ব্যাংকের সুদি টাকা দিয়ে ভাইয়ের বিয়ে, কোরআন হিফজের খরচ বা ঘর নির্মাণ করা যাবে কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
ব্যাংকে সঞ্চিত টাকা বাবদ যে সুদ আসে তা কি-
১। আপন ভাইকে বিয়ের খরচের জন্য দেয়া যাবে? ভাই এর কাছে সঞ্চিত টাকা আছে ১লাখ, বেসরকারি জব করে, ২০ হাজারের মত স্যালারি। এছাড়া আর কিছু নেই। পিতা জীবিত এবং মোটামুটি মানের কিছু জমি আছে। পেনশনের টাকায় এবং ছেলেদের দেয়া টাকায় চলেন।
২। কোরআন হিফজ করছে এমন ছেলের পিছনে খরচ করা যাবে? ছেলের পিতা ও ভাই যে কাজ করে তাতে ছেলের খরচ চালাতে কষ্ট হচ্ছে।
৩। ঘর বানানোর কাজ এ দেয়া যাবে?
মহিলার স্বামীর ইনকাম খুব বেশি না। তাদের ২জন ও ৩সন্তানের চলে যায়। বর্তমানে বাপের বাড়ি আছে। ভাইয়েরা ২জন বিদেশ ও ১ জন ঢাকার দিকে ব্যবসা করে। তারা ঘর করতে সাহায্য করবে।
Answer
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
ব্যাংকের জমা টাকার ওপর অর্জিত সুদের শরঈ বিধান হলো—এই টাকা নিজের জন্য ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম। ব্যাংকের এই সুদের টাকা সওয়াবের নিয়ত ছাড়া স্রেফ দায়মুক্তির উদ্দেশ্যে কোনো শরঈ ফকীর বা অভাবী ব্যক্তিকে দিয়ে দেওয়া আবশ্যক।
আপনার প্রশ্ন ৩টির শরঈ সমাধান এবং ফিকহে হানাফীর প্রামাণ্য কিতাবের হাওয়ালা (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ) নিচে পর্যায়ক্রমে প্রদান করা হলো:
১. আপন ভাইয়ের বিয়ের খরচে সুদের টাকা দেওয়া যাবে কি?
উত্তর: যদি আপন ভাই শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে 'ফকীর' বা অভাবী হন, তবে তাকে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া সুদের টাকা দেওয়া জায়েয।
- শরঈ শর্তাবলি:
- যদি ভাইয়ের জমানো ১ লাখ টাকা ও মাসিক আয় ২০ হাজার টাকা সত্ত্বেও তিনি যাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হন (অর্থাৎ নিসাব পরিমাণ উদ্বৃত্ত হালাল সম্পদ ও সোনা/রূপা না থাকে) এবং বড় ধরণের পারিবারিক/বিয়ের খরচের ক্ষেত্রে অভাবগ্রস্ত হন, তবে তাকে শরঈ ফকীর হিসেবে এই টাকা দেওয়া যাবে।
- তবে যদি ভাইয়ের কাছে থাকা ১ লাখ টাকা বা সঞ্চয় যাকাতের নিসাব পরিমাণ হয়, তবে তিনি ফিকহের দৃষ্টিতে 'ধনী/নিসাবধারী' বলে গণ্য হবেন। সে ক্ষেত্রে তাকে সুদের টাকা দেওয়া যাবে না।
- দেওয়া যাবে কেবল সওয়াবের নিয়ত ছাড়া, স্রেফ হারাম মাল থেকে মুক্তি পাওয়ার উদ্দেশ্যে।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৮৫ ও ২০৮–২০৯ (অধ্যায়: 'অমালিকানাধীন হারাম অর্থ-সম্পদের বিধান ও ব্যবহারবিধি')।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৯০ (অধ্যায়: যাকাত ও সদকার মাসরিফ, ২য় পরিচ্ছেদ)।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১৬তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৬৯–৫৭০ (অধ্যায়: হারাম মাল ও সদকা)।
২. কুরআন হিফজ করছে এমন অভাবী ছেলের পড়াশোনার খরচে দেওয়া যাবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, হিফজ পড়ুয়া ছাত্র বা তার পরিবার যদি শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে অভাবী/ফকীর হয়, তবে তার পড়াশোনা বা আনুষঙ্গিক খরচে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া সুদের টাকা প্রদান করা জায়েয।
- শরঈ কারণ: দ্বীনী ইলম শিক্ষারত অভাবী সন্তান ও তার পরিবারকে এই টাকা দিলে হারাম মাল থেকে নিজের দায়িত্বমুক্তি ঘটে এবং একজন অভাবী দ্বীনী শিক্ষার্থী সাহায্যপ্রাপ্ত হয়। তবে এই টাকা প্রদান করার সময় কোনো সওয়াবের আশা করা যাবে না।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২০৮–২০৯ (অনুচ্ছেদ: 'হারাম সম্পদের সঠিক মাসরিফ ও দরিদ্রদের হক')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১৫তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫২–৫৫ (অধ্যায়: 'মাসারিফে সদকা ও অনাথাশ্রম/মাদরাসার ছাত্রদের পেছনে ব্যয়')।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৮৯–১৯০।
৩. ঘর বানানোর কাজে সুদের টাকা ব্যবহার করা যাবে কি?
উত্তর: না, নিজেদের ঘর বানানোর কাজে এই সুদের টাকা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম।
- শরঈ কারণ:
- ব্যাংকের সুদের টাকা দিয়ে নিজের বা পরিবারের কোনো ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা (যেমন: ঘর তৈরি, সংস্কার, ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি ইত্যাদি) ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিষিদ্ধ।
- তাছাড়া, প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে ওই মহিলার বাপের বাড়ির ভাইয়েরা সচ্ছল (বিদেশে কর্মরত ও ঢাকায় ব্যবসা করেন) এবং তারা ঘর তৈরিতে সাহায্য করছেন, তাই এই পরিবারটি চরম অসহায় বা বাস্তুচ্যুত নয়।
- সুদের টাকা নিজের ঘর তৈরিতে লাগালে মূলত নিজের অর্জিত হারাম টাকা দিয়ে নিজেরই উপযোগিতা অর্জন করা হয়, যা শরীয়তে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সুতরাং এই টাকা নির্ভেজালভাবে কোনো অভাবী ফকীর-মিসকীনকে দিয়ে দিতে হবে, নিজের ঘর তৈরিতে দেওয়া যাবে না।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৮৪–১৮৬, ১৯২–১৯৩ ও ২০৮–২০৯ (অধ্যায়: 'হারাম অর্থ-সম্পদের মালিকানা ও ব্যবহারবিধি — স্বীয় কাজে ব্যবহার নাজায়েয হওয়ার বিবরণ')।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৪৯ (কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১৫শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৯২–৯৫ ও ১০১–১০২ (অধ্যায়: 'হারাম মাল ও সুদের টাকার বিধান')।
আল্লাহ ভালো জানেন।