অনুমান করে প্রশ্ন করার কারনে এসব কথা মুখে উচ্চারণ করার কারনে বিবাহিত জীবনে কোনো সমস্যা হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমি আপনাদের সাইটে পুরাতন প্রশ্ন খুজতে যেয়ে এগুলা প্রশ্ন পাই। এগুলা আমার হাসবেন্ড করেছে।
১)বিয়ের আগে এক মেয়ের সাথে কিছু দিনের পরিচয় ছিল। বিয়ের আগে একটি মেয়ের সঙ্গে কথা বলার সময় মজা করে বলেছিলাম, “বিয়ে করলে তুমি ওটা।” এখানে ‘ওটা’ বলতে আমি তালাক বুঝিয়েছিলাম। কিন্তু আমি সরাসরি ‘তালাক’ শব্দ উচ্চারণ করিনি। অন্য কোনো শব্দ বলেছিলাম কি না, তা আমার স্পষ্ট মনে নেই।
আমার প্রশ্ন হলো, এই কথার কারণে আমি পরবর্তীতে ওই মেয়েকে বিয়ে করলে বিয়ের পর কোনো শর্তযুক্ত তালাক কার্যকর হবে কি?
২)একবার আমি তাকে বলেছিলাম যে,“বিয়ে হইলে না হয় ওটা (তালাক)।” ওটা বলতে তালাক বুঝিয়েছি। কিন্তু আমি উচ্চারণ করেনি।
প্রশ্ন: “বিয়ে হইলে না হয় ওটা”—এটা বলার কারণে কি বিয়ের পরে কোনো তালাক হবে?
৩) হুজুর আমার যতদুর মনে পড়ে 1 নাম্বার এর মত করে আমাকে বলে নাই৷ আমি তো প্রায় সময় ই বেশি জানার জন্য অনেক প্রশ্ন করি। এমন করে বেশি জানার জন্য অনুমান করে প্রশ্ন করলাম এই জন্য কি এখন বিবাহিত জীবনে কোনো সমস্যা হবে?
৪)আমি হয়তো এটা সেই জন্যই করেছিলাম।
যদি এমন না বলে থাকে তাও যে আমি প্রশ্ন করতেছি, আবার অবচেতন মনে নিজে মুখে উচ্চারণ করে বলে ফেলতেছি, এভাবে বলতেছি, প্রশ্ন করতেছি আমার হাসবেন্ড বলছে কি বলে নাই নিশ্চিত না, তার পরেও এভাবে প্রশ্ন করার কারনে এটার জন্য কি কোনো সমস্যা হবে বিবাহিত জীবনে?
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আপনার উত্থাপিত ১, ২, ৩ ও ৪ নম্বর প্রশ্নগুলোর হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য কিতাব থেকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বরসহ বিস্তারিত শরঈ সমাধান নিচে প্রদান করা হলো:
১ ও ২ নম্বর প্রশ্নের উত্তর (বিয়েপূর্ব অস্পষ্ট উক্তি ও শর্তযুক্ত তালাক প্রসঙ্গ):
উত্তর: বিয়ের পূর্বে কোনো মেয়েকে উদ্দেশ্য করে সরাসরি 'তালাক' শব্দ উচ্চারণ না করে কেবল অস্পষ্ট সর্বনাম পদ ("ওটা") ব্যবহার করলে এবং মনে মনে তালাক ভাবলে বা নিয়ত করলেও, এর দ্বারা পরবর্তীতে ওই মেয়েকে বিয়ে করার পর কোনো শর্তযুক্ত তালাক (তা'লীক) কার্যকর হবে না এবং বিয়ের পর কোনো তালাক হবে না।
- শরঈ কারণ: ফিকহে হানাফী অনুযায়ী তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য মুখে স্পষ্ট 'তালাক' শব্দ অথবা শরীয়তে স্বীকৃত সুনির্দিষ্ট কীনায়াহ (অস্পষ্ট কিন্তু প্রচলিত তালাকসূচক) শব্দ উচ্চারণ করা আবশ্যক। কেবল অস্পষ্ট শব্দ বা ইশারা ব্যবহার করে মনে মনে তালাকের কথা ভাবলে মুখে স্পষ্ট উচ্চারণ ছাড়া তা শর্তযুক্ত তালাক হিসেবে গণ্য হয় না।
কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৭৪–৩৭৫ (অধ্যায়: তালাক, ফাসল ফিল কিনায়াত); এবং ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২০৩–২০৪।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১৩তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭ছে; এবং ১২তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৭৬ (বাবুল ইয়াকীন ওয়াশ-শাক্ক)।
৩ ও ৪ নম্বর প্রশ্নের উত্তর (অনুমান করে প্রশ্ন করা, অবচেতন মনে শব্দ উচ্চারণ/পুনরাবৃত্তি করা ও ওয়াসওয়াসা প্রসঙ্গ):
উত্তর: আপনার স্বামী বাস্তবে ওই কথাটি বলেছেন কি বলেননি নিশ্চিত না হয়ে কেবল বেশি জানার জন্য বা অনুমান করে প্রশ্ন করার কারণে, কিংবা প্রশ্ন করার সময় ও অবচেতন মনে ওই কথাগুলো মুখ দিয়ে উচ্চারণ বা পুনরাবৃত্তি করার কারণে আপনাদের বিবাহিত জীবনে বিন্দুমাত্র কোনো সমস্যা হবে না এবং কোনো প্রকার তালাক পতিত হবে না। আপনাদের বিবাহ সম্পূর্ণ সহীহ ও বহাল রয়েছে।
- শরঈ কারণসমূহ: ১. হিকায়াতুত তালাক (নকল/উদ্ধৃতি দেওয়ার বিধান): ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত মূলনীতি হলো—কোনো ব্যক্তি যদি মাসআলা জানার জন্য, ফতোয়া জিজ্ঞেস করার জন্য বা পূর্বের কোনো কথা বর্ণনা করার উদ্দেশ্যে তালাকের শব্দ মুখে উচ্চারণ করে বা রিটেল (উদ্ধৃতি) করে, তবে তার দ্বারা নিজের দাম্পত্য জীবনে কোনো তালাক হয় না। কারণ এতে তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছা বা নিয়ত (ইনশা/আকদ) থাকে না; বরং এটি কেবল একটি তথ্য বা বিষয়ের বিবরণ। ২. সন্দেহ ও ওয়াসওয়াসা (الشك والوسوسة): স্বামী উক্ত কথা বলেছেন কি বলেননি তা নিশ্চিত না হওয়া সত্ত্বেও মনে মনে বারবার তা নিয়ে চিন্তা করা বা ভয় পাওয়া মূলত শয়তানী 'ওয়াসওয়াসা' (কূচিন্তা)। শরীয়তের প্রতিষ্ঠিত ফিকহী কায়দা হলো: "সুনিশ্চিত বৈবাহিক সম্পর্ক নিছক অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ছিন্ন হয় না" (اليقين لا يزول بالشك)। ৩. অবচেতন মন ও মানসিক দ্বিধা: মাসআলা অনুসন্ধানের সময় অবচেতনভাবে মুখ দিয়ে শব্দগুলো বেরিয়ে আসলেও তা তালাক প্রদানের উদ্দেশ্যে নয়, তাই এর কোনো শরঈ প্রভাব আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্কের ওপর পড়বে না।
কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৮৬–২৮৭ (অনুচ্ছেদ: 'যে ব্যক্তিদের তালাক পতিত হয় না' — হিকায়াতে তালাক ও আলোচনা প্রসঙ্গে বলা কথার বিবরণ); এবং ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৭৪–৩৭৫।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১২তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৭৬ (অধ্যায়: তালাকের ক্ষেত্রে সন্দেহ ও সংশয়); এবং ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৯৬ (ওয়াসওয়াসা ও কূচিন্তার চিকিৎসা ও শরঈ হুকুম)।
- কাওয়াইদুল ফিক্বহ: পৃষ্ঠা: ১২১–১২২ (কায়দা: আল-ইয়াকীনু লা ইযালু বিশ-শাক্ক)।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩৩৫–৩৩৭ (তালাক সংক্রান্ত সন্দেহ ও উদ্ধৃতির ফিকহী বিধান)।
«وَاللَّهُ تَعَالَى أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ»