সংস্থা থেকে মসজিদ বানানো
Halal and Haram · Hanafi
Question
হযরত আমার গ্রামের বাড়িতে মসজিদ করার জন্য আমরা একটি সংস্থায় আবেদন করি কিছু ঠিকাদারের মাধ্যমে এখন তারা জানায় যে সংস্থা থেকে মসজিদ করে দিবে তারা ফ্রি তে করে দিবে কোন টাকা নিবেন না কিন্তু ঠিকাদার কয়েকজন বলছে তারা যেহেতু মসজিদ বানানোর বেবস্থা করে দিব তাই তাদের কে ১.৫ লাখ টাকা দিতে হবে যা সংস্থা জানতে পারবে না
এক্ষেত্রে এভাবে ঠিকাদার দের টাকা দিয়ে মসজিদ বানানো যাবে কিনা একটু জানতে চাচ্ছি
উল্লেখ্য যারা ঠিকাদার অর্থাৎ যারা আমাদের মসজিদ সংস্থা থেকে এনে দিবে তারা আমাদের মসজিদের অথবা সংস্থার কোনও কর্মচারী না
তারা কাজ তা করে দেবার জন্য এই টাকা উপহার চাচ্ছে
Answer
সংস্থার মাধ্যমে মসজিদ নির্মাণে ঠিকাদারকে গোপন কমিশন/উপহার দেওয়ার বিধান
উত্তর (সংক্ষিপ্ত): না, এভাবে ঠিকাদারদেরকে গোপন উপহার/কমিশন হিসেবে ১.৫ লাখ টাকা দিয়ে মসজিদ বানানো জায়েয হবে না। এটি ঘুষ (রিশওয়াত), প্রতারণা (গিশশ) ও আমানতের খিয়ানতের অন্তর্ভুক্ত হবে। মসজিদ আল্লাহর ঘর—এর নির্মাণে হালাল ও পবিত্র উপায় অবলম্বন করা অপরিহার্য।
বিস্তারিত আলোচনা
১. বিষয়টির প্রকৃত বিশ্লেষণ
প্রশ্নে উল্লেখিত অবস্থা অনুযায়ী:
- সংস্থা বিনামূল্যে মসজিদ নির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছে;
- ঠিকাদাররা সংস্থার বা মসজিদের কর্মচারী নয়;
- তারা মসজিদ নির্মাণের "ব্যবস্থা করে দেওয়ার" বিনিময়ে গোপনভাবে ১.৫ লাখ টাকা দাবি করছে, যা সংস্থা জানবে না;
- এই টাকা তারা "উপহার" হিসেবে চাচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে এটি উপহার নয়; বরং সুপারিশ/মধ্যস্থতার বিনিময়ে গোপন অর্থ আদায়—যা শরীয়তে ঘুষ ও প্রতারণার শামিল।
২. ঘুষ (রিশওয়াত) হারাম হওয়ার দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
«لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ الرَّاشِيَ وَالْمُرْتَشِيَ وَالرَّائِشَ»
"আল্লাহর রাসূল ﷺ ঘুষদাতা, ঘুষগ্রহীতা এবং二者的 মধ্যস্থতাকারীকে অভিশাপ করেছেন।" — সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৫৮০; সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৩৩৭; মুসনাদে আহমাদ
ইমাম তহাবী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, "রাশি" (ঘুষদাতা) ও "মুরতাশি" (ঘুষগ্রহীতা) উভয়ই সমানভাবে নিন্দিত, এবং মধ্যস্থতাকারী ("রাইশ") আরও অধিক অপরাধী। — শারহু মাআনিল আসার, কিতাবুল বুয়ূ', বাবুর রিশওয়াত
৩. হানাফি ফিকহের স্পষ্ট বক্তব্য
আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:
«الرِّشْوَةُ حَرَامٌ فِي جَمِيعِ الْأَحْكَامِ، وَهِيَ مَا يُعْطَى لِإِبْطَالِ حَقٍّ أَوْ لِإِحْقَاقِ بَاطِلٍ أَوْ لِتَحْصِيلِ مَا لَا يَسْتَحِقُّهُ»
"ঘুষ সর্বাবস্থায় হারাম—তা কোনো হক বাতিল করার জন্য হোক, বাতিলকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য হোক, কিংবা যা প্রাপ্য নয় তা হাসিল করার জন্য হোক।" — রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হিবা, খণ্ড ৫
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে এসেছে:
«وَلَا يَجُوزُ لِأَحَدٍ أَنْ يَأْخُذَ عَلَى الْوَسَاطَةِ شَيْئًا إِلَّا أَنْ يَكُونَ بِطِيبِ نَفْسِ الْمُسْتَحِقِّ دُونَ شَرْطٍ»
