সিএনজি বা ব্যবসায় টাকা বিনিয়োগ করে মাসিক নির্দিষ্ট টাকা নেওয়া কি সুদ? ই

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7606
Questioner: Nahiyan Nabu
Question Asked: 30 Oct 2026, 11:17 AM
Reviewed & Published: 30 Oct 2026, 02:24 PM
Views: 33
Tokens: 4,685
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম
আমার স্বামী একজনকে একটা সিএনজি কেনার জন্য ১লক্ষ টাকা দেয় দেয়ার সময় কথা হয় যে সে এই সিএনজি থেকে যা লাভ করবে তার থেকে প্রতি মাসে কিছু টাকা উনাকে দিবে এখন সে প্রতি মাসে ১৫০০টাকা করে দেয় কিছুদিন আগে তার ছেলে অসুস্থ হয় তাই অই মাসে কোনো টাকা আমার স্বামী নেয়নি উনি বলে যে লাভের অংশীদার হলে লসের ও হবো। এখন আবার উনার আরেক বন্ধুকে ফলের ব্যাবসা করার ৫০হাজার টাকা দিবে বলতেছে এর থেকে যা লাভ হবে প্রতি মাসে কিছু টাকা যেন উনাকে দেয়
এখন আমার প্রশ্ন হলো এই টাকা টা নেয়া কি সুদ হচ্ছে?

Answer

وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ

সংক্ষিপ্ত উত্তর

না, এটা সুদ নয় — বরং এটা মুদারাবা (مضاربة) বা শিরকাতের (অংশীদারিত্বের) ভিত্তিতে বৈধ লাভ-বণ্টন। তবে শর্ত হলো: লাভের অংশ শতকরা হারে (percentage) নির্ধারিত হতে হবে, নির্দিষ্ট টাকার অঙ্কে (fixed amount) নয়। আপনার স্বামীর বর্ণিত পদ্ধতিতে (প্রতি মাসে ১৫০০ টাকা নির্দিষ্ট) কিছু গরমিল আছে, যা নিচে বিস্তারিত বলা হলো।


বিস্তারিত আলোচনা

১. সুদ ও মুদারাবার মৌলিক পার্থক্য

সুদের মূল ভিত্তি হলো—টাকা দিয়ে টাকা (অথবা নির্দিষ্ট পরিমাণ) বেশি ফেরত নেওয়া, যেখানে ঝুঁকি (risk) ও মুনাফার ওপর কোনো অংশীদারিত্ব নেই। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" — (সূরা বাকারা: ২৭৫)

আর মুদারাবা হলো—এক পক্ষ পুঁজি দেবে, অপর পক্ষ শ্রম ও ব্যবস্থাপনা দেবে, এবং লাভ হবে উভয়ের মধ্যে চুক্তিকৃত অনুপাতে বিভক্ত। এতে লাভ-লোকসানের ঝুঁকি উভয়েই বহন করে। এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। ইমাম তিরমিযী (রহ.) বর্ণনা করেন, রাসূল ﷺ বলেছেন:

ثَلَاثٌ فِيهِنَّ الْبَرَكَةُ: الْبَيْعُ إِلَى أَجَلٍ، وَالْمُقَارَضَةُ، وَخَلْطُ الْبُرِّ بِالشَّعِيرِ لِلْبَيْتِ لَا لِلْبَيْعِ "তিনটি বিষয়ে বরকত রয়েছে: নির্দিষ্ট মেয়াদে বাকিতে বিক্রয়, মুদারাবা (মুকারাদা), এবং ঘরের জন্য গম ও যব মিশ্রিত করা (বিক্রয়ের জন্য নয়)।" — (সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১২৫৯; ইবনে মাজাহ: ২২৮৯)

২. হানাফী ফিকহের দলিল

আল-হিদায়া-তে ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী (রহ.) বলেন:

"المضاربة مشروعة... لأن النبي صلى الله عليه وسلم عامل أهل خيبر بشطر ما يخرج من ثمر أو زرع" "মুদারাবা শরীয়তসম্মত... কারণ নবী ﷺ খায়বারবাসীদের সাথে ফলের ও ফসলের অর্ধেকের শর্তে মুআমালা করেছেন।" — (আল-হিদায়া, কিতাবুল মুদারাবা)

রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) বলেন:

"الربح إنما يستحق بالشرط، فلو شرطا شيئًا معلومًا من الربح صح" "মুনাফা শর্তের ভিত্তিতেই প্রাপ্য; সুতরাং উভয়ে যদি লাভের একটি নির্দিষ্ট অনুপাত শর্ত করে, তবে তা বৈধ।" — (রাদ্দুল মুহতার, ৫/৩৮৫)

ফাতাওয়া আলমগীরী-তে আছে:

"ولو قال: خذ هذا المال مضاربة والربح بيننا نصفان، جاز" "যদি বলে: এই মাল মুদারাবায় নাও, লাভ আমাদের মধ্যে অর্ধেক-অর্ধেক, তবে তা জায়েয।" — (ফাতাওয়া আলমগীরী, কিতাবুল মুদারাবা)

৩. আপনার প্রশ্নের প্রয়োগ

প্রথম ঘটনা (সিএনজি):

  • আপনার স্বামী ১ লক্ষ টাকা দিয়েছেন, বিনিময়ে মাসিক লাভের অংশ নিচ্ছেন — এটি মূলত মুদারাবা।
  • সুদ নয়, কারণ এখানে মূলধন ফেরতের সাথে নির্দিষ্ট বাড়তি শর্ত করা হয়নি; বরং লাভের ওপর নির্ভরশীল।
  • তবে "প্রতি মাসে ১৫০০ টাকা" — এভাবে নির্দিষ্ট অঙ্ক নির্ধারণ করা মুদারাবার শর্ত পরিপন্থী। মুদারাবায় লাভের অংশ শতকরা হারে (যেমন: লাভের ৩০% বা ৫০%) নির্ধারিত হতে হবে। নির্দিষ্ট টাকা নির্ধারণ করলে তা অনেক সময় "সুদ" বা "নিশ্চিত মুনাফা" (guaranteed return)-এর সাদৃশ্য পায়, যা নাজায়েয।
  • সমাধান: চুক্তি পুনর্গঠন করুন — "প্রতি মাসে লাভের অমুক শতাংশ" এভাবে নির্ধারণ করুন। বাস্তবে যা ১৫০০ টাকা আসছে, সেটাই লাভের একটি অংশ হিসেবে গণ্য হবে, কিন্তু চুক্তিতে শতাংশ লিখতে হবে।

দ্বিতীয় ঘটনা (ফলের ব্যবসা):

  • একই নীতি প্রযোজ্য। ৫০ হাজার টাকা দিয়ে লাভের অংশ নেওয়া বৈধ, কিন্তু শতাংশে নির্ধারণ করতে হবে, নির্দিষ্ট টাকায় নয়।

৪. "লাভের অংশীদার হলে লসেরও হবো" — এই কথার বিধান

এই কথাটি সঠিক। মুদারাবায় মূলধনদাতা (রাব্বুল মাল) মূলধনের ক্ষতির ঝুঁকি বহন করেন, আর শ্রমদাতা (মুদারিব) তার শ্রমের ক্ষতি বহন করেন। ইমাম সারাখসী (রহ.) আল-মাবসূত-এ বলেন:

"الوضيعة على المال، والربح على ما شرطا" "ক্ষতি মূলধনের ওপর, আর লাভ তাদের শর্ত অনুযায়ী।" — (আল-মাবসূত, ২২/২৩)

তবে লোকসানের ভয়ে লাভ না দেওয়া বা ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা জায়েয নয়। যদি সত্যিই লস হয়, তবে সেই মাসে লাভ শূন্য হবে — এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু "ছেলে অসুস্থ" এ ধরনের ব্যক্তিগত কারণে লাভ আটকে রাখা শরীয়তসম্মত নয়; এটি আমানতের খিয়ানত।

৫. ব্যবহারিক পরামর্শ

  1. চুক্তিপত্র লিখুন — তাতে স্পষ্ট করুন: মূলধন কত, লাভের শতকরা হার কত, লাভ-ক্ষতির বণ্টন কীভাবে হবে, হিসাব কে রাখবে, কখন লাভ বিতরণ হবে।
  2. প্রতি মাসে হিসাব নিন — লাভের প্রকৃত পরিমাণ যাচাই করে শতাংশ অনুযায়ী ভাগ করুন।
  3. নির্দিষ্ট টাকা (১৫০০) চুক্তিতে লিখবেন না — এটি "নিশ্চিত মুনাফা" হয়ে যায়, যা সুদের সাদৃশ্য তৈরি করে।
  4. লোকসানের ক্ষেত্রে — মূলধনদাতা ক্ষতি বহন করবেন, শ্রমদাতা তার শ্রমের ক্ষতি বহন করবেন; তবে শ্রমদাতা যদি অবহেলা বা চুক্তিভঙ্গ করে, তবে তার দায় হবে।

উপসংহার

আপনার স্বামীর এই লেনদেন সুদ নয়, বরং মুদারাবা — যা ইসলামে বৈধ। তবে "প্রতি মাসে ১৫০০ টাকা" এভাবে নির্দিষ্ট অঙ্ক নির্ধারণ করা শরীয়তসম্মত পদ্ধতি নয়; লাভের অংশ শতকরা হারে নির্ধারণ করা আবশ্যক। চুক্তি সংশোধন করে নিলে ইনশাআল্লাহ সম্পূর্ণ হালাল ও বরকতময় হবে।

وَاللهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.