মায়ের বদ দোয়া কি সব সময় ই লাগে?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো: না, মায়ের বদদোয়া লাগবে না এবং এতে গুনাহও হবে না—যদি আপনি চিকিৎসার প্রয়োজনে যান এবং মায়ের অবাধ্যতার নিয়ত না থাকে। তবে মায়ের সাথে নরমভাবে কথা বলে, তাকে বুঝিয়ে, তার সম্মতি ও দোয়া নিয়ে যাওয়াই উত্তম। বিস্তারিত নিচে দিচ্ছি।
১. মূল নীতি: মায়ের আনুগত্য ওয়াজিব, তবে তা আল্লাহর আনুগত্যের শর্তে
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ» "সৃষ্টির আনুগত্য নেই স্রষ্টার অবাধ্যতায়।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৬২৫; মুসনাদে আহমাদ)
অর্থাৎ মায়ের কথা শোনা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও কর্তব্য, কিন্তু কোনো বৈধ ও জরুরি কাজ (যেমন চিকিৎসা) থেকে বিরত রাখার নির্দেশে তার আনুগত্য বাধ্যতামূলক নয়। বিশেষত স্ত্রীর জীবন-স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকলে চিকিৎসা নেওয়া শরীয়তসম্মত ও যুক্তিসঙ্গত।
২. মায়ের বদদোয়া কি লাগে?
- বদদোয়া কোনো শরয়ি শাস্তি বা গুনাহের কারণ নয়; এটি একটি সামাজিক-আবেগিক বিষয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
«وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ» "আর যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, (বলো) আমি নিকটেই।" (সূরা বাকারা: ১৮৬)
- মায়ের বদদোয়া আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছু ঘটায় না; আর ন্যায়সঙ্গত কাজে মায়ের অসন্তোষ আল্লাহর অসন্তোষ নয়। হাদিসে এসেছে:
«إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ» "আনুগত্য তো কেবল নেক কাজে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস ৭২৫৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮৪০)
- তবে মা কষ্ট পেলে আপনি সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হবেন এবং তার খেদমত ও সন্তুষ্টি অর্জনে ত্রুটি হবে—এটি আখলাকি ও পারিবারিক দিক থেকে ক্ষতিকর। তাই চেষ্টা করুন তাকে বুঝিয়ে রাজি করাতে।
৩. গুনাহ হবে কি?
না, গুনাহ হবে না, কারণ:
- স্ত্রীর চিকিৎসা নেওয়া বৈধ ও প্রয়োজনীয়; ডাক্তারও বলেছেন।
- মায়ের নির্দেশ এখানে "মা'রূপে" নয়, বরং একটি ভুল পরামর্শ হিসেবে গণ্য; আর ভুল পরামর্শে আনুগত্য ওয়াজিব নয়।
- ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন, পিতা-মাতার আনুগত্য ওয়াজিব কেবল বৈধ ও শরীয়তসম্মত কাজে; নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর কাজে নয়। (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৪১৭-এর কাছাকাছি আলোচনা; «আল-হিদায়া» ও «ফাতাওয়া আলমগিরি»-তেও এ নীতি সুস্পষ্ট)
৪. করণীয় (ব্যবহারিক পরামর্শ)
- নরমভাবে বুঝান: মাকে বলুন, "আম্মু, ডাক্তার বলেছেন দুই দিন অসুস্থ, ঝুঁকি থাকতে পারে; আপনি দোয়া করুন, আল্লাহ হেফাজত করুন।"
- সম্মতি ও দোয়া নিন: সম্ভব হলে মাকে সাথে নিন বা তার দোয়া নিয়ে বের হন—এতে তার কষ্ট কমবে।
- জরুরি হলে যান: স্ত্রীর স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকলে বিলম্ব করবেন না; প্রয়োজনে অন্য আত্মীয়কে সাথে নিয়ে মাকে বোঝান।
- ফিরে এসে খেদমত করুন: ফিরে এসে মায়ের খেদমত, সালাম-কদমবوسی ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন; এতে সম্পর্ক ঠিক থাকবে।
- দোয়া করুন: «رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا» (সূরা ইসরা: ২৪) পড়ে মায়ের জন্য দোয়া করুন।
৫. উপসংহার
- মায়ের বদদোয়া লাগবে না, গুনাহও হবে না—যদি উদ্দেশ্য চিকিৎসা হয় এবং মায়ের অবাধ্যতার নিয়ত না থাকে।
- তবে মাকে বুঝিয়ে, তার দোয়া ও সম্মতি নিয়ে যাওয়া সর্বোত্তম; এতে দ্বীনি ও পারিবারিক উভয় দিক রক্ষা পাবে।
- স্ত্রীর স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকলে দেরি করা ঠিক নয়; প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
মূল রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ ২৬২৫; সহিহ বুখারি ৭২৫৭; সহিহ মুসলিম ১৮৪০; সূরা বাকারা ১৮৬; সূরা ইসরা ২৪; রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন); আল-হিদায়া; ফাতাওয়া আলমগিরি; ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.); ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।