অনুমতি ছাড়া বাবার টাকা নিয়ে মায়ের বানানো স্বর্ণের গহনা গ্রহণ এবং এর শরিয়াহ বিধান জানতে চাই?

Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 7586
Questioner: Mst Shapna Akter
Question Asked: 29 Oct 2026, 11:03 PM
Reviewed & Published: 29 Oct 2026, 11:28 PM
Views: 12
Tokens: 7,844
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার মা প্রায় ২৫ ভরি স্বর্ণের গহনা তৈরি করেন বাবার থেকে টাকা না জানিয়ে নিয়ে। আমার বাবা ব্যবসা করতেন, টাকা বাসায় আলমিরাতে রাখতেন। আমার মা বাবা যখন না থাকত, আলমিরা লক খুলে সেখান থেকে টাকা বের করে নিতেন এমনভাবে যেন বাবা না বোঝে। এটা সে প্রতিদিন করত। এভাবে সে প্রায় ২৫ ভরি স্বর্ণের গহনা করেন, যার মধ্যে ৪ ভরি ২২ ক্যারেট আর বাকিটা ১৮ ক্যারেটের। সে ৭ ভরি করে আমার বোন আর আমার ভাইকে দিয়ে দিয়েছেন, আর আমাকে দিয়েছেন ১১ ভরি।

পরে সমতার কথা শুনে আমি বলছি, 'তাহলে আমি ৭ ভরি রাখব আর বাকি ৪ ভরি আমি দেশে ফিরলে তোমাকে দিয়ে দিব; আর তুমি বেঁচে না থাকলে ওয়ারিশ হিসেবে তারা পাবে।' আমি বাংলাদেশে ব্যাক করার নিয়ত করেছি ৬ বছর পর। আমার মায়ের বেশ বয়স হয়ে গেছে।

তো একবার আমি এই দান হালাল করার জন্য বাবাকে বলছিলাম, 'মা তোমার থেকে এভাবে টাকা নিয়ে গহনা বানায় আমাকে দিছে, তুমি কি এগ্রি (সম্মত) করো?' সে বলছে, 'হ্যাঁ, করি।' কিন্তু আমি এক্স্যাক্ট (ঠিক) কতখানি যে পাইছি, তা উল্লেখ করিনি। পরে জানছি আমার মা আমার বাবাকে বলছে আমাকে ৪ ভরি দিছে।

তো এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আমার কি ৭ ভরির কথাই উল্লেখ করা লাগবে, নাকি না করলেও এটা নেওয়া আমার জন্য হালাল? যদি হালাল হয়, আমি কি ফেরত দিব ২২ ক্যারেটের স্বর্ণ নাকি ২২ ক্যারেটেরটা রেখে ১৮ ক্যারেটের ৪ ভরি ফেরত দিলেও হবে?

Answer

উত্তর

সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার জন্য ৭ ভরি নয়, বরং ১১ ভরি (অথবা প্রকৃতপক্ষে যা আপনি গ্রহণ করেছেন) সম্পর্কে বাবাকে অবহিত করা এবং তাঁর স্পষ্ট সম্মতি নেওয়া আবশ্যক। শুধু "হ্যাঁ, সম্মত আছি" বলে সাধারণ সম্মতি যথেষ্ট নয়, যখন তিনি প্রকৃত পরিমাণ জানেন না। আর ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্যারেটের পার্থক্য (২২ বনাম ১৮) হিসাব করে সমমূল্যের স্বর্ণ ফেরত দিতে হবে, শুধু ওজনে সমান হলেই হবে না।


বিস্তারিত আলোচনা

১. মায়ের কাজের শরীয়াহ বিধান

আপনার মা আপনার বাবার সম্পদ তাঁর অজান্তে নিয়েছেন — এটি শরীয়তে গণিমত/আমানতের খিয়ানত হিসেবে গণ্য। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَا يَحِلُّ مَالُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ إِلَّا بِطِيبِ نَفْسٍ مِنْهُ»

