অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কাউকে হাদিয়া দেওয়া যাবে কি?
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে ইসলামী শরিয়ার সিদ্ধান্ত হলো: আপনার নিজের এবং আপনার পরিবারের প্রয়োজনই অগ্রাধিকার পাবে। যেহেতু আপনি প্রচণ্ড অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতায় ভুগছেন, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত, এবং ওষুধসহ জীবনযাপনের জন্য অন্যের দানের ওপর নির্ভরশীল, তাই ইদের বোনাস প্রাপ্ত টাকা আপনার নিজের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় খরচে ব্যবহার করাই জরুরি। আপনার ছাত্রদের উপহার দেওয়া উত্তম কাজ হলেও ইসলামী নিয়ম অনুযায়ী নিজের কারো চেয়ে নিজের প্রয়োজন আগে পূরণ করা আবশ্যক। নিচে কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
দলিল-প্রমাণ
১. নিজের প্রয়োজন আগে পূরণের আদেশ:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«ابْدَأْ بِنَفْسِكَ، ثُمَّ بِمَنْ تَعُولُ»
অর্থ: “তুমি নিজেকে দিয়ে শুরু করো, তারপর তোমার পোষ্যদেরকে দিয়ে।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১০৩৪; সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫৩৫১)
এ হাদিসে বোঝা যায়, দান-সদকা করার আগে নিজের এবং নিজের পোষ্যদের প্রয়োজন পূরণ করতে হবে। যেহেতু আপনার ছাত্ররা আপনার পোষ্য নন, তাই তাদেরকে উপহার দেওয়া ফরজ বা ওয়াজিব নয়। আপনার নিজের চিকিৎসা ও জীবিকা অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন হওয়ায় তা আগে পূরণ করা ওয়াজিব।
২. অভাবী ব্যক্তির জন্য দান করা উচিত নয়:
শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
“যদি কোনো ব্যক্তি নিজে অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তার জন্য অন্যকে দান করা জায়েয নেই, বরং তা হারাম। কেননা নিজের প্রয়োজনই অগ্রাধিকার পায়।”
(মাজমু‘ ফাতাওয়া, ২৫/৮৪)
একই মত দিয়েছেন শায়খ ইবন বায (রহিমাহুল্লাহ) ও শায়খ ইবন উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ)। আপনার বর্তমান অবস্থা সম্পূর্ণ অভাবগ্রস্ত হওয়ায় আপনার জন্য নিজের প্রয়োজন ফেলে অন্যকে উপহার দেওয়া উচিত নয়, বরং সেই টাকা নিজের ওষুধ ও প্রয়োজনীয় খরচে ব্যয় করা আবশ্যক।
৩. আত্মত্যাগ শুধু সচ্ছল অবস্থায় সুপারিশ:
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
(وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ)
অর্থ: “আর তারা নিজেদের ওপর অপরকে অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত হয়।” (সূরা আল-হাশর: ৯)
এই আয়াতটি আনসারদের প্রশংসায় এসেছে, যারা অত্যন্ত ত্যাগস্বীকার করত। তবে সালাফদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই স্তরের ত্যাগ সুন্নাত বা মুস্তাহাব, কিন্তু ফরজ নয়। বিশেষ করে যখন নিজের জীবন ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে থাকে, তখন নিজের প্রয়োজনই অগ্রাধিকার পাবে। আপনার মতো ক্রনিক রোগী ও চরম অভাবগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য নিজের চিকিৎসা ও জীবন রক্ষা করা ফরজ, সেটা ত্যাগ করে অন্যকে দেওয়া জায়েয নয়।
৪. নিজের পরিবারকে অভাবী রেখে যাওয়া নিষেধ:
সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«إِنَّكَ أَنْ تَذَرَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَذَرَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ»
অর্থ: “তুমি তোমার উত্তরাধিকারীদের স্বাবলম্বী রেখে যাওয়া উত্তম, তাদেরকে অভাবী রেখে যাওয়ার চেয়ে, যারা লোকের কাছে হাত পাতবে।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১২৯৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৬২৮)
এই হাদিস থেকে বুঝা যায়, নিজের পরিবার ও নিজের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়াই কাম্য। আপনি যদি ইদের বোনাস ছাত্রদের দিয়ে দেন, তবে আপনার নিজের ওষুধ ও খাবারের সংকট আরও বেড়ে যাবে—যা ইসলামী দৃষ্টিতে পছন্দনীয় নয়।
সারসংক্ষেপ সিদ্ধান্ত
- আপনার করণীয়: ইদের বোনাস টাকা আপনার নিজের চিকিৎসা, ওষুধ, ও জীবিকার প্রয়োজনীয় খরচে ব্যবহার করুন। এটি আপনার জন্য বৈধ এবং উত্তম।
- ছাত্রদের উপহার দেওয়া: এটি একটি নফল কাজ, কিন্তু আপনার চরম অভাবের কারণে বর্তমানে তা জায়েয নয়। যদি কোনো সময় আল্লাহ আপনাকে সচ্ছলতা দান করেন, তখন আপনি তাদের উপহার দিতে পারেন।
- শরিয়ার দৃষ্টি: আপনার ওপর এটি ফরজ যে, প্রথমে নিজের জীবন ও স্বাস্থ্যের যত্ন নেবেন। নিজের প্রয়োজন পূরণ না করে অন্যদের দান করা ইসলামে নিন্দিত।
উপসংহার
আপনি বর্তমানে চরম অভাবগ্রস্ত ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত। তাই ইদের বোনাস টাকা আপনার নিজের ওষুধ, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় খরচে ব্যয় করুন। ছাত্রদের উপহার দেওয়ার মানসিকতা ভালো, কিন্তু শরিয়ত আপনার ওপর নিজের আগে পূরণের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা আপনাকে শিফা দান করুন এবং আর্থিক সচ্ছলতা দিন। আমিন।