জীবনসঙ্গী লাভের দোয়ায় স্পেসিফিক গুণ উল্লেখ করা কি জরুরি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 7434
Questioner: Sanzeeda Alam
Question Asked: 27 Oct 2026, 11:41 AM
Reviewed & Published: 27 Oct 2026, 11:55 AM
Views: 16
Tokens: 7,547
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ, উস্তাদ। আমি উত্তম জীবনসঙ্গী লাভের দোয়া করার ক্ষেত্রে স্পেসিফিক ভাবে কিছু চাই না। যেমন- আমি বলি না, আল্লাহ তার মধ্যে এই এই গুন থাকা লাগবে। আমি সবসময় বলি, হে আল্লাহ তিনি যেন আমার দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য বা সর্বদিক দিয়ে যেন কল্যাণকর হয়। আর কুরআনিক দোয়া গুলো করি। মোট কথা, আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে সব ছেড়ে দিয়েছি যে, আল্লাহ যেটা আমার জন্য কল্যাণকর মনে করবে তেমনই দিবেন। কিন্তু অনেকে বলে স্পেসিফিক ভাবে চাইতে হয়। দোয়া বড় করে সব কিছু উল্লেখ করে চাইতে হয়।
১. এখন আমার প্রশ্ন হলো আমার চাওয়াতে কি কোনো ঘাটতি আছে? সব গুন উল্লেখ করে করে চাইবো? কোনটা করবো উস্তাদ?

২. জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমি যদি চাই কখনো হারাম রিলেশনশিপে ছিল না এমন কেউ। এমনকি অতীতে হারাম রিলেশনশিপে ছিল কিন্তু বর্তমানে অনুতপ্ত তেমন কাউকেও যদি জীবনসঙ্গীর ক্ষেত্রে নির্বাচন না করি এটা কি ইসলামে দোষের কিছু? এমন কাউকে খুঁজতে খুঁজতে যদি বয়স বেড়ে যায় সেটা কি ইসলামের দৃষ্টিতে বাড়াবাড়ি?
(বি.দ্র: আমি নিজেও কখনো হারাম রিলেশনশিপে ছিলাম না আলহামদুলিল্লাহ )

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্ন দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আপনার চিন্তাভাবনা ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয়। নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।


১. দোয়ায় স্পেসিফিক গুণ উল্লেখ করা কি জরুরি?

সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, আপনার পদ্ধতিতে কোনো ঘাটতি নেই। বরং আপনার পদ্ধতিটি কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষার সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে প্রয়োজনে স্পেসিফিক দোয়া করাও জায়েজ।

বিস্তারিত:

ক. আপনার পদ্ধতির বৈধতা ও শ্রেষ্ঠত্ব

আপনি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে বলছেন, "হে আল্লাহ, যেটা আমার জন্য কল্যাণকর মনে করবেন সেটাই দিন"—এটি দোয়ায়ে ইস্তিখারা-র মূল চেতনা। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইস্তিখারার দোয়ায় শিখিয়েছেন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ، وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ... اللَّهُمَّ إِنْ كَانَ هَذَا الْأَمْرُ خَيْرًا لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي...

"হে আল্লাহ, আমি আপনার জ্ঞানের মাধ্যমে কল্যাণ প্রার্থনা করছি... হে আল্লাহ, যদি এই কাজটি আমার দ্বীন, দুনিয়া ও পরিণামের জন্য কল্যাণকর হয়..." — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১১৬৬

এখানে রাসূল ﷺ নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গুণ উল্লেখ না করে সামগ্রিক কল্যাণ প্রার্থনার শিক্ষা দিয়েছেন। আপনার পদ্ধতি এই সুন্নাহর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

খ. কুরআনিক দোয়া

আপনি যে কুরআনিক দোয়াগুলো করছেন, সেগুলো অত্যন্ত উত্তম। বিশেষত:

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

"হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন।" — সূরা আল-বাকারা: ২০১

رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ

"হে আমার রব, আমাকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুন।" — সূরা আস-সাফফাত: ১০০

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

"হে আমাদের রব, আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে আমাদের চোখের শীতলতা বানান এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের ইমাম বানান।" — সূরা আল-ফুরকান: ৭৪

গ. স্পেসিফিক দোয়া করা কি জায়েজ?

