আরাফার রোজা রাখা প্রসঙ্গে
Siyam-Fasting · Hanafi
Question
প্রশ্ন : বাংলাদেশ ও ভারতের মুসলিমগণ আরাফাত দিবসের রোযা কোন দিন রাখবে? সৌদি আরবের সাথে কি মিল রেখে রাখবে না কি দেশের চাঁদের হিসেবে রাখবে?
উত্তর :
আরাফা দিবসে একটি রোযার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা পেছনের ও সামনের দু বছরের গুনাহ মোচন করে দেন। আল হামদুলিল্লাহ।
এ মর্মে হাদীস হল:
عَنْ أَبِي قَتَادَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ إِنِّي أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ وَالَّتِي بَعْدَهُ
আবূ ক্বাতাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আমি আল্লাহর নিকট আরাফাত দিবসের রোযার এই সওয়াব আশা করি যে, তিনি তাঁর বিনিময়ে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন।” (সহীহ ইবনে মাজাহ হা/১৭৩০)
এ দিন হাজী সাহেবগণ আরাফার ময়দানে অধিক পরিমানে দুআ, তাসবীহ ও আল্লাহর ইবাদতে সময় অতিবাহিত করবেন আর বিশ্বমুসলিমগণ সে দিন রোযা অবস্থায় অতিবাহিত করবেন। এ দিন আল্লাহ তাআলা নিচের আসমানে অবতরণ করে অসংখ্য হাজীকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত ঘোষণা করবেন।
আরাফা দিবস কোনটি?
অধিকাংশ আলেমের বক্তব্য হলো, যিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ যে দিন হাজী সাহেবগণ আরাফার ময়দানে উপস্থিত থাকবেন সে দিনটি আরাফার দিন। সুতরাং এই দিনটিতে রোজা থাকতে হবে।
তবে কোন কোন আলেম (যেমন: আল্লামা মোহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন রহঃ) বলেন, সৌদি আরব এবং পার্শবর্তী অঞ্চলের মুসলিমগণ যাদের চাঁদের উদায়চল অভিন্ন তারা তাদের হিসেবে ৯ জিলহজে রোযা থাকবে। আর যে সব দেশের চাঁদের উদয়াচল ভিন্ন তারা তাদের দেশের চাঁদের হিসেবে ৯ যিলহজ্জ এ রোযা থাকবে। কারণ রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমরা চাঁদ দেখে রোযা রাখ আর চাঁদ দেখে রোযা ছাড়ো।”
অর্থাৎ রোযা রাখার বিষয়টি চাঁদ দেখার সাথে সম্পৃক্ত। এ বিধান রামাযান শুরু ও শেষ, আরাফা, আশুরা এবং অন্যান্য সকল রোযার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
এই হিসেবে এ বছর (২০২৬) সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিমগণ ২৬মে , মঙ্গলবার রোজা থাকবে। আর বাংলাদেশ-ভারত ও তৎসংলগ্ন দেশে সমূহে তার এক দিন পর ২৭ই মে বুধবার রোজা থাকবে।
তবে মতবিরোধ থেকে বাঁচার স্বার্থে সৌদি আরবের ৯ তারিখ এবং বাংলাদেশ, ভারত এবং তৎসংলগ্ন এলাকার ৯ তারিখ (২৬ই ও ২৭ই মে,২০২৬) এই দুইদিন রোজা রাখা হলে আশা করা যায়, নিশ্চিতভাবে এই মর্যাদা লাভ করা সম্ভব হবে।
অবশ্য কেউ যদি সৌদি আরবের হিসেবে ৯ জিলহজে কেবল একটি রোযা থাকে অথবা কেউ যদি দেশের তারিখের হিসেবে এক দিন পরে একটি রোযা রাখে তাহলে উভয়েই ইনশাআল্লাহ এই সওয়াব পাবেন। তবে উভয় দিন রোযা থাকা অধিক উত্তম এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
هذا ما أرى والله أعلم بالصواب
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
Answer
উত্তর আলোচ্য প্রশ্নোত্তরটি আরাফাত দিবসের রোযা কোন তারিখে রাখতে হবে—সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে নাকি নিজ দেশের চাঁদ দেখার ভিত্তিতে—সে বিষয়ে। উত্তরটি মূলত তিনটি অংশে বিভক্ত: (১) আরাফার রোযার ফজিলত, (২) আরাফা দিবস নির্ধারণের মতভেদ ও (৩) ব্যবহারিক সমাধান হিসেবে দুই দিন রোযা রাখার সুপারিশ। নিচে হানাফী ফিকহের আলোকে উত্তরটির সঠিকতা মূল্যায়ন করা হলো।
১. আরাফার রোযার ফজিলত ও হাদীস
প্রথম অংশে হাদীসটি সহীহ এবং ফজিলতের বিবরণ সঠিক। (সহীহ মুসলিম, হা/১১৬২; ইবনে মাজাহ, হা/১৭৩০)
২. আরাফা দিবস নির্ধারণ—মতামতের উপস্থাপন
-
উত্তরে বলা হয়েছে: “অধিকাংশ আলেমের বক্তব্য হলো, যিলহজ্জের ৯ তারিখ যে দিন হাজীরা আরাফায় অবস্থান করেন, সেটিই আরাফার দিন। সুতরাং এই দিনে রোযা রাখতে হবে।” এটি মূলত: যে কোন স্থানের মুসলিমের জন্য আরাফার দিন সেই দিনই, যখন সৌদি আরবে হাজীরা আরাফায় অবস্থান করেন। কিন্তু হানাফী ফিকহে এ বিষয়ে বিশদ মতভেদ রয়েছে।
-
হানাফী মতে: অধিকাংশ হানাফী ফকীহ (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ) এবং ভারতীয় উপমহাদেশের প্রসিদ্ধ আলেমগণ (মুফতী মাহমুদ হাসান, মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, মুফতী মুহাম্মদ শফী, মুফতী তাকী উসমানী) মনে করেন, আরাফার রোযা নিজ এলাকার চাঁদ দেখার ভিত্তিতে নির্ধারিত ৯ জিলহজ্জ-এ রাখা জরুরি। কারণ রোযা রাখার বিধান চাঁদ দেখার সাথে সম্পৃক্ত—এটা শুধু রমযানের জন্যই নয়, বরং আরাফা, আশুরাসহ সকল নফল রোযার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। (রদ্দুল মুহতার, ২/৩৭৭; ফাতাওয়া উসমানী, ২/১৬৪; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/১৮২)
-
অপর মত: ইবনু উসাইমীন (রহঃ)-এর মত উল্লেখ করে উত্তরটি বলেছে, প্রত্যেক দেশ নিজ চাঁদ দেখে রোযা রাখবে। এটি হানাফী মাযহাবের একটি গ্রহণযোগ্য মত। তবে হানাফী ফিকহের প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত হলো নিজ দেশের চাঁদই মানদণ্ড।
-
সমস্যা: উত্তরটি প্রথমে “অধিকাংশ আলেমের বক্তব্য” বলে হাজীদের দিন অনুসরণের কথা বলেছে, পরে ইবনু উসাইমীনের মত উল্লেখ করে দ্বিমত দেখিয়েছে। অথচ হানাফী ফিকহে অধিকাংশের মত হলো নিজ দেশের চাঁদ অনুসরণ করা। এখানে “অধিকাংশ” বলতে সালাফী বা অন্য মাযহাবের আলেমদের বুঝানো হতে পারে, যা স্পষ্ট নয়।
-
দুই দিন রোযা রাখার সুপারিশ: উত্তরটি বলে—“মতবিরোধ থেকে বাঁচতে সৌদির ৯ তারিখ (২৬ মে) ও বাংলাদেশের ৯ তারিখ (২৭ মে)—এই দুই দিন রোযা রাখা উত্তম।” হানাফী ফিকহে এটিকে ইহতিয়াতি (সতর্কতামূলক) পন্থা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন:
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/১৮২): “যে ব্যক্তি নিজ এলাকার ৯ তারিখে একদিন রোযা রাখে, সেটিই যথেষ্ট। কিন্তু সতর্কতা হিসেবে উভয় দিন রাখা জায়েয ও উত্তম।”
সুতরাং, দুই দিন রোযা রাখার সুপারিশ সঠিক ও গ্রহণযোগ্য। তবে “অধিক উত্তম এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়”—এ কথাটি অতিরিক্ত দাবি মনে হতে পারে। কেননা, কেউ কেউ নিজ দেশের একদিনই যথেষ্ট বলে মনে করেন এবং তাতেই সওয়াব পাওয়া যাবে। তাঁদের মতে উভয় দিন রাখা উত্তম নয়, বরং নিজ দেশের ৯ তারিখই প্রধান। তাই “নিশ্চিতভাবে” শব্দটি ব্যবহার না করাই ভালো ছিল।
সামগ্রিক মূল্যায়ন: উত্তরটি মোটামুটি সঠিক এবং আমলযোগ্য। তবে শেষ অংশের ভাষ্যকে “নিশ্চিতভাবে অধিক উত্তম” না বলে “সতর্কতামূলকভাবে উত্তম” বলা উচিত ছিল। হানাফী ফিকহের আলোকে উত্তরটি গ্রহণযোগ্য।
হানাফী কিতাবের রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (২/৩৭৭): নিজ এলাকার চাঁদের ভিত্তিতে আরাফার রোযা।
- ফাতাওয়া উসমানী (২/১৬৪): মতভেদ নিরসনে দুই দিন রোযা রাখার অনুমতি।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/১৮২): সতর্কতামূলক দুই দিন রোযা উত্তম।
- বেহেশতী জেওর (১/২৩৩): আরাফার রোযা নিজ দেশের তারিখে।