বাবা মারা যাওয়ার পর সন্তান হিসেবে কি কি আমল করলে তার জন্য ফায়দা হবে কবরের আযাব মাফ হবে।
Janazah-Burial · Hanafi
Question
আমার সহপাঠী এক বোনের বাবা কালকে ইন্তিকাল করেছেন। আমার সেই বোন কি কি আমল করতে পারে তার বাবার জন্য? যাতে তার বাবার কবরের আযাব মাফ করে দেওয়া হয় এবং তার জন্য কি আমল করলে সেটা তার জন্য ফায়দা জনক হবে। আমার সেই বোন কি কবর জিয়ারত করতে পারবে তার বাবার? কবরের পাশে গিয়ে কি কোন দো'আ দরুদ পাঠ করা যাবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
হ্যাঁ, বাবার ইন্তিকালের পর সন্তান (ছেলে-মেয়ে উভয়ই) অনেক আমল করতে পারে, যা মৃতের জন্য উপকারী এবং কবরের আযাব মাফের কারণ হতে পারে। বিশেষভাবে—(১) বাবার জন্য বেশি বেশি দুআ ও ইস্তিগফার করা, (২) সদকা করা, (৩) কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব পৌঁছানো, (৪) নফল রোজা রাখা ও সওয়াব পৌঁছানো, (৫) হজ/উমরাহ করানো (সামর্থ্য থাকলে), (৬) বাবার ভালো কাজের ধারা জারি রাখা (যেমন: মসজিদ, কূপ, শিক্ষা, দান-খয়রাত ইত্যাদি), (৭) বাবার আত্মীয়দের সাথে সদাচরণ ও সিলা-রাহমি করা।
মেয়ে বাবার কবর জিয়ারত করতে পারবে; কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দুআ, দরুদ, কুরআন তিলাওয়াত করা যাবে এবং তা বাবার জন্য উপকারী হবে—এতে কোনো নিষেধ নেই। তবে কবরকে সিজদা করা, কবরে হাত বুলানো, ফুল-চাদর দেওয়া, মৃতকে সরাসরি ডেকে দুআ করা ইত্যাদি বিদআত/নিষিদ্ধ।
বিস্তারিত ফিকহি আলোচনা (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)
১. মৃতের জন্য সন্তানের দুআ ও ইস্তিগফার
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ
“হে আমাদের রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং মুমিনদেরকে ক্ষমা করুন সেই দিন, যেদিন হিসাব কায়েম হবে।” (সূরা ইবরাহিম: ৪১)
হাদিসে রাসূল ﷺ বলেন:
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
“মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি জিনিস ছাড়া: (১) সদকায়ে জারিয়া, (২) এমন ইলম যা থেকে উপকার নেওয়া হয়, (৩) নেক সন্তান যে তার জন্য দুআ করে।” (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১; সুনানে আবু দাউদ: ২৮৮০)
ফিকহি মাসআলা: মৃতের জন্য সন্তানের দুআ, ইস্তিগফার ও সদকা সর্বসম্মতভাবে উপকারী। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে মৃতের জন্য দুআ ও ইস্তিগফার সবচেয়ে বেশি উপকারী। (রাদ্দুল মুহতার: ২/২৪৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১৬৬)
২. সদকা করা
সন্তান বাবার পক্ষ থেকে সদকা করলে সওয়াব বাবার কাছে পৌঁছে। রাসূল ﷺ-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, “আমার মা হঠাৎ মারা গেছেন; আমি যদি তার পক্ষ থেকে সদকা করি, তার কি উপকার হবে?” রাসূল ﷺ বললেন: “হ্যাঁ।” (সহিহ বুখারি: ১৩৮৮; সহিহ মুসলিম: ১০০৪)
হানাফি ফাতাওয়া: মৃতের পক্ষ থেকে সদকা, দান-খয়রাত, মসজিদ/কূপ/কুয়া নির্মাণ ইত্যাদি সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছে। (ফাতাওয়া উসমানি: ১/৩৪৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া: ১/৫৬৮)
৩. কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব পৌঁছানো
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃতের জন্য পৌঁছানো যায় এবং তা উপকারী। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-ও এ মত সমর্থন করেছেন। (রাদ্দুল মুহতার: ২/২৪৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১৬৬; আল-হিদায়া: ১/২৪৪)
পদ্ধতি: সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাস, সূরা ইয়াসিন, সূরা মুলক ইত্যাদি পড়ে সওয়াব বাবার রুহের কাছে পৌঁছানোর দুআ করা। তবে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা বিশেষ পদ্ধতি (যেমন: চল্লিশা, তৃতীয়া, দশমী) শরিয়তে নির্ধারিত নয়—এগুলো বিদআত।
৪. রোজা রাখা
সন্তান বাবার পক্ষ থেকে নফল রোজা রাখতে পারে এবং সওয়াব পৌঁছাতে পারে। হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসূল ﷺ-কে বলল, “আমার মা মারা গেছেন এবং তার ওপর এক মাসের রোজা বাকি আছে; আমি কি তার পক্ষ থেকে রোজা রাখব?” রাসূল ﷺ বললেন: “হ্যাঁ, তার পক্ষ থেকে রোজা রাখো।” (সহিহ বুখারি: ১৯৫৩; সহিহ মুসলিম: ১১৪৮)
হানাফি ফাতাওয়া: মৃতের পক্ষ থেকে নফল রোজা রাখা ও সওয়াব পৌঁছানো জায়েজ। (ফাতাওয়া উসমানি: ১/৩৪৭; রাদ্দুল মুহতার: ২/২৪৩)
৫. হজ/উমরাহ করানো
সামর্থ্য থাকলে বাবার পক্ষ থেকে হজ বা উমরাহ করানো যায়। রাসূল ﷺ-কে এক মহিলা জিজ্ঞেস করল, “আমার বাবা মারা গেছেন এবং তিনি হজ করেননি; আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ করব?” রাসূল ﷺ বললেন: “হ্যাঁ, তার পক্ষ থেকে হজ করো।” (সহিহ বুখারি: ১৮৫২; সহিহ মুসলিম: ১৩৩৪)
হানাফি ফাতাওয়া: মৃতের পক্ষ থেকে বদলি হজ জায়েজ এবং তা মৃতের জন্য উপকারী। (ফাতাওয়া উসমানি: ১/৩৪৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/২৫৭)
৬. সদকায়ে জারিয়া ও নেক আমলের ধারা
বাবার নামে মসজিদ, মাদরাসা, কূপ, কুয়া, রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দান-খয়রাত ইত্যাদি করা সদকায়ে জারিয়া। রাসূল ﷺ বলেন:
إِنَّ مِمَّا يَلْحَقُ الْمُؤْمِنَ مِنْ عَمَلِهِ وَحَسَنَاتِهِ بَعْدَ مَوْتِهِ: عِلْمًا عَلَّمَهُ وَنَشَرَهُ، أَوْ وَلَدًا صَالِحًا تَرَكَهُ، أَوْ مُصْحَفًا وَرَّثَهُ، أَوْ مَسْجِدًا بَنَاهُ، أَوْ بَيْتًا لِابْنِ السَّبِيلِ بَنَاهُ، أَوْ نَهْرًا أَجْرَاهُ، أَوْ صَدَقَةً أَخْرَجَهَا مِنْ مَالِهِ فِي صِحَّتِهِ وَحَيَاتِهِ يَلْحَقُهُ مِنْ بَعْدِ مَوْتِهِ
“মুমিনের আমল ও নেক কাজের মধ্যে যা মৃত্যুর পরও তার কাছে পৌঁছে: ইলম যা সে শিখিয়েছে ও প্রচার করেছে, নেক সন্তান যা সে রেখে গেছে, কুরআনের মুসহাফ যা সে উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছে, মসজিদ যা সে নির্মাণ করেছে, মুসাফিরের ঘর যা সে বানিয়েছে, নহর/কূপ যা সে প্রবাহিত করেছে, এবং সদকা যা সে তার সম্পদ থেকে সুস্থ ও জীবিত অবস্থায় দিয়েছে—এসব মৃত্যুর পরও তার কাছে পৌঁছে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৪২; সহিহ ইবনে খুজাইমা: ২৪৯০)
৭. সিলা-রাহমি ও সদাচরণ
বাবার আত্মীয়দের সাথে সদাচরণ, তাদের দেখাশোনা করা, বাবার বন্ধুদের সম্মান করা—এসবও মৃতের জন্য উপকারী। রাসূল ﷺ বলেন:
إِنَّ أَبَرَّ الْبِرِّ صِلَةُ الْوَلَدِ أَهْلَ وُدِّ أَبِيهِ
“সবচেয়ে বড় নেক কাজ হলো, সন্তান তার বাবার বন্ধুদের সাথে সদাচরণ করা।” (সহিহ মুসলিম: ২৫৫২)
কবর জিয়ারত সম্পর্কে
মেয়ে বাবার কবর জিয়ারত করতে পারবে কি?
হ্যাঁ, পারবে। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য কবর জিয়ারত জায়েজ, তবে নারীর জন্য শর্ত হলো—(১) পর্দা রক্ষা করা, (২) বিলাপ-চিৎকার না করা, (৩) কবরের ওপর বসা/হাত বুলানো/চুমু দেওয়া না করা, (৪) কবরকে সিজদা না করা, (৫) ফুল-চাদর-আগরবাতি না দেওয়া। (রাদ্দুল মুহতার: ২/২৪২; ফাতাওয়া উসমানি: ১/৩৪৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া: ১/৫৬৮)
রাসূল ﷺ বলেন:
كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ، فَزُورُوهَا، فَإِنَّهَا تُذَكِّرُ الْآخِرَةَ
“আমি তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম; এখন জিয়ারত করো, কারণ তা আখিরাতের কথা স্মরণ করায়।” (সহিহ মুসলিম: ৯৭৭; সুনানে আবু দাউদ: ৩২৩৫)
কবরের পাশে গিয়ে দুআ, দরুদ, কুরআন পাঠ করা যাবে?
হ্যাঁ, যাবে। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মৃতের জন্য দুআ, ইস্তিগফার, দরুদ, কুরআন তিলাওয়াত করা জায়েজ এবং উপকারী। রাসূল ﷺ কবর জিয়ারতের সময় এই দুআ পড়তেন:
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ، وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَاحِقُونَ، نَسْأَلُ اللَّهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ
“হে মুমিন ও মুসলিম কবরবাসী! তোমাদের ওপর সালাম। নিশ্চয়ই আমরা, আল্লাহ চাহলে, তোমাদের সাথে মিলিত হব। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের ও তোমাদের জন্য নিরাপত্তা প্রার্থনা করি।” (সহিহ মুসলিম: ৯৭৫)
তবে লক্ষণীয়: মৃতকে সরাসরি ডেকে দুআ করা (যেমন: “হে আব্বা! আমাকে ক্ষমা করুন”) বা মৃতের কাছে প্রার্থনা করা শিরক/বিদআত। দুআ আল্লাহর কাছে করতে হবে এবং মৃতের জন্য দুআ করতে হবে।
কবরের আযাব মাফের জন্য বিশেষ আমল
১. বেশি বেশি ইস্তিগফার: সন্তান নিজে ইস্তিগফার করে সওয়াব বাবার কাছে পৌঁছাবে।
২. সদকা: গরিব-মিসকিনকে খাবার, কাপড়, টাকা দেওয়া।
৩. কুরআন তিলাওয়াত: বিশেষভাবে সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাস, সূরা ইয়াসিন, সূরা মুলক।
৪. দরুদ শরিফ: বেশি বেশি দরুদ পড়ে সওয়াব পৌঁছানো।
৫. বাবার জন্য দুআ: প্রতিদিন নামাজের পর বাবার জন্য দুআ করা।
৬. সদকায়ে জারিয়া: বাবার নামে মসজিদ/কূপ/শিক্ষা প্রতিষ্ঠান/দান-খয়রাত।
৭. বাবার ঋণ পরিশোধ: বাবার কোনো ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করা। রাসূল ﷺ বলেন: “মৃতের ওপর ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করা সন্তানের দায়িত্ব।” (সহিহ বুখারি: ২২৯৫)
৮. বাবার ওসিয়ত পূর্ণ করা: বাবার বৈধ ওসিয়ত থাকলে তা পূর্ণ করা।
৯. আত্মীয়দের সাথে সদাচরণ: বাবার আত্মীয়দের সাথে সিলা-রাহমি করা।
১০. বাবার জন্য হজ/উমরাহ: সামর্থ্য থাকলে করানো।
যা করা যাবে না (বিদআত ও নিষিদ্ধ)
১. কবরকে সিজদা করা, কবরে হাত বুলানো, চুমু দেওয়া।
২. কবরে ফুল, চাদর, আগরবাতি, মোমবাতি দেওয়া।
৩. মৃতকে সরাসরি ডেকে দুআ করা বা মৃতের কাছে প্রার্থনা করা।
৪. চল্লিশা, তৃতীয়া, দশমী, খতমে কুরআন ইত্যাদি নির্দিষ্ট সংখ্যা/পদ্ধতি আবিষ্কার করা।
৫. বিলাপ-চিৎকার, বুক চাপড়ানো, মাথায় আঘাত করা।
৬. কবরের ওপর পাকা ঘর/গম্বুজ নির্মাণ (হানাফি মতে মাকরুহ)।
৭. মৃতের নামে পশু জবাই করা বা বিশেষ খাবার বিতরণ করা (যা শরিয়তে প্রমাণিত নয়)।
উপসংহার
আপনার সেই বোনের জন্য করণীয়:
- বাবার জন্য বেশি বেশি দুআ, ইস্তিগফার ও দরুদ পড়া।
- সদকা করা (গরিবকে খাবার/টাকা দেওয়া)।
- কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব বাবার রুহের কাছে পৌঁছানোর দুআ করা।
- বাবার পক্ষ থেকে নফল রোজা রাখা (সামর্থ্য অনুযায়ী)।
- বাবার নামে সদকায়ে জারিয়া করা।
- বাবার ঋণ থাকলে পরিশোধ করা।
- বাবার আত্মীয়দের সাথে সদাচরণ করা।
- কবর জিয়ারত করা (পর্দা রক্ষা করে, বিলাপ ছাড়া) এবং কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দুআ, দরুদ, কুরআন পাঠ করা।
- বাবার জন্য হজ/উমরাহ করানো (সামর্থ্য থাকলে)।
আল্লাহ তাআলা আপনার সেই বোনের বাবার কবরকে نورে ভরিয়ে দিন, তার গুনাহ মাফ করুন এবং তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসে উচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমিন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।