"কোনো মুসলিমের সম্পদ তার অন্তরের সন্তুষ্টি ছাড়া হালাল নয়।" — (সহীহ, আহমাদ, আলবানী 'সিলসিলা সহীহা' ১৭৬১-এ সহীহ বলেছেন)

তবে স্ত্রী স্বামীর ঘরে থাকা অবস্থায় স্বামীর সম্পদ থেকে নেওয়ার ব্যাপারে কিছুটা শিথিলতা রয়েছে — বিশেষত স্বামী কৃপণ হলে। রাসূল ﷺ হিন্দ বিনতে উতবাকে বলেছিলেন:

«خُذِي مَا يَكْفِيكِ وَوَلَدَكِ بِالْمَعْرُوفِ»

"ন্যায়সংগতভাবে তোমার ও তোমার সন্তানদের প্রয়োজনীয়টা নিয়ে নাও।" — (বুখারী ৫৩৬৪, মুসলিম ১৭১৪)

কিন্তু এখানে শর্ত হলো "প্রয়োজন" ও "ন্যায়সংগত" হওয়া। ২৫ ভরি স্বর্ণের গহনা সঞ্চয় করা — যা সাধারণত প্রয়োজন বহির্ভূত — এটা এই অনুমতির আওতায় পড়ে না। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন, এ অনুমতি কেবল প্রয়োজন পরিমাণের জন্য, সঞ্চয় বা বিলাসের জন্য নয়। (দেখুন: মাজমুউল ফাতাওয়া ৩১/৩৭৮)

সুতরাং আপনার মায়ের কাজ মূলত গুনাহ, এবং সেই সম্পদ অন্যায়ভাবে অর্জিত (মালু-গাসব) হিসেবে বিবেচিত হবে — যতক্ষণ না বাবা সন্তুষ্টচিত্তে মাফ করেন।

২. বাবার সম্মতি — শর্ত ও সীমাবদ্ধতা

ইসলামে ক্ষমা/মাফ একটি চুক্তি। আর চুক্তির শর্ত হলো পক্ষদ্বয়ের জ্ঞান ও স্পষ্ট সম্মতি। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

«يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ»

"হে ঈমানদারগণ! চুক্তি পূর্ণ করো।" — (সূরা মায়িদা ৫:১)

আপনি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছেন "মা এভাবে টাকা নিয়ে গহনা বানিয়ে আমাকে দিয়েছে, তুমি কি সম্মত?" — তিনি বলেছেন "হ্যাঁ।" কিন্তু আপনি বলেননি কত ভরি, কত টাকার, কী পরিমাণ। এ অবস্থায় সম্মতি অস্পষ্ট (মুবহাম) এবং ফিকহের দৃষ্টিতে এটি অজ্ঞতাভিত্তিক সম্মতি (رضا بغير علم) — যা বৈধ মালিকানা সৃষ্টি করে না।

ইমাম ইবনু কুদামা (রহ.) 'আল-মুগনী'-তে বলেন: "কোনো ব্যক্তির সম্পদ তার সম্মতি ছাড়া গ্রহণ করা জায়েয নয়; আর সম্মতি তখনই ধর্তব্য যখন সে বিষয়টি জানে।" (আল-মুগনী ৫/৩৮৭)

শায়খ ইবনু উসাইমীন (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল — কেউ সম্পদ নিয়েছে, মালিক সাধারণভাবে মাফ বলেছে কিন্তু পরিমাণ জানে না — তিনি বলেন: "এমন মাফ ধর্তব্য নয়, কারণ মাফের ভিত্তি হলো জ্ঞান; অজ্ঞাত বিষয়ে মাফ হয় না।" (লিকাউল বাবিল মাফতুহ, ১৭/২৩)

৩. আপনার করণীয়

ক) বাবাকে প্রকৃত পরিমাণ জানানো আবশ্যক। আপনি ১১ ভরি পেয়েছেন (মা বাবাকে বলেছেন ৪ ভরি — এটি মায়ের পক্ষ থেকে ভুল তথ্য)। আপনাকে বাবাকে জানাতে হবে:

  • মোট কত ভরি গহনা তৈরি হয়েছে (২৫ ভরি)
  • কে কত পেয়েছে (বোন ৭, ভাই ৭, আপনি ১১)
  • কত ক্যারেট (৪ ভরি ২২ ক্যারেট, বাকি ১৮ ক্যারেট)

এরপর তাঁর স্পষ্ট সম্মতি নিতে হবে। যদি তিনি প্রকৃত পরিমাণ জেনে সম্মতি দেন — তাহলে হালাল। যদি না দেন — তাহলে আপনার অংশ ফেরত দিতে হবে বা তাঁর মাফ চাইতে হবে।

খ) মায়ের সাথে কথা বলা। মাকে বোঝান যে বাবাকে সঠিক তথ্য দেওয়া তাঁরই কল্যাণে — কারণ কিয়ামতের দিন অজ্ঞাতসারে নেওয়া সম্পদ তাঁর গলায় ঝুলানো হবে। রাসূল ﷺ বলেছেন:

«مَنْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَاءَهَا أَدَّى اللَّهُ عَنْهُ، وَمَنْ أَخَذَ يُرِيدُ إِتْلَافَهَا أَتْلَفَهُ اللَّهُ»

"যে ব্যক্তি মানুষদের সম্পদ নেয় তা পরিশোধের নিয়তে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে পরিশোধ করবেন; আর যে নেয় ধ্বংসের নিয়তে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করবেন।" — (বুখারী ২৩৮৭)

গ) আপনার নিজের অংশ সম্পর্কে। আপনি ১১ ভরি পেয়েছেন, কিন্তু সমতার ভিত্তিতে ৭ ভরি রাখতে চান এবং ৪ ভরি ফেরত দিতে চান। এটি উত্তম উদ্যোগ — কারণ আপনি নিজেই স্বীকার করছেন যে ১১ ভরি পাওয়া সমতার নীতি পরিপন্থী। তবে মনে রাখবেন:

  • বাবার সম্মতি ছাড়া ৭ ভরিও হালাল হবে না — কারণ মূল সম্পদ তাঁর।
  • ৪ ভরি ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভালো, কিন্তু বাবার কাছে ঋণ হিসেবে তা বহাল থাকবে যতক্ষণ না প্রকৃত পরিশোধ হয়। মুখে বলা যথেষ্ট নয়; বাস্তবে ফেরত দিতে হবে বা লিখিতভাবে স্বীকার করতে হবে।

৪. ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্যারেটের হিসাব

আপনার প্রশ্ন: ২২ ক্যারেটের ৪ ভরি ফেরত দিতে হবে, নাকি ১৮ ক্যারেটের ৪ ভরি দিলেও হবে?

উত্তর: সমমূল্যের হিসাব করতে হবে, শুধু ওজনে সমান হলে হবে না।

কারণ:

  • ২২ ক্যারেট = ৯১.৬% খাঁটি স্বর্ণ
  • ১৮ ক্যারেট = ৭৫% খাঁটি স্বর্ণ

সুতরাং ৪ ভরি ২২ ক্যারেট = ৩.৬৬৪ ভরি খাঁটি স্বর্ণ আর ৪ ভরি ১৮ ক্যারেট = ৩.০০ ভরি খাঁটি স্বর্ণ

পার্থক্য = ০.৬৬৪ ভরি খাঁটি স্বর্ণ — যা প্রায় ২.৬৬ ভরি ১৮ ক্যারেটের সমান।

ফিকহের মূলনীতি: ঋণ পরিশোধে মূল্য/মান বিবেচ্য, শুধু সংখ্যা নয়। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: "ঋণ যদি নির্দিষ্ট ওজনের হয়, তবে পরিশোধে সেই ওজনই দিতে হবে; আর যদি মূল্যের হয়, তবে মূল্যই দিতে হবে। মিশ্রিত হলে খাঁটি পরিমাণ হিসাব করে সমতা আনতে হবে।" (মাজমুউল ফাতাওয়া ২৯/৪৬৯)

