গর্ভাবস্থায় জমজ ভ্রুণের একটি নষ্ট হলে এবং লালচে/মেটে স্রাব আসলে নামাজের বিধান কী?
Taharah Purity · Hanafi
Question
একজন এর ৫ সপ্তাহের প্রেগন্যান্সিতে আল্ট্রাসাউন্ড করানোর পর দেখা গেলো যে তার ২ টি ভ্রুণ ( জমজ বাচ্চা) এর একটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং একটি ভালো আছে (আলহামদুলিল্লাহ)।
এখন তার স্রাবের সাথে লালচে বা মেটে কালারের স্রাব আসতেছে। এটি একদম সব সময় আসতেছে না। ১ দিন আসার ২ দিন আসেনি এমন স্রাব। আবার এখন প্রতিদিন ২ থেকে ১ বার করে যাচ্ছে ৩ দিন থেকে। এখন তার পেটে একটি বাচ্চার ভ্রুণ ভালো আছে। এক্ষেত্রে তার জন্য নামাজের বিধান কি হবে?
Answer
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় (গর্ভের একটি ভ্রুণ নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং অপরটি জীবিত থাকা, সাথে অনিয়মিত লালচে/মেটে রঙের স্রাব) স্রাবটি নিফাস হিসেবে গণ্য হবে না; বরং এটি ইস্তিহাযা (অসুস্থতা/রক্তস্রাব) হিসেবে গণ্য হবে। তাই তার জন্য নামাজ-রোজা বাধ্যতামূলক থাকবে। তবে সতর্কতার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং স্রাব বন্ধ হওয়ার পর নামাজ শুরু করা উত্তম।
বিস্তারিত ফিকহি আলোচনা (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)
১. নিফাসের সংজ্ঞা ও শর্ত:
নিফাস হলো সন্তান জন্মদানের পর জরায়ু থেকে নির্গত রক্ত। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, নিফাস সাব্যস্ত হওয়ার জন্য সন্তানের কোনো অঙ্গ (যেমন আঙুল, নখ, চুল ইত্যাদি) বা মাংসপিণ্ড (মুদগা) বা জমাট রক্ত (আলাকা) বের হওয়া শর্ত। শুধুমাত্র ভ্রুণ নষ্ট হওয়া বা জরায়ুতে মৃত ভ্রুণ থাকা—যতক্ষণ পর্যন্ত তা বের না হয়—নিফাসের কারণ হয় না।
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৯৮–৩০০; আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৭)
২. গর্ভাবস্থায় রক্তস্রাব:
গর্ভাবস্থায় জরায়ু থেকে রক্ত বা লালচে/মেটে স্রাব নির্গত হলে—যদি তা সন্তান প্রসবের পূর্বে হয় এবং নিফাসের শর্ত পূর্ণ না হয়—তাহলে তা ইস্তিহাযা হিসেবে গণ্য হবে। ইস্তিহাযার হুকুম হলো: নামাজ, রোজা, হজ ইত্যাদি সব ইবাদত পালন করতে হবে; তবে অযু ভঙ্গ হবে স্রাব আসার সাথে সাথে (যেমন সাধারণ রক্তস্রাবের ক্ষেত্রে)।
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৮২–২৮৪; ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪৫–১৪৬)
৩. জমজ গর্ভে একটি নষ্ট হওয়া:
জমজ গর্ভে একটি ভ্রুণ নষ্ট হয়ে গেলে এবং অপরটি জীবিত থাকলে—যতক্ষণ পর্যন্ত মৃত ভ্রুণ বা তার কোনো অংশ বের না হয়—তখন পর্যন্ত স্রাব নিফাস হবে না। যদি মৃত ভ্রুণের কোনো অংশ বের হয়, তখন নিফাসের বিধান প্রযোজ্য হবে (সর্বোচ্চ ৪০ দিন পর্যন্ত)। কিন্তু প্রশ্নে বলা হয়েছে যে ভ্রুণটি "নষ্ট হয়ে যাচ্ছে" (অর্থাৎ এখনো বের হয়নি), তাই বর্তমানে স্রাবটি ইস্তিহাযা।
(ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩০৫–৩০৬; আহকামুল কুরআন, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৯৮)
৪. অনিয়মিত স্রাব (১ দিন আসা, ২ দিন না আসা):
ইস্তিহাযার ক্ষেত্রে স্রাব অনিয়মিত হলেও নামাজ মাফ হয় না। তবে স্রাব আসার সময় অযু ভঙ্গ হবে; স্রাব বন্ধ থাকলে অযু করে নামাজ পড়া যাবে। যদি স্রাব এত অনিয়মিত হয় যে নামাজের সময়ের মধ্যে বারবার আসে, তাহলে প্রত্যেক নামাজের জন্য নতুন অযু করে পড়তে হবে।
(বাহিশতী যেওর, নামাজ অধ্যায়; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৮৬)
৫. সতর্কতা:
যেহেতু গর্ভে জীবিত সন্তান রয়েছে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। যদি চিকিৎসক বলেন যে স্রাবটি জরায়ুর কোনো সমস্যার কারণে হচ্ছে, তাহলে তা ইস্তিহাযা হিসেবেই গণ্য হবে। আর যদি মৃত ভ্রুণের কোনো অংশ বের হয়, তখন নিফাসের বিধান প্রযোজ্য হবে—সে ক্ষেত্রে ৪০ দিন পর্যন্ত নামাজ মাফ হবে (যদি স্রাব চলতে থাকে)।
(মা'আরিফুল কুরআন, সূরা বাকারা, আয়াত ২২২-এর তাফসীর; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪৫)
উপসংহার
বর্তমান অবস্থায় (মৃত ভ্রুণ জরায়ুতে থাকা এবং জীবিত ভ্রুণ থাকা) স্রাবটি ইস্তিহাযা। তাই:
- নামাজ, রোজা বাধ্যতামূলক।
- স্রাব আসলে অযু ভঙ্গ হবে; স্রাব বন্ধ হলে অযু করে নামাজ পড়তে হবে।
- যদি স্রাব এত অনিয়মিত হয় যে নামাজের ওয়াক্তে বারবার আসে, তাহলে প্রত্যেক নামাজের জন্য নতুন অযু করবে।
- মৃত ভ্রুণের কোনো অংশ বের হলে তখন নিফাসের বিধান প্রযোজ্য হবে (সর্বোচ্চ ৪০ দিন)।
- চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।
আল্লাহ তাআলা তাকে সুস্থতা ও জীবিত সন্তানের নিরাপত্তা দান করুন। আমিন।
আল্লাহ ভালো জানেন।