সুদের টাকা দিয়ে সদকা করা, আত্মীয়ের বিয়েতে খরচ করা ও দাওয়াতে খাওয়া কি জায়েয?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার আব্বু একটা প্রতিষ্ঠানে কিছু টাকা জমা রাখার কারণে নির্দিষ্ট অংকের কিছু টাকা সুদ হিসেবে পান।কিন্তু সুদ হিসেবে প্রাপ্ত ওই টাকা ভোগ না করে তিনি সাদকা করে দিতে চান।এজন্য তিনি নিজের বোনের মেয়ের বিয়েতে ওই টাকার চেয়ে কিছু বেশি টাকা খরচ করেন ।কেননা আমার ফুফু তথা আব্বুর বোন বিধবা হওয়ায় পারিবারিকভাবে সচ্ছল নয়।প্রশ্ন হচ্ছে,
১।এভাবে কি সুদের টাকার হক আদায় হবে?
২।ওই বিয়েতে যেহেতু আরো অনেকেই এভাবে আর্থিক সাহায্য করছে,তাই নিশ্চিতভাবেই সেখানে সাদকা হিসেবে প্রাপ্ত টাকার মাধ্যমেই খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করার সম্ভাবনা থাকছে।যেহেতু আত্মীয়তার সম্পর্কের খাতিরে যাওয়া আবশ্যক তাই সেখানে উপস্থিতও থাকতে হবে।কিন্তু দাওয়াতে খাবার খেলে কি তা খাওয়া আমাদের জন্যও হারাম হবে?
৩l একটা সন্দেহ জাগে যে নিজের ভাগনি হওয়াতে তার বিয়েতে এমনিতেই টাকা খরচ করত। এখন এভাবে সুদের অংশটা খরচ করায় তা আদায় হয়েছে কিনা?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আপনার জিজ্ঞাসিত তিনটি প্রশ্নের ফিকহে হানাফীর প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট শরঈ সমাধান নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সুদের টাকা ভাগনির বিয়েতে খরচ করায় সুদের টাকার হক বা দায়িত্ব আদায় হবে কি?
উত্তর: যদি আপনার ফুফু ও ভাগনি এলাকা বা পারিবারিকভাবে সত্যি ফকীর/অভাবী হন (যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত হন), তবে সুদের টাকা সওয়াবের নিয়ত ছাড়া তাদেরকে নগদ টাকা হিসেবে হস্তান্তরের মাধ্যমে (মালিক বানিয়ে) প্রদান করলে সুদের দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে।
তবে আপনার আব্বু যদি ওই টাকা দরিদ্র ভাগনিকে সরাসরি হস্তান্তর না করে, বরঞ্চ বিয়ের যাবতীয় খরচপত্র (যেমন: ডেকোরেশন, প্যান্ডেল, বাজার বা খাওয়ার খরচ) নিজেই সরাসরি পরিশোধ করেন কিংবা নিজের সামাজিক/পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবে ওই টাকা ব্যবহার করেন, তবে সুদের টাকার হক বা দায়িত্ব আদায় হবে না। কারণ শরী'আতে সুদের টাকা নিজের কোনো দায়িত্ব পালন, হালাল টাকা বাঁচানো বা নিজের পরিচিতিতে ব্যবহার করা নাজায়েয।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৮৫ ও ১৮৮–১৮৯ (অধ্যায়: 'হারাম অর্থ-সম্পদ: মালিকানা ও ব্যবহারবিধি' — সওয়াবের নিয়ত ছাড়া সুদের টাকা দরিদ্রদের দান করে দায়মুক্ত হওয়ার শরঈ বিধান)।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৫শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৮৬–৮৭ এবং ৩১৭ (অধ্যায়: 'বাবুল মাসাজিদ / কিতাবুল রিবাহ' — সুদের টাকা সওয়াবের নিয়ত ছাড়া অভাবীদের দিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার ফতোয়া)।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৫ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩৪৩–৩৪৪ (অধ্যায়: কিতাবুল ক্রাহিয়্যাহ, ২য় পরিচ্ছেদ — 'হারাম ও সুদের অর্থ হস্তান্তর ও ব্যবহারের শরঈ সীমানা')।
২. ওই বিয়ের দাওয়াতে খাবার খেলে তা খাওয়া আপনাদের জন্য হারাম হবে কি?
উত্তর: না, উক্ত বিয়ের দাওয়াতে খাবার খাওয়া আপনাদের জন্য হারাম হবে না; বরং তা খাওয়া সম্পূর্ণ জায়েয ও হালাল।
শরঈ কারণ ও ফিকহী বিশ্লেষণ: ১. হালাল অর্থের আধিক্য (غالب حلال): বিয়েতে কেবল আপনার আব্বু একা সাহায্য করেননি; বরং আরও অনেকেই সাহায্য করেছে এবং বিয়ের খাবারের সার্বিক অর্থায়নে হালাল টাকার পরিমাণই বেশি। ফিকহে হানাফীর মূলনীতি অনুযায়ী— কোনো ব্যক্তি বা অনুষ্ঠানের প্রাপ্ত অর্থে যদি হালাল অংশ غالب বা বেশি থাকে, তবে সেই দাওয়াত গ্রহণ করা এবং খাবার খাওয়া অন্যদের জন্য সম্পূর্ণ জায়েয ও হালাল। ২. মালিকানা পরিবর্তন: তাছাড়া ফুফু/ভাগনি দরিদ্র হওয়ায় সুদের টাকা বা সদকার টাকা তাদের হস্তগত হওয়ার পর তাদের জন্য তা হালাল মালিকানায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে। পরবর্তীতে তারা যখন তা দিয়ে খাবার রান্না করে মেহমানদের আপ্যায়ন করেছে, তখন তা মেহমানদের জন্য সম্পূর্ণ পবিত্র ও হালাল গণ্য হবে।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৯৯–২০০ (অধ্যায়: 'হারাম উপার্জনকারীর হাদিয়া ও দাওয়াত গ্রহণের ফিকহী মানদণ্ড — হালাল অর্থের আধিক্য থাকলে দাওয়াত খাওয়া বৈধ হওয়ার ফতোয়া')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৮তম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১০০–১০১ এবং ৩৭০–৩৭১ (অধ্যায়: 'বাবুদ দিয়াফাত ওয়াল হাদায়া' — মিশ্রিত বা নাজায়েয উপার্জনের দাওয়াত ও খাবার গ্রহণের বিধান)।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৫ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩৪৩–৩৪৫ (অধ্যায়: কিতাবুল ক্রাহিয়্যাহ, ১ম ও ২য় অনুচ্ছেদ — 'দাওয়াত গ্রহণ ও খাবারের হালাল-হারামের শরঈ মানদণ্ড')।
৩. নিজের ভাগনি হওয়ায় এমনিতেই যা খরচ করতেন, তা সুদের টাকা থেকে খরচ করায় সন্দেহ ও সমাধান:
উত্তর: আপনার এই সন্দেহটি শরঈ ও ফিকহী দৃষ্টিতে শতভাগ যৌক্তিক ও সঠিক।
শরঈ বিশ্লেষণ: শরীয়তের সুনির্দিষ্ট মূলনীতি হলো— সুদের টাকা দিয়ে নিজের কোনো দায়-দায়িত্ব পূরণ করা যায় না বা নিজের পকেটের হালাল টাকা বাঁচানো যায় না। আপনার আব্বু যদি ভাগনির বিয়েতে মামা হিসেবে নিজের হালাল টাকা থেকে এমনিতেও নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ খরচ করতেন, কিন্তু এখন সেই খরচ সুদের টাকা থেকে চালিয়ে দিয়ে নিজের হালাল টাকা বাঁচিয়ে ফেলেছেন—তবে শরী'আতের বিচারে সুদের টাকার হক আদায় হয়নি; বরং সুদের টাকা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে।
করণীয় ও সমাধান: উক্ত সুদের টাকা থেকে যে পরিমাণ টাকা আপনার আব্বু নিজের ব্যক্তিগত/পারিবারিক খরচের বিকল্প হিসেবে ব্যয় করেছেন, সমপরিমাণ টাকা উনাকে নিজের হালাল উপার্জন থেকে পুনরায় সওয়াবের নিয়ত ছাড়া তাদেরকে যদি তারা গরীব হয় অথবা অন্য কোনো দরিদ্র ও অভাবী মানুষকে সদকা করে দিতে হবে। তবেই উনার জিম্মা সুদের অনুশোচনা ও গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হবে।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৮৫, ১৮৮–১৮৯ এবং ২০৮–২০৯ (অধ্যায়: 'অমালিকানাধীন হারাম অর্থ-সম্পদের বিধান — সুদের টাকা দ্বারা নিজের দায়িত্ব পালন করা নাজায়েয হওয়া এবং পুনরায় সদকা করার আবশ্যকতা')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৫শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৮৬–৮৮ এবং ৩১৭ (অধ্যায়: 'বাবুল মাসাজিদ' — সুদের টাকা দিয়ে নিজস্ব খরচ বা দায়িত্ব পূরণ না হওয়া সংক্রান্ত ফতোয়া)।
- কাওয়াইদুল ফিক্বহ: পৃষ্ঠা: ৩৯০ (ফিকহী কায়দা: 'দায়মুক্তির শরঈ শর্তাবলী ও নাজায়েয লেনদেন')।
আল্লাহ ভালো জানেন।