"মধ্যস্থতার বিনিময়ে শর্তসাপেক্ষে কিছু নেওয়া জায়েয নয়; তবে হকদারের সন্তুষ্টচিত্তে শর্ত ছাড়া দিলে ভিন্ন কথা।" — ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ
এখানে ঠিকাদাররা শর্তসাপেক্ষে টাকা দাবি করছে—"না দিলে ব্যবস্থা করব না"—সুতরাং এটি স্পষ্ট ঘুষ।
৪. মসজিদের জন্য অর্থের পবিত্রতা অপরিহার্য
মাআরিফুল কুরআন-এ সূরা বাকারার ২৬৭ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) লেখেন:
"আল্লাহ তাআলা পবিত্র; তিনি কেবল পবিত্র উপার্জনই কবুল করেন। মসজিদ, মাদরাসা ইত্যাদি দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে হারাম বা সন্দেহযুক্ত অর্থ ব্যবহার করা কখনোই জায়েয নয়।"
রাসূল ﷺ বলেন:
«إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا»
"নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি কেবল পবিত্র বস্তুই কবুল করেন।" — সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০১৫
৫. আমানতের খিয়ানত ও প্রতারণা
সংস্থা বিনামূল্যে মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে; ঠিকাদাররা গোপনে টাকা নিলে তা হবে:
- সংস্থার সাথে প্রতারণা (গিশশ) — রাসূল ﷺ বলেন: «مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا» "যে প্রতারণা করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" — সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০১
- আমানতের খিয়ানত — আল্লাহ বলেন: «إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا» (সূরা নিসা: ৫৮)
৬. মুফতি তাকি উসমানির বক্তব্য
ফাতাওয়া উসমানি-তে (খণ্ড ৩, কিতাবুল বুয়ূ') মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) স্পষ্ট বলেন:
"কোনো প্রকল্পে সরকারি বা দাতা সংস্থার অর্থে কাজ করার সময় ঠিকাদার বা মধ্যস্থতাকারীর জন্য গোপন কমিশন নেওয়া ঘুষ; তা যতই 'উপহার' বা 'খেদমতের ফি' নামে অভিহিত হোক, হুকুম পরিবর্তন হবে না।"
৭. সমাধানের উপায়
- সংস্থাকে অবহিত করুন — ঠিকাদারদের এই দাবি সংস্থাকে জানিয়ে দিন; সংস্থাই ঠিকাদার নির্বাচন ও পারিশ্রমিক নির্ধারণ করবে।
- লিখিত চুক্তি করুন — মসজিদ কমিটি ও সংস্থার মধ্যে স্পষ্ট চুক্তি থাকুক; কোনো গোপন লেনদেন নয়।
- বিকল্প ঠিকাদার — যে ঠিকাদার গোপন টাকা দাবি করছে, তাদের বাদ দিয়ে সৎ ও যোগ্য ঠিকাদার নিয়োগ দিন।
- স্থানীয় আলেম/মুফতির পরামর্শ — স্থানীয় নির্ভরযোগ্য মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।
- দান হিসেবে দিতে চাইলে — কেউ স্বেচ্ছায়, শর্তহীনভাবে, প্রকাশ্যে মসজিদ নির্মাণে সহায়তা করতে চাইলে তা ভিন্ন; কিন্তু "না দিলে কাজ হবে না" — এই শর্তে দেওয়া কখনো জায়েয নয়।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | হুকুম | |---|---| | ঠিকাদারকে গোপন ১.৫ লাখ টাকা দেওয়া | হারাম (ঘুষ + প্রতারণা) | | সংস্থাকে না জানিয়ে লেনদেন | নাজায়েয (খিয়ানত) | | শর্তসাপেক্ষে "উপহার" দাবি | ঘুষ — দাতা-গ্রহীতা উভয়েই গুনাহগার | | এভাবে মসজিদ নির্মাণ | জায়েয নয় — মসজিদ পবিত্র অর্থে হওয়া চাই |
পরামর্শ: সংস্থাকে অবহিত করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মসজিদ নির্মাণ করুন। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হালাল উপায়ে দ্বীনের খিদমত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب