বসে সালাত
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
বসে সালাত আদায়ের বিধান: কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে
ভূমিকা
ইসলাম একটি সহজ ও সহনশীল দ্বীন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
«يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ» "আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান, কঠিনতা চান না।" (সূরা বাকারা: ১৮৫)
সালাত ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের উপর নির্ধারিত সময়ে সালাত আদায় ফরজ। তবে শরীয়ত অসুস্থতা ও অপারগতার ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছে। নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. কুরআনের দলিল
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
«فَاذْكُرُوا اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَىٰ جُنُوبِكُمْ» "তোমরা আল্লাহকে স্মরণ কর দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে।" (সূরা নিসা: ১০৩)
হানাফী তাফসীর: ইমাম আবু বকর আল-জাসসাস (রহ.) তাঁর আহকামুল কুরআন-এ বলেন, এই আয়াত প্রমাণ করে যে, অপারগতার ক্ষেত্রে দাঁড়ানো থেকে বসা এবং বসা থেকে শোয়া—এভাবে নামাজের অবস্থা পরিবর্তনের অনুমতি রয়েছে। ইমাম কুরতুবী ও ইবন কাসীর (রহ.)-ও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
২. হাদীসের দলিল
(ক) মূল হাদীস — বুখারী শরীফ
হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমার পাইলস (অর্শ) রোগ ছিল। আমি নবী ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কীভাবে সালাত আদায় করব? তিনি বললেন:
«صَلِّ قَائِمًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِدًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَى جَنْبٍ» "তুমি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করো; যদি না পারো, তবে বসে; যদি তাও না পারো, তবে কাত হয়ে (শুয়ে)।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১১১৭
(খ) নাসাঈর বর্ণনা (অতিরিক্ত অংশ)
«...فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَمُسْتَلْقِيًا، يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا» "...যদি তাও না পারো, তবে চিত হয়ে শুয়ে। আল্লাহ কারও উপর তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপান না।" — সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ১৬৬৫; মুসনাদে আহমাদ
(গ) আলী (রা.)-এর বর্ণনা — তিরমিযী
«يُصَلِّي الْمَرِيضُ قَائِمًا إِنْ اسْتَطَاعَ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ صَلَّى قَاعِدًا، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ أَنْ يَسْجُدَ أَوْمَأَ بِرَأْسِهِ...» "অসুস্থ ব্যক্তি সামর্থ্য থাকলে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করবে; না পারলে বসে; সিজদা করতে না পারলে মাথার ইশারায় (সিজদা করবে)।" — সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৭২ (হাসান সহীহ)
(ঘ) ইমাম তাহাবী (রহ.)-এর বর্ণনা
ইমাম আবু জাফর আত-তাহাবী (রহ.) তাঁর শরহু মাআনিল আছার-এ (১/৩৩৪) ইমরান ইবনে হুসাইনের হাদীস বর্ণনা করে বলেন—এটি হানাফী মাযহাবের মূল দলিল, এবং এতে প্রমাণ হয় যে, অপারগতা প্রমাণিত হলে বসে সালাত আদায় করা জায়েয, এবং তা সহীহ ও কবুলযোগ্য।
৩. হানাফী ফিকহের বিস্তারিত বিধান
(ক) মূলনীতি — আল-হিদায়া
ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী (রহ.) আল-হিদায়া-তে (কিতাবুস সালাত, বাবুল মারীয) লেখেন:
"অসুস্থ ব্যক্তি দাঁড়াতে সক্ষম হলে দাঁড়িয়ে পড়বে; দাঁড়াতে অক্ষম হলে বা দাঁড়ালে রোগ বাড়ার বা দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকলে বসে পড়বে।"
(খ) ইবন আবিদীন শামী (রহ.) — রাদ্দুল মুহতার
ইবন আবিদীন শামী (রহ.) রাদ্দুল মুহতার (২/৯৭, দারুল ফিকর সংস্করণ) -এ বলেন:
«مَرِيضٌ لَا يَقْدِرُ الْقِيَامَ أَوْ يَزِيدُ مَرَضُهُ أَوْ يَطُولُ بُرْؤُهُ صَلَّى قَاعِدًا» "যে রোগী দাঁড়াতে সক্ষম নয়, অথবা দাঁড়ালে রোগ বাড়বে, অথবা সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় লাগবে—সে বসে সালাত আদায় করবে।"
তিনি আরও বলেন: "বসে সালাত আদায়কারী রুকূ-সিজদার জন্য মাথার ইশারা করবে; সিজদার ইশারা রুকূর চেয়ে নিচু হবে।"
(গ) ফাতাওয়া আলমগীরী
ফাতাওয়া আলমগীরী (১/১৩৬, কিতাবুস সালাত) -এ উল্লেখ আছে:
"অসুস্থ ব্যক্তি যদি দাঁড়িয়ে সালাত আদায়ে রোগ বৃদ্ধি বা মৃত্যুর আশঙ্কা করে, তবে তার জন্য বসে সালাত আদায় করা জায়েয। আর যদি বসেও কষ্ট হয়, তবে কাত হয়ে শুয়ে ইশারায় সালাত আদায় করবে।"
(ঘ) ফাতাওয়া উসমানী
মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানী (১/২৩৫) -এ বলেন:
"শরীয়তের বিধান হলো—দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করা ফরজ, তবে অপারগতা বা প্রবল কষ্টের কারণে বসে আদায়ের অনুমতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শুধু সামান্য কষ্ট বা সাধারণ দুর্বলতা যথেষ্ট নয়; বরং এমন অসুস্থতা হতে হবে যা দাঁড়িয়ে সালাত আদায়ে বাধা সৃষ্টি করে বা রোগ বাড়িয়ে দেয়। "
(ঙ) ইমদাদুল ফাতাওয়া
হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/২৭) -এ বলেন:
"যদি চিকিৎসকের পরামর্শ বা নিজের প্রবল ধারণা হয় যে, দাঁড়িয়ে নামাজ পড়লে রোগ বাড়বে বা আরোগ্যে বিলম্ব হবে—তবে বসে নামাজ পড়া জায়েয, এবং নামাজ সহীহ হবে।"
(চ) বেহেশতী যেওর
হযরত থানভী (রহ.) বেহেশতী যেওর-এ (নামাজ অধ্যায়) লেখেন:
"যদি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে না পারে, বা দাঁড়ালে রোগ বেড়ে যাওয়ার বা মাথা ঘোরার প্রবল আশঙ্কা থাকে, তবে বসে নামাজ পড়বে। বসে রুকূ-সিজদা ইশারায় করবে।"
৪. "কতটুকু অসুস্থতায় বসে সালাত আদায় করা যাবে?" — বিস্তারিত
হানাফী ফকীহগণের মতে, অসুস্থতার পরিমাণ নির্ণয়ের মানদণ্ড হলো:
| অবস্থা | বিধান | |---|---| | দাঁড়ালে রোগ বেড়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা | বসে পড়া জায়েয | | দাঁড়ালে আরোগ্যে দীর্ঘ বিলম্বের আশঙ্কা | বসে পড়া জায়েয | | দাঁড়ালে অসহনীয় কষ্ট (যেমন মাথা ঘোরা, পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা) | বসে পড়া জায়েয | | শুধু সামান্য দুর্বলতা বা সাধারণ ক্লান্তি | বসে পড়া জায়েয নয়; দাঁড়িয়ে পড়তে হবে | | দাঁড়াতে সম্পূর্ণ অক্ষম | বসে পড়া ওয়াজিব |
ইবন আবিদীন (রহ.) স্পষ্ট করেন: "সামান্য কষ্ট সহ্য করে দাঁড়িয়ে পড়াই ওয়াজিব; কেননা কষ্ট তো সব সময়ই কিছু থাকে।" (রাদ্দুল মুহতার: ২/৯৭)
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) মাআরিফুল কুরআন-এ (সূরা নিসা: ১০৩-এর তাফসীরে) বলেন: "অপারগতা বলতে বোঝায়—দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করা সম্ভব নয়, অথবা সম্ভব হলেও তা রোগ বৃদ্ধি বা প্রাণনাশের কারণ হবে।"
৫. বসে সালাত কি কবুল হয়?
