নাপাক কাপড় পবিত্রকরণের সহজ ও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি — ট্রাউজারের কমর, ইলাস্টিক, ফিতা, জিন্স ও জার্সি থেকে নাপাকি দূর করার পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাই?
Taharah Purity · Hanafi
Question
আবার কিছু গেঞ্জি (যেমন জার্সি) বা প্যান্ট (যেমন জিন্সের প্যান্ট) এরকম থাকে।
আবার কমড়ের অংশে যে ফিতা ব্যবহার করা হয়(যা প্রয়োজনে খুলে ফেলা যায়), তা-ও কিছুটা এরকমই(অর্থাৎ ঠিকমতো নিংড়ানো অসম্ভব মনে হয়)। ফলে কাপড় পুরোটা নিংড়ে নিলেও এতে পানি থেকে যাওয়ার কথা।
এগুলোর বিধান কী হবে? কীভাবে পাক করবো?
অতিরিক্ত প্রশ্ন-1: a)স্বাভাবিক কাপড় অর্ধেক অর্ধেক করে নিংড়ালে কি হবে? কারণ একপাশ নিংড়ানোর পর আরেক পাশ নিংড়ালে কিছু পানি আবার প্রথমে নিংড়ানো পাশের দিকে চলে আশে।
b) যদি নিংড়ানোর কাজ শেষের দিকে হয় এবং ভালোভাবে নিংড়ানোর জন্য কেউ অর্ধেক অর্ধেক অংশ করে চিপে (কিন্তু এরপরও পানি "প্রথমে নিংড়ানো অংশ"-এর দিকে যাওয়ার কথা), তাহলে বিধান কী হবে? কীভাবে পাক করবো?
2) নাপাক কাপড় ধোয়ার সময় কাপড়ে/শরীরে কাপড় ধোয়া পানির ছিটা লাগলে কী নাপাক হয়ে যাবে(স্বাভাবিক ধোয়ার সময় হোক বা পবিত্রকরণের উদ্দেশ্যে ধোয়ার সময় হোক)? কাপড়ে থাকা নাপাকি এমন যার চিহ্ন প্রকাশ পায় না(যেমন নাপাক পানিতে ধোয়ার ফলে নাপাক হয়ে যাওয়া কাপড়)।
Answer
কাপড় পবিত্রকরণ সম্পর্কিত মাসআলা
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আপনার জিজ্ঞাসিত তিনটি প্রশ্নের ফিকহে হানাফী ও প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট শরঈ সমাধান নিচে তুলে ধরা হলো:
সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ:
১. নিংড়ানো দুঃসাধ্য বা অসম্ভব এমন কাপড়ের পাক করার নিয়ম:
- সহজতম পদ্ধতি (প্রবহমান পানি): কল বা ট্যাপের প্রবহমান পানির নিচে ধরে অথবা উপর থেকে প্রচুর পানি ঢেলে ধুয়ে দিলে কোনো প্রকার নিংড়ানো বা শুকানোর শর্ত ছাড়াই কাপড়টি সরাসরি শতভাগ পাক হয়ে যাবে।
- সাধারণ বালতিতে ধোয়ার পদ্ধতি: ৩ বার ধুতে হবে এবং প্রতিবার নিংড়ানোর পরিবর্তে ঝুলিয়ে রেখে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়া বন্ধ হওয়া পর্যন্ত শুকাতে/ঝরাতে হবে। ৩য় বার ফোঁটা পড়া বন্ধ হলে কাপড়টি পাক হয়ে যাবে।
২. অর্ধেক অর্ধেক করে নিংড়ানো (অতিরিক্ত প্রশ্ন-১):
- খণ্ড খণ্ড বা অর্ধেক অর্ধেক করে নিংড়ানো সম্পূর্ণ জায়েয ও সংগত। ৩য় বার ধোয়ার পর নিজের সাধ্য অনুযায়ী (প্রবল ধারণা বা গালিবে যন হওয়া পর্যন্ত) নিংড়ালে, একপাশের পানি অন্যপাশে কিছুটা গেলেও কাপড় নাপাক থাকবে না; পুরো কাপড় পাক হয়ে যাবে।
৩. কাপড় ধোয়ার পানির ছিটা লাগার বিধান (অতিরিক্ত প্রশ্ন-২):
- নাপাক কাপড় ১ম বা ২য় বার ধোয়ার সময়ের স্পষ্ট বড় পানির ছিটা লাগলে যে স্থানে লেগেছে সে স্থান নাপাক হবে। তবে ধোয়ার সময় শরীর বা কাপড়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে যে অতি সূক্ষ্ম ছিটকা পড়ে (যা থেকে বেঁচে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য দুঃসাধ্য), তা ফিকহের বিচারে 'উমূমে বালওয়া' (ব্যাপক সাধারণ সমস্যা) হিসেবে শরীআতে ক্ষমাযোগ্য (মাফ)।
বিস্তারিত ফিকহী সমাধান ও কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
১. নিংড়ানো দুঃসাধ্য বা অসম্ভব কাপড়ের পাক করার নিয়ম:
ফিকহে হানাফীর সুনির্দিষ্ট মূলনীতি হলো— যেসব বস্তু বা কাপড়ের অংশ (যেমন: ট্রাউজারের ইলাস্টিকযুক্ত কোমর, ভেতরে থাকা ফিতা, মোটা জিন্সের প্যান্ট, সোয়েটার, বিশেষ জার্সি ইত্যাদি) মোটা হওয়ার কারণে বা ভেতরের গঠন কাঠামোর কারণে পুরোপুরি নিংড়ানো বা চিপে পানি বের করা যায় না বা অত্যন্ত কষ্টকর, সেগুলোকে ফিকহের পরিভাষায় 'মা লা ইয়ান আসিরু' (ما لا ينعصر - যা নিংড়ানো যায় না বা নিংড়ানো দুঃসাধ্য) বলা হয়।
এমন কাপড় বা বস্তু পাক করার দুটি সুনির্দিষ্ট শরঈ পদ্ধতি রয়েছে:
- প্রথম পদ্ধতি (সর্বোত্তম ও সবচেয়ে সহজ): নাপাক কাপড়টি কল/ট্যাপের চালুকৃত প্রবহমান পানির নিচে ধরে ভালোভাবে ধুয়ে নিন, যেন পানি একদিক দিয়ে প্রবেশ করে অন্যদিক দিয়ে গড়িয়ে পড়ে; অথবা বালতিতে রেখে ওপর থেকে প্রচুর পানি ঢেলে ধুয়ে দিন। এভাবে প্রবহমান পানিতে ধুলে নিংড়ানো বা শুকানোর কোনো শর্ত ছাড়াই কাপড়টি সরাসরি পাক হয়ে যাবে।
- দ্বিতীয় পদ্ধতি (সাধারণ বালতি বা পাত্রে ধুলে): যদি প্রবহমান পানি ব্যবহার না করে সাধারণ বালতি বা পাত্রের পানিতে ধোওয়া হয়, তবে কাপড়টি ৩ বার ধুতে হবে এবং প্রতিবার নিংড়ানোর বদলে পানি ঝরে অতটুকু সময় ঝুলিয়ে শুকাতে হবে যাতে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়া বন্ধ হয়ে যায়। ৩য় বার পানি পড়া বন্ধ হয়ে গেলে বা সাধ্যমতো চিপে ফোঁটা বন্ধ করলেই কাপড়টি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র হয়ে যাবে।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১২৩ ও ১২৭ (অধ্যায়: তাহারাত, ৭ম পরিচ্ছেদ: 'নাজাসাত হতে পবিত্রকরণ' — যে বস্তু নিংড়ানো সম্ভব নয় তা ৩ বার ধোয়া ও প্রতিবার শুকানো/ঝরানোর মাধ্যমে পাক হওয়ার বিধান)।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৮৬–৮৮ (অধ্যায়: 'তহারত ও পানি সংক্রান্ত মূলনীতি' — প্রবহমান পানি বা প্রচুর পানি ঢেলে ধুলে নিংড়ানো বা শুকানোর শর্ত ছাড়াই সরাসরি পাক হয়ে যাওয়ার বিস্তারিত বিবরণ)।
- নূরুল ঈযাহ: বাংলা সংস্করণ, পৃষ্ঠা: ৫১ (পরিচ্ছেদ: 'নাজাসাত দূরীকরণ' — নিংড়ানো দুঃসাধ্য বস্তুর পবিত্রতা অর্জন)।
২. অতিরিক্ত প্রশ্ন-১: অর্ধেক অর্ধেক করে নিংড়ানোর শরঈ বিধান:
উত্তর: ক) ও খ) বড় বা ভারী কাপড় ভালোভাবে নিংড়ানোর সুবিধার্থে অর্ধেক অর্ধেক বা খণ্ড খণ্ড করে চিপা বা নিংড়ানো সম্পূর্ণ শরীয়তসম্মত ও জায়েয।
ফিকহী কারণ: নাপাক কাপড় পবিত্রকরণের ক্ষেত্রে ফিকহে হানাফীর মূল শর্ত হলো— ধৌতকারীর অন্তরে 'গালিবে যন' (غالب الظن - পবিত্র হওয়ার ব্যাপারে মনের প্রবল ধারণা) অর্জিত হওয়া এবং নিজের শারীরিক সাধ্য অনুযায়ী নিংড়ানো।
