বিশ্বে যে সব মুসলিমরা দুরবস্থায় রয়েছে, তারা কি সচ্ছল মুসলিমদের বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকট অভিযোগ দায়ের করতে পারবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
বিশ্বের মুসলিমদের মধ্যে যারা দুরবস্থায় আছে তারা তো মাজলুম, সেই পরিপ্রেক্ষিতে যে মুসলিমরা(স্পেশালি বাঙালি সামর্থহীন)তুলনামূলক ভালো অবস্থায় আছে। এক্ষেত্রে যারা দুরবস্থায় আছে তারা কি আমাদের ব্যাপারে আল্লাহর নিকট বৈধ অভিযোগ জানাতে পারবে যা আমাদের জন্যে শাস্তি কার্যকর হবে?দুনিয়া,আখিরাতে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, কেবল দারিদ্র্য বা অসচ্ছলতার কারণে কোনো মুসলিমের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বৈধ অভিযোগ (শিকায়াত) করার অধিকার কারও নেই। তবে যদি সম্পদশালী মুসলিমরা দুরবস্থাগ্রস্তদের হক (যাকাত, ফিতরা, আত্মীয়ের হক, প্রতিবেশীর হক, ঋণ পরিশোধ, ওয়াদা রক্ষা, গিবত-অপবাদ থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি) আদায় না করে, তাহলে হক নষ্টের কারণে অভিযোগের সুযোগ থাকে—এবং তা দুনিয়া ও আখিরাতে শাস্তির কারণ হতে পারে। শুধু "সে আমার চেয়ে ভালো আছে" এ কারণে অভিযোগ করা যায় না; বরং তা হিংসা ও আল্লাহর ফয়সালার প্রতি অসন্তুষ্টির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
১. দারিদ্র্য নিজে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি নয়
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ "আল্লাহ যাকে অন্যের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন, তার জন্য তোমরা লালসা করো না।" (সূরা নিসা: ৩২)
আরও ইরশাদ:
نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُم مَّعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا "দুনিয়ার জীবনে আমি তাদের মধ্যে জীবিকা বণ্টন করেছি।" (সূরা যুখরুফ: ৩২)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
انْظُرُوا إِلَى مَنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ، فَهُوَ أَجْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ "তোমরা তোমাদের নিচের লোকদের দিকে তাকাও, উপরের দিকে তাকাও না; এতে আল্লাহর নিয়ামতকে তুচ্ছ না করার যোগ্যতা তৈরি হবে।" (সহীহ মুসলিম: ২৯৬৩)
সুতরাং কারও বেশি সম্পদ থাকা তার বিরুদ্ধে অভিযোগের কারণ নয়; বরং তা আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা ও আমানত।
২. মাজলুমের দুআ ও অভিযোগ কখন গ্রহণযোগ্য
হাদিসে এসেছে:
وَاتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ، فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ "মাজলুমের দুআ থেকে বাঁচো; কারণ তার ও আল্লাহর মধ্যে কোনো পর্দা নেই।" (সহীহ বুখারী: ১৪৯৯; সহীহ মুসলিম: ১৯)
অন্য বর্ণনায়:
دَعْوَةُ الْمَظْلُومِ مُسْتَجَابَةٌ "মাজলুমের দুআ কবুল হয়।" (সুনানে তিরমিজি: ৩৫৯৮)
কিন্তু এখানে "মাজলুম" অর্থ যার হক কেউ কেড়ে নিয়েছে বা তার উপর জুলুম করা হয়েছে। কেবল কম সম্পদশালী হওয়া "জুলুম" নয়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.)-এর নীতি হলো: "الضرر لا يكون بغير فعل" — ক্ষতি কেবল কারও কর্মের কারণেই হয়; নিছক অবস্থার পার্থক্যে নয়। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হুদুদ)
৩. সম্পদশালীদের উপর দুরবস্থাগ্রস্তদের যে হকগুলো রয়েছে
যদি এই হকগুলো নষ্ট হয়, তাহলে অভিযোগ বৈধ হতে পারে:
(ক) যাকাত ও ফিতরা: আল্লাহ বলেন:
وَآتُوا الزَّكَاةَ "এবং যাকাত দাও।" (সূরা বাকারা: ৪৩)
রাসূল ﷺ বলেছেন:
تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ فَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ "ধনীদের থেকে নিয়ে গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।" (সহীহ বুখারী: ১৩৯৫)
যাকাত আটকানো কঠোর গুনাহ; হাদিসে এর শাস্তির বিবরণ এসেছে (সহীহ মুসলিম: ৯৮৭)।
(খ) আত্মীয়তার হক (সিলাতুর রাহিম): আল্লাহ বলেন:
وَآتِ ذَا الْقُرْبَىٰ حَقَّهُ "আত্মীয়কে তার হক দাও।" (সূরা ইসরা: ২৬)
(গ) প্রতিবেশীর হক: রাসূল ﷺ বলেছেন:
مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ "জিবরীল আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত ওসিয়ত করেছেন যে, আমি ভেবেছি তিনি তাকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।" (সহীহ বুখারী: ৬০১৪)