অতএব আপনার করণীয়:

  • হয় ৪ ভরি ২২ ক্যারেটের সমপরিমাণ খাঁটি স্বর্ণ ফেরত দিন (অর্থাৎ ৪ ভরি ২২ ক্যারেট বা তার সমমূল্যের ১৮ ক্যারেট — যা হবে প্রায় ৪.৮৮ ভরি ১৮ ক্যারেট)
  • অথবা বাবার সাথে সমঝোতা করে টাকার মূল্যে সমতা আনুন
  • শুধু "৪ ভরি ১৮ ক্যারেট" দিলে বাবার প্রাপ্য থেকে আপনি কম দিচ্ছেন — এটি জুলুম হবে

শায়খ ইবনু বায (রহ.)-কে অনুরূপ প্রশ্নে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: "ঋণ পরিশোধে অবশ্যই সমমূল্য দিতে হবে; কম দিলে তা বৈধ হবে না।" (ফাতাওয়া ইবনু বায, ১৯/২৯১)

৫. ওয়ারিশ সংক্রান্ত বিষয়

আপনি বলেছেন "তুমি বেঁচে না থাকলে ওয়ারিশ হিসেবে তারা পাবে" — এটি মায়ের সাথে একটি অঙ্গীকার। মনে রাখবেন:

  • মায়ের জীবদ্দশায় তাঁর সম্পদ তাঁরই; তিনি যা চান করতে পারেন।
  • তবে আপনি যে ৪ ভরি ফেরত দেওয়ার কথা বলেছেন — সেটি বাবার পাওনা, মায়ের নয়। বাবার সম্মতি নিয়ে তা বাবার কাছে ফেরত দিতে হবে, অথবা বাবা মাফ করলে মায়ের কাছে।
  • ওয়ারিশের হিসাব আল্লাহই নির্ধারণ করেছেন (সূরা নিসা ১১-১২)। মুখে ওয়ারিশ নির্ধারণ করা শরীয়তে গ্রহণযোগ্য নয় — এটি ওয়াসিয়্যাতের অন্তর্ভুক্ত হবে (এক-তৃতীয়াংশের সীমার মধ্যে)।

সারসংক্ষেপ ও করণীয় তালিকা

| বিষয় | বিধান | |------|--------| | মায়ের অজান্তে টাকা নেওয়া | গুনাহ; বাবার মাফ ছাড়া হালাল নয় | | বাবার সাধারণ "হ্যাঁ" | যথেষ্ট নয় — প্রকৃত পরিমাণ জানিয়ে সম্মতি নিতে হবে | | আপনার ১১ ভরি | বাবার স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া হালাল নয় | | ৭ ভরি রাখা | বাবার সম্মতি সাপেক্ষে | | ৪ ভরি ফেরত | সমমূল্যে দিতে হবে (২২ ক্যারেটের সমপরিমাণ) | | শুধু ১৮ ক্যারেটের ৪ ভরি | যথেষ্ট নয় — কম হবে | | ওয়ারিশ নির্ধারণ | মুখে নয়; শরীয়াহ অনুযায়ী |

সর্বোত্তম পথ: বাবাকে ডেকে বসিয়ে পুরো হিসাব খুলে বলুন — মোট ২৫ ভরি, কে কত পেয়েছে, কত ক্যারেট। তাঁর স্পষ্ট সম্মতি নিন। যদি তিনি সম্মতি দেন — আলহামদুলিল্লাহ। যদি না দেন — আপনার অংশ ফেরত দিন বা তাঁর মাফ চান। আর ফেরত দেওয়ার সময় ক্যারেটের পার্থক্য হিসাব করে সমমূল্য দিন।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জনে তাওফিক দান করুন। আমীন।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.