আপনি যখন ১ম ও ২য় বার ধোয়ার পর ৩য় বার কাপড়টি অর্ধেক করে বা খণ্ড খণ্ড করে নিজের শক্তি অনুযায়ী নিংড়াবেন, তখন একপাশ চিপার পর অন্যপাশ চিপতে গেলে যদি আগের নিংড়ানো অংশের দিকে কিছু পানি চলেও আসে, তবুও কাপড়টি নাপাক হবে না। কারণ ৩য় ধোয়ায় সাধ্যমতো পুরো কাপড়টি নিংড়ানোর মাধ্যমে এবং গালিবে যন অর্জিত হওয়ার মাধ্যমে পুরো কাপড়টিই শরীআতের বিচারে পাক হয়ে গেছে।
(বিশেষ পরামর্শ: এই অহেতুক সন্দেহ বা সংশয় থেকে বাঁচতে ট্যাপের রানিং ওয়াটার বা প্রবহমান পানিতে কাপড়টি ধুয়ে নিলেই নিংড়ানোর এই দুশ্চিন্তা পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে।)
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১২৩–১২৪ (অধ্যায়: তাহারাত — 'নিজের সাধ্য অনুযায়ী নিংড়ানোর দ্বারা এবং গালিবে যন অর্জিত হলে কাপড় পাক হওয়ার ফতোয়া')।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৮৬–৮৭ (অধ্যায়: 'তহারত ও নাজাসাত' — নিংড়ানোর ক্ষেত্রে ঘালিবুয যান বা প্রবল ধারণার মানদণ্ড এবং সাধ্য অনুযায়ী নিংড়ানোই যথেষ্ট হওয়া)।
৩. অতিরিক্ত প্রশ্ন-২: নাপাক কাপড় ধোয়ার পানির ছিটা (গসালাহ) লাগার হুকুম:
উত্তর: নাপাক কাপড় ধোয়ার সময় নির্গত পানিকে ফিকহের পরিভাষায় 'গসালাহ' (غسالة) বলা হয় [১৯৬]। এর ছিটা লাগার বিধান নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. ১ম ও ২য় বার ধোয়ার পানির স্পষ্ট ছিটা: নাপাক কাপড় ১ম বা ২য় বার ধোয়ার সময় যদি বড় ফোঁটার স্পষ্ট পানির ছিটা অন্য কোনো পাক কাপড় বা শরীরে পড়ে, তবে যে স্থানে ওই ছিটা লেগেছে সেই স্থানটুকু নাপাক হবে এবং তা ৩ বার ধুয়ে নিতে হবে। ২. ৩য় বার ধোয়ার বা নিংড়ানোর পানি: ৩য় বার ধোওয়া ও নিংড়ানোর সময় যে পানি বা ফোঁটা নির্গত হয়, তা কাপড়ের সাথে সাথেই পাক হয়ে যায়। তাই ৩য় বারের নিংড়ানো পানির ছিটা লাগলে কাপড় নাপাক হয় না। ৩. ধোয়ার সময়কার অনাকাঙ্ক্ষিত সূক্ষ্ম ছিটা (ক্ষমাযোগ্য): কাপড় ধোয়ার সময় বা চিপার সময় অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও হালকা যে ছিটা প্রাকৃতিকভাবে চারিদিকে ছড়ায় (যা থেকে বেঁচে থাকা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব), তা ফিকহের বিচারে 'উমূমে বালওয়া' (عموم البلوى - ব্যাপক সাধারণ সমস্যা) হিসেবে শরীআতে ক্ষমাযোগ্য (মাফ)। এতে শরীর বা অন্য কাপড় নাপাক হবে না।
(উল্লেখ্য: অদৃশ্যমান নাপাকীতে ভেজা কাপড় ধোয়ার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।)
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১২৩ ও ১২৫ (অধ্যায়: তাহারাত, ৭ম পরিচ্ছেদ — 'নাপাক ধোয়ার গসালাহ বা পানির ছিটার ফিকহী বিচার এবং বেঁচে থাকা অসম্ভব এমন সূক্ষ্ম ছিটা মাফ হওয়া')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (৫ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৫১–২৫৩ (অধ্যায়: 'নাপাক কাপড়ের ছিটা' — কাপড় ধোয়ার সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ছিটা লাগার শরঈ হুকুম)।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৭৬–৭৭ (অধ্যায়: 'তহারত ও পানি — উমূমে বালওয়া এবং নাপাক ধোওয়া পানির ছিটার ফিকহী বিচার')।
আল্লাহ ভালো জানেন।