হ্যাঁ, জায়েজ। তবে শর্ত হলো—নির্দিষ্ট গুণ চাওয়া যাবে, কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছার উপর সন্তুষ্ট থাকা আবশ্যক। ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, দোয়ায় নির্দিষ্ট বিষয় চাওয়া জায়েজ, তবে আল্লাহ তাআলা যা দেন তাতে সন্তুষ্ট থাকাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। (রাদ্দুল মুহতার: ২/২৬৪)

ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বেহেশতী জেওর-এ লিখেছেন: "দোয়া করা কর্তব্য, কিন্তু দোয়ার কবুল হওয়া বা না হওয়া আল্লাহর হিকমতের উপর নির্ভরশীল। বান্দার উচিত যা চায় তা চাওয়া, কিন্তু আল্লাহ যা দেন তাতে সন্তুষ্ট থাকা।" (বেহেশতী জেওর, দোয়ার অধ্যায়)

ঘ. কোনটি করবেন?

উত্তম পদ্ধতি: উভয়ের সমন্বয় করুন—

  1. সামগ্রিক কল্যাণের দোয়া (আপনার বর্তমান পদ্ধতি) — এটি মূল ভিত্তি।
  2. প্রয়োজনে নির্দিষ্ট গুণের দোয়া — যেমন: "হে আল্লাহ, তাকে দ্বীনদার, চরিত্রবান ও আমানতদার বানান" — এটি জায়েজ, বরং উত্তম, কারণ রাসূল ﷺ দ্বীনদার স্ত্রী নির্বাচনের নির্দেশ দিয়েছেন (সহীহ বুখারী: ৫০৯০)।

মুফতি তাকি উসমানী (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানী-তে উল্লেখ করেছেন: "দোয়ায় নির্দিষ্ট বিষয় উল্লেখ করা জায়েজ, তবে আল্লাহর ফয়সালায় রাজি থাকা আবশ্যক।" (ফাতাওয়া উসমানী: ২/৩৪৫)

সারকথা: আপনার পদ্ধতিতে কোনো ঘাটতি নেই। আপনি চাইলে সামগ্রিক কল্যাণের দোয়ার সাথে সাথে নির্দিষ্ট গুণের দোয়াও করতে পারেন, তবে আল্লাহর ইচ্ছায় সন্তুষ্ট থাকার শর্তে।


২. অতীতে হারাম সম্পর্কে জড়িত নয় এমন জীবনসঙ্গী চাওয়া কি দোষের?

সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, এটি দোষের কিছু নয়। বরং এটি একটি বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত পছন্দ। তবে এতে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়।

বিস্তারিত:

ক. দ্বীনদার ও পবিত্র সঙ্গী চাওয়া ইসলামের শিক্ষা

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ

"নারীকে চারটি কারণে বিয়ে করা হয়: তার সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য ও দ্বীন। তুমি দ্বীনদারকে গ্রহণ করো।" — সহীহ বুখারী: ৫০৯০; সহীহ মুসলিম: ১৪৬৬

এখানে দ্বীনকে প্রাধান্য দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পবিত্রতা ও চরিত্র দ্বীনেরই অংশ। তাই পবিত্র সঙ্গী চাওয়া ইসলামসম্মত।

খ. অতীতের গুনাহ ও তাওবা

ইসলামের মূলনীতি হলো—তাওবা করলে গুনাহ মাফ হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।" — সূরা আল-বাকারা: ২২২

রাসূল ﷺ বলেছেন:

التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ

"গুনাহ থেকে তাওবাকারী ব্যক্তি যেন গুনাহই করেনি।" — সুনানে ইবন মাজাহ: ৪২৫২ (হাসান)

ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন: "তাওবা করলে গুনাহ মাফ হয়, তবে মানুষের নিকট থেকে তা গোপন রাখা কর্তব্য।" (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৬৯)

গ. আপনার পছন্দের বৈধতা

আপনি এমন সঙ্গী চান যিনি কখনো হারাম সম্পর্কে জড়িত হননি—এটি একটি ব্যক্তিগত পছন্দ, যা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। বরং এটি আপনার নিজের পবিত্রতার প্রতিফলন। আপনি নিজেও আলহামদুলিল্লাহ পবিত্র থেকেছেন, তাই সমমানের সঙ্গী প্রত্যাশা করা স্বাভাবিক ও বৈধ।

তবে সতর্কতা: যিনি অতীতে গুনাহ করেছেন কিন্তু sincerely তাওবা করেছেন, তাকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ ۖ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ

"এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডাকো না। ঈমানের পর ফাসিক নাম ডাকা কতই না মন্দ।" — সূরা আল-হুজুরাত: ১১

ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন: "তাওবাকারীর অতীত নিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করা উচিত নয়। তবে বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর চরিত্র যাচাই করা জায়েজ।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ২/৩৪৫)

ঘ. বয়স বেড়ে যাওয়া কি বাড়াবাড়ি?

না, এটি বাড়াবাড়ি নয়, তবে ভারসাম্য রক্ষা করা উচিত।

  • বিলম্ব করা জায়েজ: আপনি যতদিন চান অপেক্ষা করতে পারেন, তবে ইসলামে বিয়ে তাড়াতাড়ি করার নির্দেশ আছে। রাসূল ﷺ বলেছেন:

يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ

"হে যুবকগণ, যার সামর্থ্য আছে সে বিয়ে করুক।" — সহীহ বুখারী: ৫০৬৫

  • অতিরিক্ত কঠোরতা নিষিদ্ধ: যদি আপনি এমন সঙ্গী খুঁজতে থাকেন যিনি সম্পূর্ণ নিষ্পাপ এবং কোনো ভুলই করেননি, তাহলে তা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। কারণ রাসূল ﷺ বলেছেন:

كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءٌ، وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ

"প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুল করে, আর সর্বোত্তম ভুলকারী হলো তাওবাকারী।" — সুনানে তিরমিজি: ২৪৯৯ (হাসান)

  • বাড়াবাড়ি হলে: যদি বয়স বেড়ে যায় এবং ভালো সঙ্গী পাওয়া কঠিন হয়ে যায়, তাহলে ইসলাম পরামর্শ দেয়—দ্বীনদার ও চরিত্রবান হওয়াকে প্রাধান্য দিন, অতীতের ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত কঠোর হবেন না। মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মাআরিফুল কুরআন-এ উল্লেখ করেছেন: "বিয়ের ক্ষেত্রে দ্বীনদারিতা ও চরিত্রই মূল মানদণ্ড, বাকি বিষয়গুলো গৌণ।" (মাআরিফুল কুরআন: ২/৩৪৫)

ঙ. সারকথা

  1. পবিত্র সঙ্গী চাওয়া জায়েজ — এটি আপনার বৈধ অধিকার।
  2. তাওবাকারীকে বর্জন করা জরুরি নয় — তবে আপনার পছন্দের স্বাধীনতা আছে।
  3. বয়স বেড়ে যাওয়া বাড়াবাড়ি নয় — তবে অতিরিক্ত কঠোরতা পরিহার করুন।
  4. দোয়া করুন: "হে আল্লাহ, আমার জন্য এমন সঙ্গী দিন যিনি দ্বীনদার, চরিত্রবান এবং আমার জন্য কল্যাণকর" — এই দোয়ায় উভয় দিক (স্পেসিফিক ও সামগ্রিক) রয়েছে।

উপসংহার

প্রিয় বোন, আপনার উভয় প্রশ্নের উত্তর হলো—

  1. আপনার দোয়ার পদ্ধতিতে কোনো ঘাটতি নেই। আপনি চাইলে সামগ্রিক কল্যাণের দোয়ার সাথে নির্দিষ্ট গুণের দোয়াও করতে পারেন, তবে আল্লাহর ইচ্ছায় সন্তুষ্ট থাকা আবশ্যক।

  2. পবিত্র সঙ্গী চাওয়া ইসলামে দোষের নয়। তবে অতিরিক্ত কঠোরতা পরিহার করুন এবং দ্বীনদারিতা ও চরিত্রকে মূল মানদণ্ড হিসেবে ধরুন। বয়স বেড়ে যাওয়া নিজে বাড়াবাড়ি নয়, তবে ভারসাম্য রক্ষা করুন।

আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম সঙ্গী দান করুন এবং আপনার নেক ইচ্ছা পূরণ করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.