হ্যাঁ, অবশ্যই কবুল হয়। কারণ:
- আল্লাহ তাআলা নিজেই অনুমতি দিয়েছেন — সূরা নিসা: ১০৩ আয়াতে।
- নবী ﷺ স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন — বুখারী: ১১১৭।
- ইজমা (ঐক্যমত্য): সমস্ত ফকীহ একমত যে, শরীয়তসম্মত অপারগতায় বসে আদায়কৃত সালাত সহীহ ও কবুলযোগ্য; তাতে কোনো ঘাটতি নেই।
- হাদীসে কুদসী: আল্লাহ বলেন—"আমার বান্দা অসুস্থ হলে তাকে সেই সওয়াব দেওয়া হয়, যা সে সুস্থ থাকলে (নফল) আমলে পেত।" (সহীহ বুখারী: ৫৬৫৩)
গুরুত্বপূর্ণ: শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া অলসতা বা অবহেলায় বসে সালাত আদায় করলে তা কবুল হবে না—এটি গুনাহ। কিন্তু প্রকৃত অপারগতায় বসে আদায় করলে পূর্ণ সওয়াব ও কবুলিয়ত রয়েছে।
৬. বসে সালাত আদায়ের পদ্ধতি (হানাফী মাযহাব)
- বসার ধরন: তাশাহহুদের মতো বসে (দুই হাঁটু ভাঁজ করে) অথবা চেয়ারে/খাটে হেলান দিয়ে—যেভাবে সহজ হয়।
- রুকূ: মাথা সামনে ঝুঁকাবে; সিজদার চেয়ে কম নিচু হবে।
- সিজদা: মাথা রুকূর চেয়ে বেশি নিচু করবে।
- ইশারা: মাথার ইশারায় রুকূ-সিজদা করবে; সিজদায় ইশারা রুকূর চেয়ে নিচু হবে।
- শোয়া অবস্থায়: ডান কাত হয়ে মুখ কিবলামুখী করে ইশারায় আদায় করবে; চিত হয়ে শুলে পা কিবলামুখী করে মাথার নিচে বালিশ দিয়ে মুখ কিবলামুখী করবে।
৭. বিশেষ সতর্কতা
- চেয়ারে নামাজ: হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, প্রকৃত অপারগতা প্রমাণিত হলে চেয়ারে বসে সালাত আদায় জায়েয (ফাতাওয়া উসমানী: ১/২৪০)।
- অসুস্থতার বিচার: নিজের প্রবল ধারণা বা নির্ভরযোগ্য মুসলিম চিকিৎসকের পরামর্শের ভিত্তিতে হবে।
- সুস্থ হওয়ার পর: কাজা ওয়াজিব নয়; কারণ বসে আদায়কৃত সালাতই সহীহভাবে আদায় হয়েছে।
উপসংহার
সালাতের মূল বিধান দাঁড়িয়ে আদায় করা। কিন্তু শরীয়তের অনুমতিক্রমে প্রকৃত অপারগতা বা প্রবল কষ্টের কারণে বসে আদায়কৃত সালাত সম্পূর্ণ সহীহ, কবুলযোগ্য ও পূর্ণ সওয়াবের অধিকারী। শুধু সামান্য ক্লান্তি বা অলসতা এ অনুমতির অন্তর্ভুক্ত নয়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে শরীয়তের বিধান যথাযথভাবে পালনের তাওফিক দান করুন। আমীন।
তথ্যসূত্র
- আল-কুরআনুল কারীম — সূরা বাকারা: ১৮৫; সূরা নিসা: ১০৩
- সহীহ বুখারী — হাদীস নং ১১১৭, ৫৬৫৩
- সুনানে নাসাঈ — হাদীস নং ১৬৬৫
- সুনানে তিরমিযী — হাদীস নং ৩৭২
- ইমাম তাহাবী, শরহু মাআনিল আছার — ১/৩৩৪
- ইমাম মারগীনানী, আল-হিদায়া — কিতাবুস সালাত, বাবুল মারীয
- ইবন আবিদীন শামী, রাদ্দুল মুহতার — ২/৯৭
- ফাতাওয়া আলমগীরী — ১/১৩৬
- মুফতি তাকী উসমানী, ফাতাওয়া উসমানী — ১/২৩৫-২৪০
- আশরাফ আলী থানভী, ইমদাদুল ফাতাওয়া — ১/২৭; বেহেশতী যেওর
- মুফতি মুহাম্মদ শফী, মাআরিফুল কুরআন — সূরা নিসা: ১০৩-এর তাফসীর
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।