দুরুদে মুক্বাদ্দাস, হিযবুল বাহার ও সাত মঞ্জিল পড়া কি বিদআত?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
দুরুদে মুক্বাদ্দাস, হিযবুল বাহার ও সাত মঞ্জিল পড়া কি বিদআত?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
সরাসরি বিদআত নয় — তবে শর্তসাপেক্ষ। এগুলো মূলত মুস্তাহাব আমল (নফল ইবাদত) হিসেবে পড়া জায়েয, যদি নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূর্ণ হয়। কিন্তু এগুলোকে ফরজ-ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদার মতো আবশ্যক মনে করা, অথবা নির্দিষ্ট সময়/সংখ্যা/পদ্ধতিকে শরীয়তের অপরিবর্তনীয় বিধান মনে করা — এটা বিদআত হবে।
বিস্তারিত আলোচনা
১. মূলনীতি: নফল ইবাদতের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا» — সহীহ মুসলিম, হাদিস ১০১৭
আর নবী ﷺ ইরশাদ করেন:
«الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ» — সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৪৭৯; তিরমিজি ৩৩৭২
দুরুদ, যিকির ও দুআ মূলত ইবাদত। এগুলোর মধ্যে যা শরীয়ত-সম্মত বিষয়বস্তু রয়েছে এবং যা শরীয়তবিরোধী কিছু নেই — তা পড়া জায়েয।
২. দুরুদে মুক্বাদ্দাস সম্পর্কে
- দুরুদ পাঠ করা নিজেই কুরআন-হাদিসে প্রমাণিত ইবাদত (সূরা আহযাব: ৫৬; সহীহ বুখারী ৩৩৭০)।
- দুরুদে মুক্বাদ্দাস (দুরুদে তাজ) একটি বিস্তারিত দুরুদ, যা হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ দুরুদের অনুকরণে রচিত। এতে আল্লাহর হামদ, নবী ﷺ-এর প্রতি দুরুদ ও সালাম রয়েছে — বিষয়বস্তু শরীয়তসম্মত।
- শর্ত: এতে যদি কোনো শিরকি বা বিদআতি কথা না থাকে, এবং একে সুন্নত বা ওয়াজিব মনে না করা হয় — তবে পড়া জায়েয। বরং নেক নিয়তে পড়লে সওয়াবের আশা করা যায়।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:
«وَالْأَذْكَارُ الْمَأْثُورَةُ وَغَيْرُهَا مِنْ الْأَدْعِيَةِ الْمُبَاحَةِ إذَا لَمْ يَعْتَقِدْ سُنِّيَّةَ غَيْرِ الْمَأْثُورِ فَلَا بَأْسَ بِهَا» — রাদ্দুল মুহতার, ১/৪৯০ (দারুল ফিকর)
অর্থাৎ, বর্ণিত যিকির ছাড়া অন্য দুআ-যিকিরও জায়েয, যদি তা সুন্নত বলে বিশ্বাস না করা হয়।
৩. হিযবুল বাহার সম্পর্কে
- হিযবুল বাহার (حزب البحر) ইমাম আবুল হাসান শাযিলী (রহ.)-এর রচিত একটি দুআ-সংকলন। এটি মূলত দুআ ও যিকিরের সংকলন, যাতে আল্লাহর নাম, কুরআনের আয়াত ও নবী ﷺ-এর দুরুদ রয়েছে।
- এতে শরীয়তবিরোধী কোনো বিষয় না থাকলে এবং একে সুন্নত বা ওয়াজিব মনে না করা হলে পড়া জায়েয।
- তবে ইমাম শাযিলী (রহ.) শাযিলী তরিকার ইমাম — হানাফি ফিকহের অনুসারী নন। তাই হানাফি মাযহাবের অনুসারীদের জন্য এ ধরনের দুআ পড়া জায়েয হলেও, এগুলোকে হানাফি ফিকহের আবশ্যক আমল মনে করা যাবে না।
ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে:
«غَيْرُ الْمَأْثُورَاتِ مِنَ الْأَدْعِيَةِ إِذَا كَانَتْ خَالِيَةً عَنِ الْمُخَالَفَاتِ الشَّرْعِيَّةِ جَازَ قِرَاءَتُهَا بِلَا اعْتِقَادِ السُّنِّيَّةِ» — ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৪৫ (দারুল ইশাআত)
৪. সাত মঞ্জিল সম্পর্কে
- সাত মঞ্জিল (সাত মনজিল) মূলত দুরূদ ও সালামের একটি সংকলন, যা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত। এতে বিভিন্ন দুরুদ একত্রে সাজানো হয়েছে।
- এগুলো পড়া মুস্তাহাব হিসেবে জায়েয, যদি:
- বিষয়বস্তু শরীয়তসম্মত হয়,
- একে সুন্নত বা ওয়াজিব মনে না করা হয়,
- নির্দিষ্ট সময়/সংখ্যাকে শরীয়তের বিধান মনে না করা হয়।
হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ বলেন:
«নফল ইবাদতের মধ্যে দুআ ও দুরুদের ব্যাপারে প্রশস্ততা রয়েছে; তবে বিদআতী পদ্ধতি ও বিশ্বাস থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।» — বেহেশতী জেওর, ১ম খণ্ড, দুআ অধ্যায়
৫. কখন বিদআত হবে?
