মা অখুশি
Family Life · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্নোক্ত মাসআলার বিস্তারিত উত্তর
মূল বিষয়
প্রশ্নটি দুটি দিক নিয়ে গঠিত:
- স্ত্রীর সেবা করা ও তার কাপড় ধোয়ার বিধান — এটি কি স্বামীর দায়িত্ব? শরীয়তের দৃষ্টিতে এর হুকুম কী?
- মায়ের অসন্তুষ্টি ও তার কথা — এমতাবস্থায় করণীয় কী?
প্রথমত: স্ত্রীর সেবা ও কাপড় ধোয়ার বিধান
শরীয়তের মূলনীতি
হানাফি ফিকহের সুপ্রতিষ্ঠিত মূলনীতি হলো—স্ত্রীর ভরণপোষণ (নফকা) তথা খাওয়া-পরা-বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর উপর ওয়াজিব, কিন্তু স্ত্রীর ব্যক্তিগত কাজকর্ম (যেমন নিজের কাপড় ধোয়া, রান্না-বান্না ইত্যাদি) স্বামীর উপর শরীয়তগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। তবে সদাচরণ, সহযোগিতা ও সেবা-যত্ন করা ইসলামে অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও সওয়াবের কাজ।
দলিলসমূহ
১. কুরআনুল কারীম:
«وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ» "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — (সূরা আন-নিসা: ১৯)
«وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ» "পুরুষদের উপর নারীদের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি নারীদেরও পুরুষদের উপর অধিকার রয়েছে ন্যায়সঙ্গতভাবে।" — (সূরা আল-বাকারা: ২২৮)
২. হাদীস শরীফ:
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
«خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي» "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের নিকট সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।" — (সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫; সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৯৭৭)
আরও ইরশাদ করেন:
«اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا» "নারীদের ব্যাপারে তোমাদেরকে কল্যাণের অসিয়ত করছি।" — (সহীহ বুখারী: ৫১৮৬; সহীহ মুসলিম: ১৪৬৮)
৩. আসার (সাহাবা ও তাবেঈন):
হযরত ফাতিমা رضي الله عنها ঘরের কাজ করতেন এবং হযরত আলী رضي الله عنه বাইরের কাজ করতেন—এটি প্রসিদ্ধ। (সহীহ বুখারী: ৫৩৬১-এর অধ্যায় দ্রষ্টব্য)
৪. হানাফি কিতাবের বক্তব্য:
-
রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী)-এ উল্লেখ আছে যে, স্ত্রীর খিদমত (ব্যক্তিগত সেবা) স্বামীর উপর ওয়াজিব নয়; বরং তা স্বামীর পক্ষ থেকে ঐচ্ছিক সদাচরণ ও ইহসান। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৭৯-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)
-
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে: নফকা (খাওয়া-পরা-বাসস্থান) স্বামীর উপর ওয়াজিব, কিন্তু স্ত্রীর নিজের কাজ নিজে করা থেকে স্বামী তাকে অব্যাহতি দিতে বাধ্য নয়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/৫৬৩ প্রসঙ্গ)
-
ইমদাদুল ফাতাওয়া (হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী رحمه الله)-তে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহযোগিতা ও সেবাকে সওয়াবের কাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং কঠোরতার পরিবর্তে নম্রতা ও সহানুভূতির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
-
বেহেশতী জেওর-এ হযরত থানভী رحمه الله স্বামী-স্ত্রীর কর্তব্যের অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন যে, স্ত্রী অসুস্থ হলে বা অসুবিধায় পড়লে স্বামীর সহযোগিতা করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ এবং উত্তম চরিত্রের পরিচায়ক।
৫. ফিকহি সিদ্ধান্ত:
- স্ত্রী সুস্থ থাকলে নিজের কাপড় নিজে ধোয়া তার দায়িত্ব; স্বামীর উপর বাধ্যতামূলক নয়।
- কিন্তু স্ত্রী অসুস্থ হলে স্বামীর সেবা-যত্ন করা, তার কাজে সহযোগিতা করা—এটি সদাচরণ ও ইহসানের অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে প্রশংসিত। এতে কোনো দোষ নেই; বরং এতে সওয়াব রয়েছে।
- তবে প্রতিদিন সব সময় ধুয়ে দেওয়া স্বামীর উপর শরীয়তগত বাধ্যতামূলক কোনো দায়িত্ব নয়—এটি সম্পূর্ণ স্বামীর ইচ্ছা ও সহযোগিতার বিষয়।
দ্বিতীয়ত: মায়ের অসন্তুষ্টি ও তার কথা
মায়ের অধিকার ও মর্যাদা
ইসলামে মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
«وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا» "পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" — (সূরা আল-ইসরা: ২৩)
«وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ إِحْسَانًا» "আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি।" — (সূরা আল-আহকাফ: ১৫)
হাদীসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করলেন, "আমার সর্বাধিক সদ্ব্যবহারের হকদার কে?" তিনি বললেন, "তোমার মা।" লোকটি বলল, "তারপর কে?" তিনি বললেন, "তোমার মা।" লোকটি বলল, "তারপর কে?" তিনি বললেন, "তোমার মা।" লোকটি বলল, "তারপর কে?" তিনি বললেন, "তোমার বাবা।" — (সহীহ বুখারী: ৫৯৭১; সহীহ মুসলিম: ২৫৪৮)
মায়ের কথা ও করণীয়
মায়ের কথা—"আমার ছেলেদেরই এগুলো করতে হয়"—এটি মূলত মায়ের মমতা ও সন্তানের প্রতি দুর্বলতা থেকে উৎসারিত। তিনি হয়তো চান না তার ছেলে কষ্ট করুন, অথবা বৌমার প্রতি এক ধরনের ঈর্ষা বা অভিযোগ থাকতে পারে। এমতাবস্থায় করণীয়:
১. মাকে সম্মান ও ভালোবাসা বজায় রাখা: মায়ের সাথে কখনো কঠোর ভাষায় কথা বলা যাবে না। তার অসন্তুষ্টি দূর করার চেষ্টা করতে হবে।
২. ধৈর্য ও নম্রতা অবলম্বন করা: মাকে বুঝিয়ে বলুন যে, "আম্মু, সে তো অসুস্থ; অসুস্থ অবস্থায় সেবা করা আমার দায়িত্ব ও সওয়াবের কাজ। আপনি দুআ করুন সে সুস্থ হয়ে যাক, তখন এসব কমে যাবে।" এভাবে ভালোবাসার সাথে বুঝানো।
৩. স্ত্রীর প্রতি ইনসাফ: স্ত্রীকে অসুস্থ অবস্থায় সেবা করা আপনার ইহসান; এটি ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তবে মায়ের কথাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষাও করা উচিত নয়—মাঝপথে ভারসাম্য রক্ষা করুন।
৪. মায়ের সেবাও বজায় রাখা: মায়ের নিজের কোনো প্রয়োজন থাকলে তা পূরণ করুন, যাতে তিনি অনুভব না করেন যে ছেলে শুধু স্ত্রীর দিকেই ঝুঁকে পড়েছে।
৫. প্রয়োজনে পারিবারিক পরামর্শ: যদি মায়ের অভিযোগ বাড়তে থাকে, তবে পরিবারের বড়দের মাধ্যমে বা কোনো নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শে বিষয়টি সমাধান করুন।
৬. দুআ করা: আল্লাহর কাছে দুআ করুন—স্ত্রীর সুস্থতা, মায়ের অন্তরের প্রশান্তি এবং পারিবারিক সম্প্রীতির জন্য।
সারসংক্ষেপ (উত্তর)
-
স্ত্রীর কাপড় ধোয়া স্বামীর উপর শরীয়তগত বাধ্যতামূলক দায়িত্ব নয়; বরং স্ত্রী অসুস্থ হলে স্বামীর সেবা-সহযোগিতা করা সদাচরণ ও সওয়াবের কাজ। এতে কোনো গুনাহ নেই; বরং উত্তম চরিত্রের পরিচয়।
-
সব সময় ধুয়ে দেওয়া লাগে না—শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি বাধ্যতামূলক নয়। স্ত্রী সুস্থ হলে নিজের কাজ নিজে করতে পারে; তবে স্বামী ইচ্ছা করলে সহযোগিতা করতে পারে, যা প্রশংসনীয়।
-
মায়ের অসন্তুষ্টি দূর করা জরুরি—তাকে ভালোবাসা ও সম্মানের সাথে বুঝিয়ে বলুন, তার সেবাও বজায় রাখুন। মায়ের সাথে কঠোরতা কখনোই কাম্য নয়।
-
ভারসাম্য রক্ষা করুন—স্ত্রীর সেবা ও মায়ের হক উভয়ই আদায় করুন। এটি দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণের পথ।
উল্লেখ্য: পারিবারিক বিষয়ে সরাসরি কোনো নির্ভরযোগ্য মুফতি সাহেবের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করলে আরও সঠিক সমাধান পাওয়া যাবে, ইনশাআল্লাহ।
রেফারেন্স সারসংক্ষেপ
| বিষয় | রেফারেন্স | |---|---| | স্ত্রীর সাথে সদাচরণ | সূরা নিসা: ১৯; সূরা বাকারা: ২২৮ | | পরিবারের নিকট উত্তম হওয়া | তিরমিজি: ৩৮৯৫; ইবনে মাজাহ: ১৯৭৭ | | নারীর ব্যাপারে অসিয়ত | বুখারী: ৫১৮৬; মুসলিম: ১৪৬৮ | | নফকা ওয়াজিব, ব্যক্তিগত সেবা নয় | রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৭৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/৫৬৩ | | সহযোগিতা ও নرمতা | ইমদাদুল ফাতাওয়া; বেহেশতী জেওর (স্বামী-স্ত্রীর কর্তব্য অধ্যায়) | | মায়ের মর্যাদা | সূরা ইসরা: ২৩; সূরা আহকাফ: ১৫; বুখারী: ৫৯৭১; মুসলিম: ২৫৪৮ |
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।