ্যায়: 'অপারেশনের রোগী ও মা'যূরের পবিত্রতার বিধান / মা'যূরের পরিধেয় কাপড়ের ফিকহী বিচার')।

১. মা'যূর হাফেজ ব্যক্তি কুরআন ইয়াদ রাখার জন্য তারাবীহ সালাতের ইমামতি করতে পারবে কি?

উত্তর: সুস্থ (যারা মা'যূর নন এমন) মুক্তাদীদের পেছনে রেখে মা'যূর ব্যক্তির জন্য তারাবীহ বা অন্য কোনো সালাতের ইমামতি করা শরী'আতের দৃষ্টিতে নাজায়েয ও বাতিল।

শরঈ কারণ ও সমাধান:

  • শরঈ মূলনীতি: ফিকহে হানাফী অনুযায়ী মুক্তাদীর সালাত ও পবিত্রতা ইমামের চেয়ে শক্তিশালী বা সমান হতে হয়। মা'যূর ব্যক্তির অযু ও পবিত্রতা ওজরী (দুর্বল), পক্ষান্তরে সুস্থ ব্যক্তির অযু আসল (শক্তিশালী)। তাই মা'যূর ব্যক্তি সুস্থ মুক্তাদীদের ইমাম হতে পারেন না।
  • কুরআন ইয়াদ রাখার উপায়: তিনি কুরআন শরীফ ইয়াদ রাখার উদ্দেশ্যে একাকী ঘরে তারাবীহ পড়তে পারেন কিংবা সকল মুক্তাদী যদি একই ধরনের মা'যূর হন, তবে কেবল মা'যূরদের নিয়ে আলাদা জামাআত করে তারাবীহ পড়াতে পারবেন। তবে সাধারণ সুস্থ মুসল্লিদের তারাবীহ পড়াতে পারবেন না।

সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):

  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৮৩–৮৫ (অধ্যায়: সালাত, ৫ম পরিচ্ছেদ: 'ইমামতের বিবরণ — মা'যূর ব্যক্তির ইমামতি সুস্থ ব্যক্তিদের পেছনে নাজায়েয হওয়ার মাসআলা')।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (৬ষ্ঠ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৩২ (অধ্যায়: 'বাবুল ইমামাহ — ওজরবিশিষ্ট ব্যক্তির ইমামতি ও সুস্থ মুক্তাদীর এক্তেদা নাজায়েয হওয়ার ফতোয়া')।
  • দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৬৫ (অধ্যায়: 'ইমামতের শর্তাবলী — মা'যূরের পেছনে সুস্থ ব্যক্তির সালাত অসিদ্ধ হওয়া')।

২. কোনো মজলিসে এই রোগী ব্যতীত অন্য কারো ক্বিরাআত সহীহ না থাকলে ফরয সালাতের ইমামতি করতে পারবে কি?

উত্তর: না, উক্ত মজলিসেও মা'যূর ব্যক্তি সুস্থ ব্যক্তিদের ফরয সালাতের ইমামতি করতে পারবেন না।

শরঈ কারণ ও করণীয়: অন্য কারো ক্বিরাআত নিখুঁত না হলেও, যে ব্যক্তি মা'যূর নন কিন্তু সালাতের ফরয পরিমাণ ন্যূনতম ক্বিরাআত (যেমন: সূরা ফাতিহা ও ৩টি ছোট আয়াত) বিশুদ্ধভাবে পড়তে পারেন, তাকেই ইমাম বানাতে হবে। আর যদি অন্য কেউ ন্যূনতম ফরয ক্বিরাআতও পড়তে না পারেন, তবে সকলেই যার যার সালাত একাকী (ইনফিরাদীভাবে) আদায় করে নেবেন। তবুও মা'যূর ব্যক্তি সুস্থ ব্যক্তিদের ইমাম হতে পারবেন না।

সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):

  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৮৪ (অধ্যায়: সালাত, 'ইমামতের শর্তাবলী — ক্বিরাআতে শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও ওজরবিশিষ্ট ব্যক্তি ওজরহীন সুস্থ ব্যক্তির ইমাম হতে না পারা')।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (৬ষ্ঠ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৩২–২৩৩ (অধ্যায়: 'বাবুল ইমামাহ / মা'যূরের ইমামতি')।

৩. স্বাভাবিক অবস্থায় মা'যূর ব্যক্তি ইমামতি করতে পারবে কি?

উত্তর: না, সাধারণ বা স্বাভাবিক অবস্থায় সুস্থ মুক্তাদীদের জন্য মা'যূর ব্যক্তির ইমামতি করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও মাকরূহে তাহরীমী। (এর বিবরণ ১ ও ২ নং প্রশ্নের উত্তরের অনুরূপ)।


৪. প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা ও রুমে সালাত আদায়ের ফিকহী বিধান:

উত্তর: মা'যূর ব্যক্তির ক্ষেত্রে জামাআতে উপস্থিতি ও মসজিদে গমনের বিষয়ে ফিকহী সিদ্ধান্ত নির্ভর করে মসজিদ অপবিত্র হওয়ার ঝুঁকির ওপর:

১. যদি রক্ত বা পেশাব গড়িয়ে পড়ে মসজিদ অপবিত্র হওয়ার ভয় থাকে: যদি অনবরত নিঃসরণের কারণে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত বা পেশাব গড়িয়ে পড়ে মসজিদে বা কার্পেটে লাগার আশঙ্কা থাকে, তবে সে ব্যক্তির জন্য মসজিদে যাওয়া এবং জামাআতে শরিক হওয়া শরী'আতের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও হারাম। তার জন্য নিজের রুমে/কক্ষে একা সালাত আদায় করা ওয়াজিব। ২. যদি মসজিদ অপবিত্র হওয়ার আশঙ্কা না থাকে (যেমন: প্যাড/টিস্যু/ক্যাথেটার দিয়ে আটকানো থাকে): সে ক্ষেত্রে তিনি মসজিদে গিয়ে সাধারণ কাতারে একা একাকী সালাত আদায় করতে পারবেন (ইমামতি করা ছাড়া)। ৩. প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ও প্রশাসনিক করণীয়: যেহেতু শরী'আতের দৃষ্টিতে আপনার জন্য ওজরের কারণে রুমে সালাত আদায় করা সম্পূর্ণ বৈধ (বরং রক্ত গড়ালে রুমে পড়াই ওয়াজিব), তাই বারবার মৌখিক অনুমতি নেওয়ার ঝামেলা এড়াতে প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা দায়িত্বরত কর্মকর্তার কাছে আপনার শারীরিক অসুস্থতা ও ফিকহী ওজরের বিষয়টি জানিয়ে একটি লিখিত আবেদন বা মেডিকেল সার্টিফিকেট জমা দিয়ে স্থায়ী লিখিত অনুমতি নিয়ে রাখা উচিত।

সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):

  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩২২ এবং ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৪২–৩৪৩ (অধ্যায়: 'মসজিদের আদাব — যে রোগীর রক্ত বা পেশাব গড়িয়ে মসজিদ অপবিত্র হওয়ার ভয় থাকে তার জন্য মসজিদে প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়া')।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৫শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৯২–১৯৪ (অধ্যায়: 'বাব আদাবিল মসজিদ — নাপাক রক্ত বা পেশাব নিয়ে মসজিদে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা')।
  • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৫০–৫২ এবং ৯০–৯২ (অধ্যায়: 'মা'যূর ব্যক্তির জামাআতে উপস্থিতি ও ওজরের বিবরণ')।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.