উত্তরীয় পড়া জায়েজ কিনা
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তরীয়, জয় বাংলা স্লোগান, চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, মঙ্গল প্রদীপ, বসন্তোৎসব, নৃত্য — এসব কি হারাম? কোনটি কেন? অমুসলিমদের প্রতীক বলে?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—উত্তরীয় পরিধান, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান, চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, মঙ্গল প্রদীপ, বসন্তোৎসব ও নৃত্য—এগুলো ইসলামে হারাম কি না; কোনটি কেন হারাম; আর এগুলোকে ‘অমুসলিমদের প্রতীক’ বলা যায় কি না।
ভূমিকা: মূল নীতি
ইসলামে কোনো কাজ হারাম বা হালাল হওয়ার বিধান নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের উপর:
- কাজটির নিজস্ব প্রকৃতি (যেমন—নৃত্য, মূর্তিপূজা, আগুন-পূজা ইত্যাদি)।
- উদ্দেশ্য ও বিশ্বাস (নিয়ত ও আকীদা)।
- অমুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা প্রতীকের সাথে সাদৃশ্য (তাশাব্বুহ)।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ “আর তোমরা জালিমদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না, তাহলে তোমাদেরও আগুন স্পর্শ করবে।” (সূরা হুদ: ১১৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ “যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করল, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (সুনানে আবু দাউদ: ৪০৩১; মুসনাদে আহমাদ)
ইমাম ইবনে আবিদিন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এই হাদীসের ভিত্তিতে অমুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে সাদৃশ্য অবলম্বন নিষিদ্ধ। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৭৫৪)
এক এক করে বিধান
১. উত্তরীয় (শাল/উত্তরীয় পরিধান)
যদি তাতে শরীয়াহ বিরোধী কোনো চিহ্ন/প্রতিক না থাকে,কোনো প্রানীর ছবি না থাকে,তাহলে তা জায়েজ।
তবে শরীয়তের গন্ডির বাইরে হলে তাহা ব্যবহার করা জায়েজ নয়।
পাশাপাশি পুরুষের ক্ষেত্রে রেশমি উত্তরীয় নিষিদ্ধ (রাসূল ﷺ বলেছেন: “আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য রেশম ও স্বর্ণ হারাম।” — সুনানে তিরমিজি: ১৭২০)।
- নারীর ক্ষেত্রে পর্দার শর্ত।
- কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে বিশেষ তাৎপর্যে ব্যবহার করলে তাশাব্বুহের দিকে যাবে।
সারকথা: সাধারণভাবে উত্তরীয় হারাম নয়; তবে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করলে সতর্কতা।
২. ‘জয় বাংলা’ স্লোগান
বিধান: নিজে হারাম নয়, তবে সতর্কতা। ‘জয় বাংলা’ একটি রাজনৈতিক/জাতীয়তাবাদী স্লোগান। ইসলামে কোনো ভাষা বা স্লোগান নিজে হারাম নয়; হারাম হয় তার পেছনের বিশ্বাস ও ব্যবহার।
তবে দুটি বিষয় লক্ষণীয়:
- যদি স্লোগানটি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বা ইসলামবিরোধী কোনো আদর্শের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।
- মুসলিম হিসেবে আমাদের মূল স্লোগান ও পরিচয় হবে ইসলামের; আল্লাহ বলেন: هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ — “তিনি তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলিম।” (সূরা হজ: ৭৮)
সারকথা: স্লোগানটি নিজে হারাম নয়; কিন্তু কোনো ইসলামবিরোধী আদর্শের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার হলে তা নিষিদ্ধ।
৩. চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ
বিধান: ধর্মীয় আচার হিসেবে পালন করা হারাম; নিছক কালপঞ্জি হিসেবে তারিখ জানা জায়েজ।
কারণ—
- চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ মূলত হিন্দু সৌর পঞ্জিকা ও বাংলা নববর্ষ কেন্দ্রিক উৎসব, যার সাথে হিন্দু ধর্মীয় আচার (হালখাতা, পূজা, মঙ্গল শোভাযাত্রা) জড়িত।
- মুসলিমদের জন্য উৎসব কেবল দুটি—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। রাসূল ﷺ মদিনায় এসে দেখলেন লোকেরা দুটি দিনে খেলাধুলা করে; তিনি বললেন: “আল্লাহ তোমাদের জন্য এর চেয়ে উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা।” (সুনানে আবু দাউদ: ১১৩৪)
- ইমাম ইবনে আবিদিন বলেন, অমুসলিমদের উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও তাদের উৎসবের দিনকে সম্মান করা কুফরির লক্ষণ। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৭৫৪)
সারকথা: পহেলা বৈশাখকে ধর্মীয়/সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে পালন করা, বিশেষত এর আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া হারাম। তবে তারিখ হিসেবে দিনটি জানা বা ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশে ব্যবহার করা (উৎসব হিসেবে নয়) জায়েজ।
৪. মঙ্গল শোভাযাত্রা
বিধান: হারাম। কারণ—
- এটি পহেলা বৈশাখের অংশ হিসেবে পালিত হয়, যা অমুসলিম উৎসবের সাথে সম্পৃক্ত।
- এতে বিভিন্ন প্রাণীর মুখোশ, মূর্তি-সদৃশ প্রতীক ও পৌত্তলিক সাংস্কৃতিক উপাদান থাকে।
- রাসূল ﷺ বলেন: “যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করল, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (সুনানে আবু দাউদ: ৪০৩১)
সারকথা: মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ বা এটিকে সমর্থন করা হারাম।
৫. মঙ্গল প্রদীপ
বিধান: হারাম। কারণ—
- প্রদীপ জ্বালিয়ে ‘মঙ্গল’ কামনা করা হিন্দু ধর্মীয় আচারের অনুকরণ।
- ইসলামে আগুন-কেন্দ্রিক মঙ্গলাচার বা প্রদীপ-পূজার কোনো ভিত্তি নেই।
- রাসূল ﷺ আগুনকে মঙ্গল-অমঙ্গলের কারণ মনে করতে নিষেধ করেছেন (সহিহ মুসলিম: ২২২৪)।
সারকথা: মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো বা এ ধরনের আচারে অংশ নেওয়া হারাম।
৬. বসন্তোৎসব
বিধান: মূলত জায়েজ নয়, বরং নিষিদ্ধ—যদি তা অমুসলিম উৎসবের অনুকরণ হয়। বসন্তোৎসব (বসন্ত উৎসব) মূলত হিন্দু/পৌত্তলিক বসন্ত-উৎসবের অনুকরণ। এতে সাধারণত নৃত্য, গান, পুষ্পার্ঘ্য ইত্যাদি থাকে। তবে বসন্ত ঋতুকে উপভোগ করা, ফুল-ফল দেখা, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপলব্ধি করা—এসব জায়েজ; নিষিদ্ধ নয়।
সারকথা: উৎসব হিসেবে অমুসলিম আচার-অনুষ্ঠানসহ পালন করা হারাম; প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ জায়েজ।
৭. নৃত্য
বিধান: পুরুষ-নারীর জন্য সাধারণভাবে হারাম; বিশেষত অমুসলিম উৎসবের অংশ হিসেবে তো অবশ্যই হারাম।
দলিল—
- আল্লাহ বলেন: وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ — “আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না।” (সূরা বনী ইসরাইল: ৩২)
- রাসূল ﷺ বলেন: “নিশ্চয়ই আমি গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র হারাম করেছি।” (সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৮৮)
- ইমাম ইবনে আবিদিন বলেন, নাচ-গান ও বাদ্যযন্ত্রের মজলিস ফাসিকদের মজলিস। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৪৮)
সারকথা: নৃত্য হারাম; বিশেষত উৎসবের অংশ হিসেবে তো নিঃসন্দেহে হারাম।
‘অমুসলিমদের প্রতীক’ বলে?
প্রশ্নের শেষ অংশে এসেছে—এগুলোকে ‘অমুসলিমদের প্রতীক’ বলা যায় কি না। এর উত্তর:
- উত্তরীয়: সাধারণ বস্ত্র, অমুসলিমদের প্রতীক নয়।
- জয় বাংলা: রাজনৈতিক স্লোগান; ধর্মীয় প্রতীক নয়, তবে ইসলামবিরোধী আদর্শের প্রতীক হতে পারে।
- চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, মঙ্গল প্রদীপ, বসন্তোৎসব: এগুলো মূলত অমুসলিম (হিন্দু/পৌত্তলিক) সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উৎসবের প্রতীক। মুসলিমদের জন্য এগুলোতে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ।
- নৃত্য: সর্বজনীনভাবে নিষিদ্ধ; অমুসলিম উৎসবের সাথে যুক্ত হলে আরও গুরুতর।
সারসংক্ষেপ সারণি
| বিষয় | বিধান | কারণ | |---|---|---| | উত্তরীয় | জায়েজ (শর্তসাপেক্ষ) | সাধারণ বস্ত্র; রেশম পুরুষের জন্য নিষিদ্ধ | | জয় বাংলা স্লোগান | নিজে হারাম নয়, সতর্কতা | ইসলামবিরোধী আদর্শের প্রতীক হলে নিষিদ্ধ | | চৈত্র সংক্রান্তি / পহেলা বৈশাখ | উৎসব হিসেবে হারাম | অমুসলিম উৎসবের অনুকরণ | | মঙ্গল শোভাযাত্রা | হারাম | অমুসলিম উৎসব ও পৌত্তলিক প্রতীক | | মঙ্গল প্রদীপ | হারাম | হিন্দু আচারের অনুকরণ | | বসন্তোৎসব | উৎসব হিসেবে হারাম | অমুসলিম আচারের অনুকরণ | | নৃত্য | হারাম | শরীয়তবিরোধী; উৎসবে আরও গুরুতর |
উপদেশ
মুসলিম হিসেবে আমাদের পরিচয় ও উৎসব হবে ইসলামের। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ “বলো, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু—সবই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য।” (সূরা আনআম: ১৬২)
অমুসলিমদের উৎসব-আচার থেকে দূরে থাকা এবং ইসলামের নিজস্ব উৎসব (ঈদাইন) ও সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।