কুরবানীর জন্য ঋণ নিলে তা কি আদায় হবে?
Qurbani-Slaughtering · Hanafi
Question
আমার শ্বশুর বাড়িতে আমার হাসবেন্ড আর তার বড় ভাই আছে। আমার শ্বাশুড়ি -শ্বশুর আছে। আমার হাসবেন্ড প্রাইভেট জব করে সংসার চালায় আমাদের। কিন্তু বাসা গেলে আমরা একসাথে খাই সবাই। যৌথ আরকি! বাসার সকল সম্পত্তি, বাড়ি সব ই আমার শ্বশুর এর নামে। কুরবাণী সব সময় তিনি দেন। এবার টাকা না থাকার হাতে, ভূট্টা বিক্রি করতে পারেননি। আমার বড় ভাসুর টুকটাক ব্যবসা করে ১৫,২০ হাজার এর মত টাকা আমার শ্বশুর কে দিছেন গরু কিনতে। এখন এভাবে কি আমার শ্বশুর এর কুরবাণী আদায় হবে? নাকি ভাসুরকে তার টাকা আমার শ্বশুর ফেরত দেওয়ার পর কুরবাণী আদায় হবে?
এই টাকা কত দিনের মধ্যে ফেরত দেওয়া জায়েজ হবে.
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নের উত্তরটি কুরবানীর শর্ত ও ঋণের বিধানের ওপর নির্ভর করে। নিচে হানাফী ফিকহের আলোকে বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করা হলো:
১. শ্বশুরের কুরবানী আদায় হওয়ার শর্ত:
-
কুরবানীর পশু ক্রয় ও মালিকানা: কুরবানীর জন্য নির্ধারিত পশু (গরু/ছাগল ইত্যাদি) যদি আপনার শ্বশুর নিজের অর্থে ক্রয় করে থাকেন এবং তিনি তা জবাই করেন, তাহলে তার কুরবানী আদায় হবে। পশু ক্রয়ের জন্য তিনি পুত্রের কাছ থেকে ঋণ (কারজ) নিয়ে থাকলেও, তা কুরবানীর বৈধতাকে প্রভাবিত করবে না। কারণ কুরবানীর পশুটি তার মালিকানায় এসেছে এবং তিনি নিজ সম্পদ ব্যবহার করে ক্রয় সম্পন্ন করেছেন। ঋণ শুধু আর্থিক লেনদেনের বিষয়, কুরবানীর মূল শর্তকে নষ্ট করে না।
হানাফী মত: ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও তাঁর অনুসারীদের মতে, কুরবানীর জন্য পশু ক্রয়ে ঋণ গ্রহণ করা জায়েয। তবে যদি কারো নেসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকে এবং ঋণ গ্রহণ করাও সম্ভব না হয়, তাহলে তার ওপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। কিন্তু যেহেতু আপনার শ্বশুর নিয়মিত কুরবানী দেন এবং এখানে তিনি স্বেচ্ছায় ঋণ নিয়ে পশু কিনেছেন, তাই তার কুরবানী আদায় হবে।
(সূত্র: ফাতাওয়া উসমানী, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৮০; রদ্দুল মুহতার, ২য় খণ্ড, কুরবানী অধ্যায়) -
ঋণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত কুরবানী বিলম্বিত হবে না: কুরবানীর শুদ্ধতার জন্য ঋণ পরিশোধের অপেক্ষা করতে হবে না। বরং ঋণ একটি পৃথক দায়িত্ব। আপনার বড় ভাসুরকে (শ্বশুরের বড় ছেলে) টাকা পরিশোধ করা শ্বশুরের ওপর ওয়াজিব (ফরয), কিন্তু তা কুরবানীর বৈধতার সাথে সম্পর্কিত নয়।
(সূত্র: হেদায়া, কুরবানী অধ্যায়; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৭)
২. টাকা ফেরত দেওয়ার সময়সীমা:
- ঋণ পরিশোধের সময়: ঋণ পরিশোধের জন্য শরীয়তে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। তবে যত দ্রুত সম্ভব এবং ঋণদাতার প্রয়োজন হলে তা ফেরত দেওয়া উচিত। আপনার শ্বশুর যদি সক্ষম হন, তাহলে যত দ্রুত সম্ভব টাকা ফেরত দিন।
- বিলম্বের বিধান: যদি ঋণ পরিশোধে অযৌক্তিক দেরি করা হয়, তবে তা মাকরূহ ও গুনাহের কাজ। মহানবী (সা.) বলেন: "ধনী ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে দেরি করা জুলুম।" (বুখারী, হাদীস নং ২৪০০)
- স্বামীর ভাইয়ের অবস্থান: এখানে আপনার বড় ভাসুর (শ্বশুরের বড় ছেলে) তার পিতাকে টাকা দিয়েছেন। পারিবারিক সম্পর্কের কারণে তাঁকে বিশেষ সময়সীমা বলা কঠিন। তবে উত্তম হলো: শ্বশুর সামর্থ্য হলে এক মাসের মধ্যে পরিশোধ করুন; অন্যথায় ফসল বিক্রির পর বা আয় হওয়ার সাথে সাথে ফেরত দেওয়া জরুরি।
৩. গুরুত্বপূর্ণ নোট:
- আপনার স্বামী ও তাঁর পরিবার যৌথভাবে বসবাস করলেও, সম্পত্তি ও আয়-ব্যয়ের মালিকানা পৃথক থাকা উচিত। প্রশ্নে উল্লেখ নেই যে, শ্বশুরের সম্পদে আপনার স্বামীর অংশ আছে কিনা। যদি যৌথ পরিবার হয়, তবে কুরবানীর পশু ক্রয়ের অর্থ যদি সকল সদস্যের সম্মতিতে নেয়া হয়, তবুও কুরবানী শ্বশুরের নিজের পক্ষ থেকে আদায় হবে।
- কুরবানীর শর্ত: ইসলামী আইন মতে, কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা আবশ্যক (যাকাতের নেসাবের সমান)। যদি শ্বশুরের নেসাব না থাকে, তাহলে তাঁর ওপর কুরবানী ফরয নয়। কিন্তু তিনি নিজে কুরবানী করায় তা নফল হলেও সওয়াব অর্জিত হবে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
হ্যাঁ, আপনার শ্বশুরের কুরবানী আদায় হবে। গরু ক্রয়ের জন্য ঋণ নেয়া তা বৈধতায় বাধা নয়।
- এবং টাকা পরিশোধ করার পর কুরবানী আদায় হবে না; বরং জবাই করার সাথেই কুরবানী সম্পন্ন হয়েছে।
- ঋণ পরিশোধের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, তবে সাধ্যমতো দ্রুত ফেরত দেওয়া জরুরি। বিলম্ব করলে গুনাহ হবে।
সুবিধার্থে: আপনার শ্বশুর যদি কুরবানী দিতে চান, তাহলে পশু ক্রয়ের পরপরই জবাই করলে কুরবানী সহীহ হবে। টাকা ফেরত দেওয়া তাঁর নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব, কিন্তু কুরবানীর সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
আল্লাহু আ‘লাম (আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন)