আশা (ASA) এনজিওতে চাকরি করা কি শরিয়তসম্মত?
Business and Job · Hanafi
Question
একটি বিষয়ে জানতে চাচ্ছিলাম। আশা (ASA) এনজিওতে চাকরি করা কি শরিয়তসম্মত? তাঁর উপার্জনের হুকুম কী হবে?
আর যদি কোনো ছেলের নিজের চাকরি হালাল হয়, কিন্তু তার বাবা আশা এনজিওতে চাকরি করেন এবং বাবার উপার্জনেই পরিবারের সংসার চলে, তাহলে ওই ছেলেকে বিয়ে করার ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান কী? এ অবস্থায় ছেলেকে বিয়ে করা কি জায়েজ হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আশা (ASA) এনজিওতে চাকরি করা সরাসরি হারাম বলা যাবে না; বরং চাকরির প্রকৃতি, কাজের ধরন ও আয়ের উৎসের উপর হুকুম নির্ভর করবে। যদি চাকরির কাজ নিজে হালাল হয় এবং বেতন নির্ধারিত হয়, তবে মূল চাকরি জায়েজ। তবে আশা এনজিওর মূল ব্যবসা সুদভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ (মাইক্রোক্রেডিট) হওয়ায় সেখানে হিসাবরক্ষণ, ঋণ আদায়, সুদসংক্রান্ত কাগজপত্র প্রস্তুত করা ইত্যাদি কাজ সরাসরি সুদে সহযোগিতা হওয়ায় জায়েজ নয়। আর শুধু প্রচলিত বেতন/উপার্জন যেহেতু কাজের বিনিময়ে পাওয়া, তাই তা মূলত হালাল; তবে সুদি কাজে সহযোগিতা হলে সেই অংশের আয় সন্দেহমুক্ত নয়।
বিস্তারিত:
১) আশা এনজিওতে চাকরির হুকুম:
ইসলামে চাকরির হুকুম নির্ভর করে কাজের উপর। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং হালাল উপার্জন কর।” (সূরা বাকারা: ১৭২-এর আলোকে)
আর রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি হালাল উপার্জন করে সে আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মতো।” (মিশকাত, হাদিস নং ২৭৬০-এর আলোকে)
সুতরাং চাকরি হালাল হওয়ার শর্ত হলো—কাজ নিজে হালাল হওয়া, বেতন নির্ধারিত হওয়া এবং অন্যায়/সুদ/ঘুষ/প্রতারণায় সরাসরি সহযোগিতা না করা।
আশা এনজিওর মূল কার্যক্রম সুদভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ। কুরআনে সুদকে যুদ্ধ ঘোষণার মতো মহাপাপ বলা হয়েছে:
“আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন এবং সদকাকে বর্ধিত করেন।” (সূরা বাকারা: ২৭৬)
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।” (সূরা বাকারা: ২৭৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক ও সাক্ষী—সবাইকে অভিসম্পাত করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৫৯৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৩৩৩)
ফিকহে হানাফির মূলনীতি হলো:
“সুদে সহযোগিতা করা সুদ খাওয়ার মতোই গুনাহ।” (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ১৮৭-এর আলোকে; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৩, পৃ. ২২৬-এর আলোকে)
তাই আশা এনজিওতে যদি কাজ হয়—ঋণ প্রদান, সুদ হিসাব, সুদ আদায়, সুদি চুক্তি লেখা, সুদি হিসাবরক্ষণ, ঋণগ্রহীতাকে সুদি লেনদেনে উৎসাহিত করা—তবে এ ধরনের কাজ জায়েজ নয়। আর যদি চাকরি হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন বিভাগে, যেমন: সাধারণ প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজসেবা, যেখানে সুদি লেনদেনে সরাসরি সহযোগিতা নেই, তবে মূল চাকরি জায়েজ হওয়ার সুযোগ আছে; তবে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক আয়ের উৎস সুদি হওয়ায় সতর্কতা অবলম্বন করা কর্তব্য।
২) উপার্জনের হুকুম:
চাকরির বিনিময়ে নির্ধারিত বেতন মূলত হালাল; কারণ এটি ইজারার (চাকরি) চুক্তি। কিন্তু যদি কাজটি নিজেই হারাম হয়, তবে সেই বেতন হালাল নয়। হানাফি ফিকহে বলা হয়েছে:
“হারাম কাজের বিনিময় হারাম।” (আল-হিদায়া, খণ্ড ৩, পৃ. ২৩০-এর আলোকে; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৪০-এর আলোকে)
আর যদি কাজ হালাল হয়, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের মূল আয় সুদি হয়, তবে বেতনটি মূলত হালাল; তবে সুদি ব্যবস্থায় সহযোগিতার কারণে সন্দেহ ও সতর্কতা থাকে। এমতাবস্থায় সম্ভব হলে সুদি কাজ এড়িয়ে চলা, তাওবা করা এবং হালাল চাকরির চেষ্টা করা উত্তম।
৩) বাবার আশা এনজিওর উপার্জনে সংসার চললে ছেলের বিয়ের হুকুম:
বিয়ে একটি ইবাদত ও সামাজিক চুক্তি। বিয়ে বৈধ হওয়ার জন্য পাত্রের নিজের উপার্জন হালাল হওয়া শর্ত নয়; বরং পাত্র-পাত্রীর দ্বীনদারি, চরিত্র ও সামর্থ্য বিবেচ্য। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমরা দ্বীনদার ও চরিত্রবান পাত্রকে বিয়ে দাও।” (তিরমিজি, হাদিস নং ১০৮৪-এর আলোকে)
আর আল্লাহ বলেন:
“তোমরা তোমাদের মধ্যে অবিবাহিতদের বিয়ে দাও।” (সূরা নূর: ৩২)
তবে পারিবারিক আয়ের উৎস যদি সুদি কাজ থেকে হয়, তবে সেই আয়ের হুকুম আলাদা। হানাফি ফিকহে বলা হয়েছে:
“হারাম মাল ভক্ষণকারীর সাথে সম্পর্ক রাখা দোষণীয় নয়; তবে তার হারাম আয়ের মাল গ্রহণ করা জায়েজ নয়।” (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৪৭-এর আলোকে)
অর্থাৎ ছেলের নিজের চাকরি হালাল হলে এবং সে নিজের হালাল উপার্জন থেকে সংসার চালাতে সক্ষম হলে বিয়ে জায়েজ। বাবার আয়ের উৎস সন্দেহযুক্ত হলে ছেলের উপর বাবার আয় ভক্ষণ করা আবশ্যক নয়; বরং নিজের হালাল আয়েই সংসার চালানো উচিত। আর যদি ছেলের নিজের উপার্জন না থাকে এবং বাবার সুদি আয়ের উপর নির্ভর করে সংসার চালাতে হয়, তবে সেটি সতর্কতার বিষয়; তবে শুধু এ কারণে বিয়ে হারাম বা বাতিল হয় না। বরং উত্তম হলো—ছেলের হালাল উপার্জন থাকা, বাবার আয়ের সন্দেহযুক্ত অংশ এড়িয়ে চলা এবং হালাল রুজির জন্য দোয়া ও চেষ্টা করা।
উপসংহার:
- আশা এনজিওতে চাকরি হারাম বা হালাল—এটি কাজের ধরনের উপর নির্ভরশীল। সুদি কাজে সরাসরি সহযোগিতা হলে জায়েজ নয়; সাধারণ প্রশাসনিক/সেবামূলক কাজ হলে মূল চাকরি জায়েজ হওয়ার সুযোগ আছে, তবে সতর্কতা কর্তব্য।
- বেতন মূলত কাজের বিনিময়; কাজ হালাল হলে বেতন হালাল, কাজ হারাম হলে বেতন হারাম।
- ছেলের নিজের চাকরি হালাল হলে বাবার আশা এনজিওর চাকরির কারণে ছেলেকে বিয়ে করা হারাম হয় না; বরং দ্বীনদারি ও হালাল উপার্জনের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিয়ে করা উচিত।
- সর্বোত্তম পথ হলো: সুদি কাজ ও সুদি আয় এড়িয়ে চলা, হালাল চাকরির চেষ্টা করা এবং আল্লাহর কাছে হালাল রুজির দোয়া করা।
দোয়া:
اللهم اكفني بحلالك عن حرامك، وأغنني بفضلك عمن سواك
“হে আল্লাহ! আপনার হালাল দ্বারা আমাকে হারাম থেকে রক্ষা করুন এবং আপনার অনুগ্রহে আমাকে অন্য所有人的 মুখাপেক্ষী থেকে মুক্ত করুন।” (তিরমিজি, হাদিস নং ৩৫৬৩)
والله أعلم بالصواب