উত্তরীয় পড়া জায়েজ কিনা

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7440
Questioner: Sumiaya Rahman
Question Asked: 27 Oct 2026, 03:19 PM
Reviewed & Published: 27 Oct 2026, 03:37 PM
Views: 28
Tokens: 4,744
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

উত্তরীয়, জয় বাংলা স্লোগান, চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ, মঙগল শোভাযাত্রা, মঙ্গল প্রদীপ, বসন্তোৎসব, নৃত্য এসব কি হারাম? কোনটি কেন? অমুসলিমদের প্রতীক বলে?

Answer

উত্তরীয়, জয় বাংলা স্লোগান, চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, মঙ্গল প্রদীপ, বসন্তোৎসব, নৃত্য — এসব কি হারাম? কোনটি কেন? অমুসলিমদের প্রতীক বলে?

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—উত্তরীয় পরিধান, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান, চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, মঙ্গল প্রদীপ, বসন্তোৎসব ও নৃত্য—এগুলো ইসলামে হারাম কি না; কোনটি কেন হারাম; আর এগুলোকে ‘অমুসলিমদের প্রতীক’ বলা যায় কি না।


ভূমিকা: মূল নীতি

ইসলামে কোনো কাজ হারাম বা হালাল হওয়ার বিধান নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের উপর:

  1. কাজটির নিজস্ব প্রকৃতি (যেমন—নৃত্য, মূর্তিপূজা, আগুন-পূজা ইত্যাদি)।
  2. উদ্দেশ্য ও বিশ্বাস (নিয়ত ও আকীদা)।
  3. অমুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা প্রতীকের সাথে সাদৃশ্য (তাশাব্বুহ)।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ “আর তোমরা জালিমদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না, তাহলে তোমাদেরও আগুন স্পর্শ করবে।” (সূরা হুদ: ১১৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ “যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করল, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (সুনানে আবু দাউদ: ৪০৩১; মুসনাদে আহমাদ)

ইমাম ইবনে আবিদিন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এই হাদীসের ভিত্তিতে অমুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে সাদৃশ্য অবলম্বন নিষিদ্ধ। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৭৫৪)


এক এক করে বিধান

১. উত্তরীয় (শাল/উত্তরীয় পরিধান)

যদি তাতে শরীয়াহ বিরোধী কোনো চিহ্ন/প্রতিক না থাকে,কোনো প্রানীর ছবি না থাকে,তাহলে তা জায়েজ।

তবে শরীয়তের গন্ডির বাইরে হলে তাহা ব্যবহার করা জায়েজ নয়।

পাশাপাশি পুরুষের ক্ষেত্রে রেশমি উত্তরীয় নিষিদ্ধ (রাসূল ﷺ বলেছেন: “আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য রেশম ও স্বর্ণ হারাম।” — সুনানে তিরমিজি: ১৭২০)।

  • নারীর ক্ষেত্রে পর্দার শর্ত।
  • কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে বিশেষ তাৎপর্যে ব্যবহার করলে তাশাব্বুহের দিকে যাবে।

সারকথা: সাধারণভাবে উত্তরীয় হারাম নয়; তবে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করলে সতর্কতা।


২. ‘জয় বাংলা’ স্লোগান

বিধান: নিজে হারাম নয়, তবে সতর্কতা। ‘জয় বাংলা’ একটি রাজনৈতিক/জাতীয়তাবাদী স্লোগান। ইসলামে কোনো ভাষা বা স্লোগান নিজে হারাম নয়; হারাম হয় তার পেছনের বিশ্বাস ও ব্যবহার।

তবে দুটি বিষয় লক্ষণীয়:

  • যদি স্লোগানটি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বা ইসলামবিরোধী কোনো আদর্শের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।
  • মুসলিম হিসেবে আমাদের মূল স্লোগান ও পরিচয় হবে ইসলামের; আল্লাহ বলেন: هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ — “তিনি তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলিম।” (সূরা হজ: ৭৮)

সারকথা: স্লোগানটি নিজে হারাম নয়; কিন্তু কোনো ইসলামবিরোধী আদর্শের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার হলে তা নিষিদ্ধ।


৩. চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ

বিধান: ধর্মীয় আচার হিসেবে পালন করা হারাম; নিছক কালপঞ্জি হিসেবে তারিখ জানা জায়েজ।

কারণ—

  • চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ মূলত হিন্দু সৌর পঞ্জিকা ও বাংলা নববর্ষ কেন্দ্রিক উৎসব, যার সাথে হিন্দু ধর্মীয় আচার (হালখাতা, পূজা, মঙ্গল শোভাযাত্রা) জড়িত।
  • মুসলিমদের জন্য উৎসব কেবল দুটি—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। রাসূল ﷺ মদিনায় এসে দেখলেন লোকেরা দুটি দিনে খেলাধুলা করে; তিনি বললেন: “আল্লাহ তোমাদের জন্য এর চেয়ে উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা।” (সুনানে আবু দাউদ: ১১৩৪)
  • ইমাম ইবনে আবিদিন বলেন, অমুসলিমদের উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও তাদের উৎসবের দিনকে সম্মান করা কুফরির লক্ষণ। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৭৫৪)

সারকথা: পহেলা বৈশাখকে ধর্মীয়/সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে পালন করা, বিশেষত এর আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া হারাম। তবে তারিখ হিসেবে দিনটি জানা বা ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশে ব্যবহার করা (উৎসব হিসেবে নয়) জায়েজ।


৪. মঙ্গল শোভাযাত্রা

বিধান: হারাম। কারণ—

  • এটি পহেলা বৈশাখের অংশ হিসেবে পালিত হয়, যা অমুসলিম উৎসবের সাথে সম্পৃক্ত।
  • এতে বিভিন্ন প্রাণীর মুখোশ, মূর্তি-সদৃশ প্রতীক ও পৌত্তলিক সাংস্কৃতিক উপাদান থাকে।
  • রাসূল ﷺ বলেন: “যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করল, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (সুনানে আবু দাউদ: ৪০৩১)

সারকথা: মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ বা এটিকে সমর্থন করা হারাম।


৫. মঙ্গল প্রদীপ

বিধান: হারাম। কারণ—

  • প্রদীপ জ্বালিয়ে ‘মঙ্গল’ কামনা করা হিন্দু ধর্মীয় আচারের অনুকরণ।
  • ইসলামে আগুন-কেন্দ্রিক মঙ্গলাচার বা প্রদীপ-পূজার কোনো ভিত্তি নেই।
  • রাসূল ﷺ আগুনকে মঙ্গল-অমঙ্গলের কারণ মনে করতে নিষেধ করেছেন (সহিহ মুসলিম: ২২২৪)।

সারকথা: মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো বা এ ধরনের আচারে অংশ নেওয়া হারাম।


৬. বসন্তোৎসব

বিধান: মূলত জায়েজ নয়, বরং নিষিদ্ধ—যদি তা অমুসলিম উৎসবের অনুকরণ হয়। বসন্তোৎসব (বসন্ত উৎসব) মূলত হিন্দু/পৌত্তলিক বসন্ত-উৎসবের অনুকরণ। এতে সাধারণত নৃত্য, গান, পুষ্পার্ঘ্য ইত্যাদি থাকে। তবে বসন্ত ঋতুকে উপভোগ করা, ফুল-ফল দেখা, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপলব্ধি করা—এসব জায়েজ; নিষিদ্ধ নয়।

সারকথা: উৎসব হিসেবে অমুসলিম আচার-অনুষ্ঠানসহ পালন করা হারাম; প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ জায়েজ।


৭. নৃত্য

বিধান: পুরুষ-নারীর জন্য সাধারণভাবে হারাম; বিশেষত অমুসলিম উৎসবের অংশ হিসেবে তো অবশ্যই হারাম।

দলিল—

  • আল্লাহ বলেন: وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ — “আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না।” (সূরা বনী ইসরাইল: ৩২)
  • রাসূল ﷺ বলেন: “নিশ্চয়ই আমি গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র হারাম করেছি।” (সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৮৮)
  • ইমাম ইবনে আবিদিন বলেন, নাচ-গান ও বাদ্যযন্ত্রের মজলিস ফাসিকদের মজলিস। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৪৮)

সারকথা: নৃত্য হারাম; বিশেষত উৎসবের অংশ হিসেবে তো নিঃসন্দেহে হারাম।


‘অমুসলিমদের প্রতীক’ বলে?

প্রশ্নের শেষ অংশে এসেছে—এগুলোকে ‘অমুসলিমদের প্রতীক’ বলা যায় কি না। এর উত্তর:

  • উত্তরীয়: সাধারণ বস্ত্র, অমুসলিমদের প্রতীক নয়।
  • জয় বাংলা: রাজনৈতিক স্লোগান; ধর্মীয় প্রতীক নয়, তবে ইসলামবিরোধী আদর্শের প্রতীক হতে পারে।
  • চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, মঙ্গল প্রদীপ, বসন্তোৎসব: এগুলো মূলত অমুসলিম (হিন্দু/পৌত্তলিক) সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উৎসবের প্রতীক। মুসলিমদের জন্য এগুলোতে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ।
  • নৃত্য: সর্বজনীনভাবে নিষিদ্ধ; অমুসলিম উৎসবের সাথে যুক্ত হলে আরও গুরুতর।

সারসংক্ষেপ সারণি

| বিষয় | বিধান | কারণ | |---|---|---| | উত্তরীয় | জায়েজ (শর্তসাপেক্ষ) | সাধারণ বস্ত্র; রেশম পুরুষের জন্য নিষিদ্ধ | | জয় বাংলা স্লোগান | নিজে হারাম নয়, সতর্কতা | ইসলামবিরোধী আদর্শের প্রতীক হলে নিষিদ্ধ | | চৈত্র সংক্রান্তি / পহেলা বৈশাখ | উৎসব হিসেবে হারাম | অমুসলিম উৎসবের অনুকরণ | | মঙ্গল শোভাযাত্রা | হারাম | অমুসলিম উৎসব ও পৌত্তলিক প্রতীক | | মঙ্গল প্রদীপ | হারাম | হিন্দু আচারের অনুকরণ | | বসন্তোৎসব | উৎসব হিসেবে হারাম | অমুসলিম আচারের অনুকরণ | | নৃত্য | হারাম | শরীয়তবিরোধী; উৎসবে আরও গুরুতর |


উপদেশ

মুসলিম হিসেবে আমাদের পরিচয় ও উৎসব হবে ইসলামের। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ “বলো, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু—সবই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য।” (সূরা আনআম: ১৬২)

অমুসলিমদের উৎসব-আচার থেকে দূরে থাকা এবং ইসলামের নিজস্ব উৎসব (ঈদাইন) ও সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.