স্বপ্নের ঔষধ, দুধ-ভাত, তেল-পানি পড়া ও জমজমের পানি নিয়ে ইসলামী বিধান কি? কোনটি জায়েজ, কোনটি বিদআত ও শিরক ? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7483
Questioner: Umme Ayesha
Question Asked: 28 Oct 2026, 02:20 PM
Reviewed & Published: 28 Oct 2026, 02:28 PM
Views: 36
Tokens: 5,000
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমাদের গ্রামে কিছু জিনিস প্রচলিত আছে যেমন,কেউ কেউ স্বপ্নের ঔষধ দেয়,আবার কেউ দুধ ভাত খাওয়ায়,এই দুধ ভাত একেকজন একেক নিয়তে খায়।কেউ কন্যা সন্তানের জন্য,কেউ পুত্রের জন্য,কেউ সুস্থতাট নিয়তে ইত্যাদি অনেক কিছুর জন্য খায়।এটা কি জায়েজ কিনা?অনেকে আবার তেল পড়া,পানি পড়া দেয় ছেলে কিংবা মেয়ে হওয়ার জন্য।জমজমের পানি তো নাকি নিয়ত করে খাওয়া যায়।তাহলে উল্লিখিত জিনিস গুলো কি খাওয়া কিংবা ব্যাবহার করা কি যাবে?

Answer

জায়েজ-নাজায়েজ: স্বপ্নের ঔষধ, দুধ-ভাত, তেল-পানি পড়া ও জমজমের পানি

সংক্ষিপ্ত উত্তর (উত্তর)

আপনার উল্লিখিত বিষয়গুলোকে তিন ভাগে ভাগ করে বিধান বলা প্রয়োজন:

১. দুধ-ভাত বা খাবার খেয়ে নির্দিষ্ট নিয়ত করা (যেমন কন্যা/পুত্র সন্তান হওয়ার জন্য): এটি নিজে থেকে কোনো শরঈ ইবাদত বা সুন্নত হিসেবে প্রমাণিত নয়। তবে এটি যদি কেবল সাধারণ খাবার হিসেবে খাওয়া হয় এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে দুআ করা হয়, আর বিশ্বাস করা হয় যে এই খাবারটি নিজে থেকে সন্তান-সংক্রান্ত ফল দেয়—তাহলে তা শিরক/কুফরের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। আর যদি কেবল সাধারণ খাবার খেয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করা হয়, তবে তা জায়েজ; কিন্তু একে দ্বীনের অংশ বা বিশেষ ইবাদত মনে করা বিদআত।

২. তেল পড়া, পানি পড়া, ঝাড়ফুঁক (স্বপ্নের ঔষধ): কুরআন-হাদিসে বর্ণিত শর্তসহ ঝাড়ফুঁক ও দুআ জায়েজ। কিন্তু যেসব "স্বপ্নের ঔষধ" বা তেল-পানি পড়া এমনভাবে দেওয়া হয় যেখানে বিশ্বাস করা হয় যে এগুলো নিজে থেকেই কাজ করে, অথবা জিন-শয়তানের সাহায্য নেওয়া হয়, অথবা এমন মন্ত্র/কালাম পড়া হয় যা বোধগম্য নয় বা শিরকি—তাহলে তা হারাম ও শিরক। বিশেষত সন্তান ছেলে/মেয়ে হওয়ার জন্য তেল-পানি পড়া—এটি আল্লাহর ফয়সালায় হস্তক্ষেপের বিশ্বাস, যা নাজায়েজ।

৩. জমজমের পানি নিয়ত করে পান করা: এটি জায়েজ ও সুন্নতসিদ্ধ। হাদিসে জমজমের পানি যে নিয়তে পান করা হয়, সে নিয়তে ফল পাওয়ার কথা বর্ণিত আছে। তবে সন্তান ছেলে/মেয়ে হওয়ার নিয়ত—এটি আল্লাহর ইচ্ছাধীন; নিয়ত করা যাবে দুআ হিসেবে, কিন্তু এটিকে নিশ্চিত ফলদায়ক মনে করা যাবে না।


বিস্তারিত আলোচনা

১. দুধ-ভাত ও নির্দিষ্ট নিয়ত

শরীয়তে কোনো খাদ্যবস্তুকে নির্দিষ্ট নিয়তে খাওয়া এবং তার দ্বারা নির্দিষ্ট ফল প্রত্যাশা করা—এটি কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ» "যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে এমন নতুন কিছু সৃষ্টি করবে যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।" — সহীহ বুখারী, হাদিস ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৭১৮

ইমাম নববী (রহ.) বলেন, এই হাদিসটি দ্বীনের মূল স্তম্ভ; বিদআত প্রত্যাখ্যাত হওয়ার দলিল। (শরহু সহীহ মুসলিম, ১২/১৬)

তবে যদি কেউ সাধারণ খাবার খায় এবং মনে করে "আমি আল্লাহর উপর ভরসা করছি, তিনি সন্তান দান করবেন"—এবং খাবারকে কারণ বা ইবাদত মনে না করে, তবে তা জায়েজ। কিন্তু খাবারকে বিশেষ শক্তি বা বিশেষ ইবাদত মনে করা বিদআত ও শিরকের দিকে নিয়ে যায়।

হানাফি ফিকহের মূলনীতি: ইবাদতের ক্ষেত্রে মূল হলো "তাওকীফ" (শরীয়তের নির্দেশনা অনুযায়ীই ইবাদত হবে)। যা শরীয়ত প্রমাণ করেনি, তা ইবাদত হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। (উসূলুশ শাশী, পৃ. ৮১-৮২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৩০)

২. তেল-পানি পড়া ও স্বপ্নের ঔষধ

জায়েজ ঝাড়ফুঁক: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَا بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ» "ঝাড়ফুঁকে কোনো দোষ নেই, যতক্ষণ না তাতে শিরক থাকে।" — সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২০০

শর্তগুলো: (ক) কুরআন, হাদিস বা শরীয়তসম্মত দুআ দ্বারা হতে হবে; (খ) আরবি বা বোধগম্য ভাষায় হতে হবে; (গ) বিশ্বাস করতে হবে যে ফলদাতা আল্লাহ, ঝাড়ফুঁক নিজে নয়। (ফাতহুল বারী, ১০/২০৬; রাদ্দুল মুহতার, ৯/৬৪০)

নাজায়েজ: যদি তেল-পানি পড়া এমন ব্যক্তি করে যে জিন-শয়তানের সাহায্য নেয়, অথবা অজ্ঞাত/শিরকি কালাম পড়ে, অথবা বিশ্বাস করে যে এই তেল-পানি নিজেই সন্তান ছেলে/মেয়ে হওয়ার কারণ—তাহলে তা হারাম ও শিরক। আল্লাহ বলেন:

﴿وَلَا تَدْعُ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنْفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ﴾ "আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকো না যা তোমার উপকারও করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না।" — সূরা ইউনুস, আয়াত ১০৬

সন্তান ছেলে বা মেয়ে হওয়া সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছাধীন:

﴿لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ﴾ "আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন; যাকে চান কন্যা দান করেন, যাকে চান পুত্র দান করেন।" — সূরা আশ-শূরা, আয়াত ৪৯

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন, ঝাড়ফুঁক ও তাবিজে শর্ত হলো শরীয়তসম্মত কালাম ও আল্লাহর উপর ভরসা; অন্যথায় তা নিষিদ্ধ। (রাদ্দুল মুহতার, ৯/৬৪০-৬৪২; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৪৫)

৩. জমজমের পানি

জমজমের পানি নিয়ত করে পান করা জায়েজ ও সুন্নতসিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَاءُ زَمْزَمَ لِمَا شُرِبَ لَهُ» "জমজমের পানি যে নিয়তে পান করা হয়, তা সেই নিয়তের জন্যই।" — সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩০৬২ (হাসান)

ইমাম ইবনে হাজার (রহ.) এই হাদিসকে হাসান বলেছেন এবং বলেন, এটি দুআ কবুলের সাথে সম্পর্কিত। (ফাতহুল বারী, ৩/৪৯৩)

তবে সন্তান ছেলে/মেয়ে হওয়ার নিয়ত—এটি দুআ হিসেবে করা যাবে, কিন্তু নিশ্চিত ফল মনে করা যাবে না; কারণ তা আল্লাহর ইচ্ছাধীন। জমজমের পানি পান করা ইবাদত, কিন্তু তাকে বিশেষ শক্তি বা নিশ্চিত ফলদায়ক মনে করা শিরকের দিকে নিয়ে যায়।


সারসংক্ষেপ ফতোয়া

| বিষয় | বিধান | |---|---| | দুধ-ভাত সাধারণ খাবার হিসেবে খাওয়া | জায়েজ | | দুধ-ভাতকে বিশেষ ইবাদত/শক্তি মনে করা | বিদআত/শিরক — নাজায়েজ | | শরীয়তসম্মত ঝাড়ফুঁক, কুরআনি দুআ | জায়েজ | | জিন-শয়তানের সাহায্য বা শিরকি কালাম | হারাম — নাজায়েজ | | সন্তান ছেলে/মেয়ে হওয়ার জন্য তেল-পানি পড়া | নাজায়েজ (আল্লাহর ফয়সালায় হস্তক্ষেপের বিশ্বাস) | | জমজমের পানি নিয়ত করে পান | জায়েজ ও সুন্নতসিদ্ধ | | জমজমের পানি দিয়ে সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের নিশ্চিত বিশ্বাস | নাজায়েজ |

পরামর্শ: সন্তান সংক্রান্ত বিষয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করুন, বিশেষত নবী ﷺ-এর শেখানো দুআসমূহ। যেমন: «اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي وَلَدًا صَالِحًا» (হে আল্লাহ, আমাকে নেক সন্তান দান করুন)। আর যেকোনো আমলকে দ্বীনের অংশ মনে না করে সাধারণ দুআ ও ভরসার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখুন।


আরবি রেফারেন্স সারসংক্ষেপ

  • সহীহ বুখারী, হাদিস ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৭১৮ (বিদআত প্রত্যাখ্যাত)
  • সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২০০ (শিরকমুক্ত ঝাড়ফুঁক জায়েজ)
  • সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩০৬২ (জমজমের পানি)
  • সূরা ইউনুস, ১০৬; সূরা আশ-শূরা, ৪৯
  • রাদ্দুল মুহতার, ৯/৬৪০-৬৪২
  • ফাতহুল বারী, ১০/২০৬; ৩/৪৯৩
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৩০
  • ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৪৫
  • উসূলুশ শাশী, পৃ. ৮১-৮২

আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.