নিম্নোক্ত অবস্থায় এগুলো পড়া বিদআত হবে:
| শর্ত | ব্যাখ্যা | |------|---------| | আবশ্যক মনে করা | এগুলোকে ফরজ/ওয়াজিব/সুন্নতে মুয়াক্কাদা মনে করা | | নির্দিষ্ট সংখ্যা/সময়কে শরীয়তের বিধান মনে করা | যেমন "অমুক সময়ে অবশ্যই পড়তে হবে, নইলে গুনাহ" — এ বিশ্বাস বিদআত | | শরীয়তবিরোধী বিষয়বস্তু | যদি কোনো দুরুদে শিরকি কথা, আল্লাহর সিফাতের বিকৃতি বা নবী ﷺ-কে আল্লাহর সমান করার মতো কথা থাকে | | অন্যকে বাধ্য করা | কাউকে জোর করে বা "না পড়লে ঈমান চলে যাবে" বলে ভয় দেখানো | | সুন্নতকে বাদ দিয়ে শুধু এগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া | ফরজ-সুন্নত ছেড়ে শুধু এগুলোকে প্রধান আমল মনে করা |
ইমাম শাতিবী (রহ.) «আল-ইতিসাম»-এ বলেন:
«الْبِدْعَةُ مَا لَمْ يَكُنْ لَهُ دَلِيلٌ شَرْعِيٌّ وَلَا يَدْخُلُ تَحْتَ عُمُومِ الْأَدِلَّةِ» — আল-ইতিসাম, ১/৩৭
অর্থাৎ, যা শরীয়তের দলিলের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং শরীয়তের সাধারণ নীতির আওতায় পড়ে না — তা-ই বিদআত।
ফিকহি সিদ্ধান্ত (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)
- দুরুদে মুক্বাদ্দাস, হিযবুল বাহার, সাত মঞ্জিল — এগুলো মূলত দুআ ও যিকিরের সংকলন। বিষয়বস্তু শরীয়তসম্মত হলে এবং সুন্নত/ওয়াজিব বলে বিশ্বাস না করা হলে পড়া জায়েয ও মুস্তাহাব।
- এগুলোকে ফরজ-ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদার মতো আবশ্যক মনে করা বিদআত।
- নির্দিষ্ট সময়/সংখ্যা/পদ্ধতিকে শরীয়তের অপরিবর্তনীয় বিধান মনে করা বিদআত।
- সর্বোত্তম পথ: কুরআন-হাদিসে বর্ণিত দুরুদ (যেমন দুরুদে ইব্রাহিম) ও মাসনূন যিকিরকে প্রধান আমল হিসেবে গ্রহণ করা, এবং এগুলোকে নফল ও অতিরিক্ত হিসেবে পড়া।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) আরও বলেন:
«وَالْأَوْلَى الِاقْتِصَارُ عَلَى الْمَأْثُورِ مِنَ الْأَدْعِيَةِ وَالْأَذْكَارِ، وَمَا زَادَ عَلَيْهِ مِنْ غَيْرِ مُخَالَفَةٍ فَلَا بَأْسَ بِهِ» — রাদ্দুল মুহতার, ১/৪৯১
অর্থাৎ, উত্তম হলো বর্ণিত দুআ-যিকিরেই সীমাবদ্ধ থাকা; আর যা অতিরিক্ত, তাতে শরীয়তবিরোধী কিছু না থাকলে তাতে দোষ নেই।
উপসংহার
হ্যাঁ, পড়া যাবে — শর্ত হলো:
- বিষয়বস্তু শরীয়তসম্মত হতে হবে,
- সুন্নত/ওয়াজিব বলে বিশ্বাস করা যাবে না,
- নির্দিষ্ট সংখ্যা/সময়কে শরীয়তের বিধান মনে করা যাবে না,
- ফরজ-সুন্নতের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যাবে না।
আর যদি কেউ এগুলোকে আবশ্যক মনে করে বা শরীয়তের বিধান বানিয়ে ফেলে — তাহলে তা বিদআত হবে।