মৃত ব্যক্তির জন্য দুরুদে হাজারি পড়া সহিহ কি?
Janazah-Burial · Hanafi
Question
Answer
মৃত ব্যক্তির জন্য দুরুদে হাজারি পড়া সহিহ কি?
উত্তর
না, মৃত ব্যক্তির জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট সংখ্যায় (যেমন এক হাজারবার) দুরুদে হাজারি পড়াকে সুন্নাহ বা সহিহ আমল বলা যায় না। এটি কুরআন-হাদিসে বর্ণিত নয়, সাহাবায়ে কেরামের আমলেও পাওয়া যায় না। তবে মৃত ব্যক্তির জন্য সাধারণভাবে দুরুদ ও দুআ পাঠ করা জায়েজ ও কল্যাণকর; আর কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা (যেমন ১০০ বা ১০০০) ছাড়া সাধারণভাবে দুরুদ পড়া এবং তার সওয়াব মৃতকে পৌঁছানোর বিশ্বাস রাখা হানাফি মাজহাবে বৈধ।
বিস্তারিত আলোচনা
১. দুরুদে হাজারি কী?
"দুরুদে হাজারি" বলতে সাধারণত এমন এক বিশেষ দুরুদ বোঝানো হয়, যা নির্দিষ্ট সংখ্যায় (যেমন ১০০০ বার) পড়ার জন্য নির্ধারিত করা হয়—বিশেষত মৃত ব্যক্তির জন্য বা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে। এ ধরনের নির্দিষ্ট সংখ্যা ও বিশেষ পদ্ধতি কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়।
২. মৃতের জন্য দুরুদ ও দুআর বিধান
মৃত ব্যক্তির জন্য দুআ করা ও দুরুদ পাঠ করা মূলত জায়েজ। হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ...»
"মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি জিনিস ছাড়া..." — (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩১)
এর মধ্যে রয়েছে সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম ও নেক সন্তানের দুআ। মৃতের জন্য দুআ করা শরিয়তসম্মত।
তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা ও বিশেষ পদ্ধতি আবিষ্কার করে তাকে সুন্নাহ বা ওয়াজিব মনে করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। হাদিসে এসেছে:
«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ»
"যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।" — (সহিহ বুখারি, হাদিস ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭১৮)
৩. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মৃতের জন্য দুআ ও ইস্তিগফার করা মুস্তাহাব, এবং মৃতের জন্য কুরআন পাঠ করে সওয়াব পৌঁছানো সম্পর্কে হানাফি মাজহাবে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তবে বিশেষ সংখ্যা বা বিশেষ পদ্ধতি (যেমন নির্দিষ্ট দুরুদ ১০০০ বার পড়া) শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত নয়।
আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী জেওর"-এ এবং মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) "মাআরিফুল কুরআন"-এ মৃতের জন্য দুআ ও ঈসালে সওয়াবের বিষয়ে বিশুদ্ধ পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন—অর্থাৎ সাধারণ দুআ, কুরআন তিলাওয়াত ও সদকা, যা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।
ফাতাওয়া আলমগিরি ও আল-হিদায়া-তে মৃতের জানাজা ও দাফন-পরবর্তী দুআর বিধান বর্ণিত আছে, কিন্তু "দুরুদে হাজারি" নামে কোনো নির্দিষ্ট আমল উল্লেখ নেই।
৪. সতর্কতা
- মৃতের জন্য দুরুদ পড়া যাবে, কিন্তু নির্দিষ্ট সংখ্যা (১০০০ বার) ও বিশেষ নাম দিয়ে তাকে দ্বীনের অংশ মনে করা যাবে না।
- যদি কেউ বিশ্বাস করে যে এই নির্দিষ্ট সংখ্যায় পড়া না হলে মৃতের কোনো উপকার হবে না বা এটি সুন্নাহ—তবে তা ভ্রান্ত বিশ্বাস।
- মৃতের জন্য সবচেয়ে উপকারী আমল: দুআ, ইস্তিগফার, সদকা, এবং কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব পৌঁছানো (হানাফি মাজহাবে জায়েজ)।
উপসংহার
মৃত ব্যক্তির জন্য দুরুদ পাঠ করা বৈধ ও কল্যাণকর, কিন্তু "দুরুদে হাজারি" নামে নির্দিষ্ট সংখ্যায় বিশেষ দুরুদ পড়াকে সুন্নাহ বা সহিহ আমল বলা যায় না। এটি বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে যদি একে দ্বীনের অংশ মনে করা হয়। মৃতের জন্য দুআ, ইস্তিগফার ও সদকা করাই সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি।
References (হানাফি কিতাব)
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), কিতাবুল জানাইয
- ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল জানাইয
- আল-হিদায়া (মারগিনানি), কিতাবুল জানাইয
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)
- সহিহ বুখারি, হাদিস ২৬৯৭
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩১, ১৭১৮