পরদাদা জীবিত থাকা অবস্থায় দাদার মৃত্যুকালে বাবা-চাচা ও ফুফুদেরকে জমি দিলে ফুপুদের অংশ দিতে কি তাতে হবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেব,
আমার দাদা তিনার পিতা জীবিত থাকা অবস্থাতেই ইন্তেকাল করেন। ইলমে ফারায়েজ অনুযায়ী তো পিতার পুর্বে সন্তান ইন্তেকাল করলে অংশ প্রাপ্ত হয় না। তথাপি তিনারা না জেনে হোক বা দয়া পরবস হয়ে কিছু জমি দেন যেটাতে বর্তমানে আমার বাবা চাচারা বসতি করে আছেন। আমার বাবা চাচারা ৩ ভাই ২ বোন। তো এই বসত ভিটা থেকে তারা অংশ বোনদেন দেননি।
প্রশ্ন হলো, এখন এই জমি থেকে কি আমার ফুপুদের অংশ দেয়া ফারায়েজ অনুযায়ী জরুরী?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক জমি বণ্টন সংক্রান্ত ফিকহী প্রশ্নটির শরঈ সমাধান ফিকহে হানাফী ও প্রামাণ্য কিতাবসমূহের হাওয়ালা সহ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ) নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
সংক্ষিপ্ত ও সরাসরি উত্তর:
হ্যাঁ, উক্ত বসতভিটা বা জমি থেকে আপনাদের ফুফুদের (বোনের) শরঈ অংশ বুঝিয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি এবং আবশ্যক (ফরয/ওয়াজিব)।
ফুফুদের তাদের প্রাপ্য অংশ না দিয়ে কেবল ভাইয়েরা (আপনার বাবা ও চাচারা) একা পুরো জমি ভোগদখল করা শরী'আতের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নাজায়েয, হারাম এবং 'গসব' (অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ)-এর অন্তর্ভুক্ত।
শরঈ কারণ ও ফিকহী বিশ্লেষণ:
১. হিবাহ (দান) ও যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠা: যদিও আপনার দাদা আপনার পরদাদার জীবিত থাকাকালীন ইন্তেকাল করায় সাধারণ ফারায়েযের মূল নীতি অনুযায়ী আপনার দাদা পরদাদার মৃত্যুর পর সরাসরি ওয়ারিশ হননি; কিন্তু আপনার পরদাদা বা পরিবার তাদের জীবিত অবস্থায় দয়া পরবশ হয়ে যে জমিটি নাতি-নাতনিদের (আপনার বাবা, চাচা ও ফুফুদের) থাকার জন্য বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ফিকহের বিচারে তা একটি 'হিবাহ' (দান) হিসেবে গণ্য হয়েছে। জমিটি হস্তান্তরের মাধ্যমে আপনার বাবা, চাচা এবং ফুফু—সকলের যৌথ মালিকানা (شركة الملك) সাব্যস্ত হয়েছে।
২. বোনদের হক ও বঞ্চিত করার শরঈ পরিণতি: পরদাদার দেওয়া এই সম্পদে আপনার বাবা-চাচাদের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি আপনার ফুফুদেরও শরঈ মালিকানা রয়েছে। ইসলামী শরী'আতে কোনো বোন বা মেয়েকে তার বাপের/পরিবারের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা কঠিন গুনাহে কাবীরা। রসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন— "যে ব্যক্তি তার ওয়ারিশের মীরাছ/হক হরণ করবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন জান্নাতে তার অংশ হরণ করবেন।" (সুনানে ইবনে মাজাহ)।
৩. বণ্টনের শরঈ অনুপাত (৩ ভাই ও ২ বোন): উক্ত জমিটি আপনার বাবা, চাচা ও ফুফুদের মাঝে ইসলামী মিরাস ও হিবাহর সাধারণ নীতি অনুযায়ী ২:১ অনুপাতে (ভাই বোনের দ্বিগুণ - للذكر مثل حظ الأنثيين) বণ্টন করতে হবে।
-
গাণিতিক হিসাব (মোট ৮ অংশ):
- ৩ জন ভাই (আপনার বাবা ও ২ চাচা) = ৩ × ২ = ৬ অংশ।
- ২ জন বোন (আপনার ২ ফুফু) = ২ × ১ = ২ অংশ।
- মোট অংশ = ৮ অংশ।
-
বণ্টন: পুরো জমিকে সমান ৮ ভাগ করা হবে:
- প্রতি ভাই (বাবা ও চাচারা): পাবেন ২/৮ অংশ (বা ৪ ভাগের ১ ভাগ)।
- প্রতি বোন (ফুফুরা): পাবেন ১/৮ অংশ (বা ৮ ভাগের ১ ভাগ)।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ২৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৩১–৫৩৩ এবং ৫৫১–৫৫৩ (অধ্যায়: কিতাবুল ফারায়েজ — 'বোনদের মিরাস থেকে বঞ্চিত করার নিষেধাজ্ঞা, যৌথ মালিকানা ও ভাই-বোনের বন্টন পদ্ধতি')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ২০তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৭২–২৭৫ এবং ২৯২–২৯৪ (অধ্যায়: কিতাবুল ফারায়েজ — 'পিতার বা পরিবারের জায়গায় মেয়েদের/বোনদের হক এবং তা বুঝিয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা')।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা: ১১৬–১১৯ (অধ্যায়: কিতাবুল বুয়ূ' — 'যৌথ মালিকানা ও শরীকদের স্বত্ব'); এবং ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃষ্ঠা: ৪৪৭–৪৪৯ (কিতাবুল ফারায়েজ — ভাই-বোনের ২:১ অনুপাতে সম্পত্তি বন্টনের বিবরণ)।
- সিরাজী ফিল মিরাস: পৃষ্ঠা: ২৫ ও ৩৫ (পরিচ্ছেদ: 'আসাবাহ ও ভাই-বোনের মধ্যে ২:১ অনুপাতে মিরাস বন্টনের মূলনীতি')।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৬৫–২৬৭ এবং ৪৬৫–৪৬৬ (অধ্যায়: 'যৌথ উত্তরাধিকার সম্পদ ও অনুমতি ছাড়া বোনদের অংশ আটকে রাখার শরঈ বিচার')।
পরামর্শ:
আপনার বাবা ও চাচাদের উচিত অবিলম্বে ফুফুদের ডেকে আন্তরিকতার সাথে জমিটি মেপে তাদের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দেওয়া, অথবা ফুফুরা যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাজারমূল্যে তাদের অংশ বাবা-চাচাদের কাছে বিক্রি করতে সম্মত হন, তবে মূল্য পরিশোধ করে তা সমাধান করে নেওয়া। এতে পরিবারে আল্লাহর বারাকাহ ও শান্তি বর্ষিত হবে।
আল্লাহ ভালো জানেন।