(ঘ) ঋণ পরিশোধ, আমানত, ওয়াদা রক্ষা: এগুলো নষ্ট করা স্পষ্ট জুলুম।
(ঙ) গিবত, অপবাদ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য: আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ "তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না এবং উপহাসমূলক নামে ডাকো না।" (সূরা হুজুরাত: ১১)
রাসূল ﷺ বলেছেন:
الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ، لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يَخْذُلُهُ "মুসলিম মুসলিমের ভাই; সে তার উপর জুলুম করে না এবং তাকে অসহায় ফেলে রাখে না।" (সহীহ বুখারী: ২৪৪২)
৪. দুনিয়া ও আখিরাতের শাস্তির প্রশ্ন
- দুনিয়ায়: জুলুমের কারণে দুনিয়াতেও বিপদ আসতে পারে; হাদিসে এসেছে জুলুমের পরিণতি সম্পর্কে (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৮০)। তবে সব শাস্তি দুনিয়াতেই হয় না; অনেক কিছু আখিরাতে।
- আখিরাতে: হাদিসে এসেছে:
لَتُؤَدُّنَّ الْحُقُوقَ إِلَى أَهْلِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ "কিয়ামতের দিন অবশ্যই প্রত্যেক হকদারকে তার হক আদায় করা হবে।" (সহীহ মুসলিম: ২৫৮২)
আরও:
مَنْ كَانَتْ عِنْدَهُ مَظْلِمَةٌ لِأَخِيهِ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهَا "যার কাছে তার ভাইয়ের হক নষ্টের দায় আছে, সে যেন দুনিয়াতেই তা মিটিয়ে নেয়।" (সহীহ বুখারী: ২৪৪৯)
সুতরাং হক নষ্ট হলে অভিযোগ বৈধ এবং শাস্তি কার্যকর হতে পারে; কিন্তু শুধু ধনী-গরিবের পার্থক্যের কারণে অভিযোগ বৈধ নয়।
৫. সম্পদশালীদের করণীয়
১. যাকাত-ফিতরা সঠিকভাবে হিসাব করে আদায় করা। ২. আত্মীয়-প্রতিবেশীর হক আদায় করা; বিশেষত অসচ্ছল আত্মীয়দের প্রতি দৃষ্টি রাখা। ৩. ঋণ ও আমানত সময়মতো পরিশোধ করা। ৪. গিবত, অপবাদ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য থেকে বিরত থাকা। ৫. দুরবস্থাগ্রস্তদের প্রতি দয়া, সহযোগিতা ও সম্মান প্রদর্শন করা। ৬. নিজের সম্পদকে আল্লাহর আমানত মনে করা এবং অহংকার না করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا أَنفَقْتُم مِّنْ خَيْرٍ فَهُوَ يُخْلِفُهُ "তোমরা যা কিছু ভালো পথে ব্যয় করো, তিনি তার বিনিময় দেন।" (সূরা সাবা: ৩৯)
৬. দুরবস্থাগ্রস্তদের করণীয়
১. হিংসা ও অভিযোগের পরিবর্তে ধৈর্য ধারণ করা; আল্লাহ বলেন:
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ "নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের পুরস্কার বিনা হিসাবে দেওয়া হবে।" (সূরা যুমার: ১০)
২. নিজের হক নষ্ট হলে প্রথমে সরাসরি ভাইয়ের কাছে দাবি করা, তারপর প্রয়োজন হলে শরীয়তসম্মত পথে বিচারকের শরণাপন্ন হওয়া। ৩. দুআ করা—তবে হিংসা বা অন্যের সম্পদ ধ্বংসের কামনায় নয়; বরং নিজের জন্য কল্যাণ ও সচ্ছলতা প্রার্থনা করা। ৪. আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা; কারণ তিনিই সর্বজ্ঞ ও ন্যায়বিচারক।
উপসংহার
- শুধু দারিদ্র্য বা কম সচ্ছলতা কোনো মুসলিমের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বৈধ অভিযোগের কারণ নয়।
- হ্যাঁ, যদি সম্পদশালীরা শরীয়ত নির্ধারিত হক (যাকাত, ফিতরা, আত্মীয়-প্রতিবেশীর হক, ঋণ, আমানত, সম্মান) নষ্ট করে, তাহলে মাজলুমের অভিযোগ বৈধ এবং দুনিয়া-আখিরাতে শাস্তির কারণ হতে পারে।
- তাই সম্পদশালীদের উচিত হক আদায় করা ও বিনয়ী থাকা; দুরবস্থাগ্রস্তদের উচিত ধৈর্য, দুআ ও হিংসা পরিহার করা।
তথ্যসূত্র (হানাফি কিতাব):
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), কিতাবুয যাকাত ও কিতাবুল হুদুদ
- ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুয যাকাত
- আল-হিদায়া (মারগিনানি), কিতাবুয যাকাত
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী), যাকাত ও হকুক অধ্যায়
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি), যাকাত ও আর্থিক লেনদেন অধ্যায়
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি), সূরা নিসা ও হুজুরাতের তাফসির
- সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে তিরমিজি, সুনানে আবু দাউদ
والله أعلم بالصواب