আত্মহত্যাকারীর সন্তানের করণীয়।
Janazah-Burial · Ahle Hadith / Salafi
Question
বাবার জন্য আমি কি কি করবো,,,
বাবার মৃত্যুর 3 দিন পর আমার বড় বোন স্বপ্নে দেখেছে যে বাবা তাকে নিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছে,,,
আমি মাসয়ালা জানতে চাচ্ছি এটার
Answer
আত্মহত্যাকারীর জন্য সন্তানের করণীয় ও স্বপ্নের ব্যাপারে মাসয়ালা
প্রথমে সমবেদনা ও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
আল্লাহ তা'আলা আপনার বাবার গুনাহ মাফ করুন এবং আপনার পরিবারকে সবর দান করুন। আত্মহত্যা ইসলামে কবিরা গুনাহ — এটি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত:
«وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا» "নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।" (সূরা আন-নিসা: ২৯)
«وَمَن يَقْتُلْ نَفْسَهُ بِحَدِيدَةٍ فَحَدِيدَتُهُ فِي يَدِهِ يَتَوَجَّأُ بِهَا فِي بَطْنِهِ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا» "যে ব্যক্তি লোহার অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করবে, তার হাতে সেই অস্ত্র থাকবে, সে জাহান্নামের আগুনে নিজের পেটে তা বিদ্ধ করতে থাকবে, সেখানে চিরকালের জন্য।" (সহীহ বুখারী: ৫৭৭৮; সহীহ মুসলিম: ১০৯)
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: আত্মহত্যাকারীকে কাফির বলা যাবে না, তার জানাযা পড়া যাবে না — এ কথা বলা যাবে না। আহলুস সুন্নাহর আকীদা হলো: কবিরা গুনাহকারী মুসলিম ঈমানের মূল থেকে বের হয় না; তার ব্যাপার আল্লাহর ইচ্ছাধীন — তিনি চাইলে ক্ষমা করবেন, চাইলে শাস্তি দেবেন। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: "আত্মহত্যাকারী ও অন্যান্য কবিরা গুনাহকারীর জানাযা পড়া ও তার জন্য দু'আ করা মুসলিমদের জন্য বৈধ; যদিও কেউ কেউ (ভয় দেখানোর জন্য) তা থেকে বিরত থাকতে পারে।" (মাজমূ' আল-ফাতাওয়া: ২৪/২৭০-এর অর্থ)
১. আপনার বাবার জন্য আপনি যা যা করতে পারেন
(ক) তার জন্য দু'আ ও ইস্তিগফার করা — সর্বোত্তম আমল
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ» "মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম, এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দু'আ করে।" (সহীহ মুসলিম: ১৬৩১)
আপনি তার সন্তান — আপনার দু'আ তার কাছে পৌঁছাবে, ইনশাআল্লাহ। বেশি বেশি বলুন:
- «اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ» — "হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করুন, তার প্রতি দয়া করুন, তাকে নিরাপত্তা দিন এবং তাকে মাফ করুন।" (সহীহ মুসলিম: ৯৬৩)
- «اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا...» (সহীহ মুসলিম: ৯৭৫)
- নিজের ভাষায়ও দু'আ করুন: "হে আল্লাহ, আমার বাবার আত্মহত্যার গুনাহ ক্ষমা করুন, তার কবরকে প্রশস্ত করুন, তাকে জান্নাত দান করুন।"
বিশেষভাবে: আত্মহত্যা যেহেতু কবিরা গুনাহ, তাই তার জন্য বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দু'আ করুন — বিশেষত তাহাজ্জুদে, রমাদানে, ইফতারের আগে, জুমার দিনে।
(খ) তার পক্ষ থেকে সদকা করা
বিশেষ ভাবে সদকায়ে জারিয়াহ করার পরামর্শ থাকবে।
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী ﷺ-কে বলল: "আমার মা হঠাৎ মারা গেছেন, যদি তিনি কথা বলতে পারতেন তবে সদকা করার ওসিয়ত করতেন; আমি তার পক্ষ থেকে সদকা করলে কি তিনি তা পাবেন?" নবী ﷺ বললেন: "হ্যাঁ।" (সহীহ বুখারী: ২৭৬০)
- নিয়মিত সদকা করুন (অল্প হলেও) — পানি, খাবার, গরিবকে সাহায্য, মসজিদে দান।
- সতর্কতা: তার নামে জান্নাতের উদ্দেশ্যে পশু কুরবানি বা বিশেষ "কুলখানি/চেহলাম" জাতীয় প্রথা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয় — এগুলো বর্জন করুন। সাধারণ সদকাই যথেষ্ট।
(গ) হজ/উমরাহ করা (সামর্থ্য থাকলে)
«أَنَّ امْرَأَةً قَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ أُمِّي نَذَرَتْ أَنْ تَحُجَّ... فَقَالَ: حُجِّي عَنْ أُمِّكِ» "তুমি তোমার মায়ের পক্ষ থেকে হজ করো।" (সহীহ বুখারী: ১৮৫২)
(ঘ) তার রেখে যাওয়া দায়-ঋণ পরিশোধ করা ও ওসিয়ত পূর্ণ করা
«نَفْسُ الْمُؤْمِنِ مُعَلَّقَةٌ بِدَيْنِهِ حَتَّى يُقْضَى عَنْهُ» "মুমিনের রূহ তার ঋণের সাথে ঝুলন্ত থাকে, যতক্ষণ না তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করা হয়।" (সুনানে তিরমিযী: ১০৭৮ — শাইখ আল-আলবানী সহীহ বলেছেন)
(ঙ) তার নেক সন্তান হওয়া
আপনি যত নেক আমল করবেন — সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, সৎ চরিত্র — তার সন্তান হিসেবে তা তার জন্য কল্যাণের কারণ হতে পারে। তবে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছানো নিয়ে আলিমদের মতভেদ আছে; নিরাপদ ও সর্বসম্মত পথ হলো দু'আ ও সদকা। (ইবনু তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' আল-ফাতাওয়া: ২৪/৩০০-এর আলোচনা)
(চ) যা করবেন না
- তার গুনাহ নিয়ে মানুষের সামনে আলোচনা/সমালোচনা করবেন না।
- আত্মহত্যাকে "ভাগ্য" বলে justifying করবেন না, তবে তার ব্যাপারে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশও হবেন না।
- বিদআতী প্রথা (কুলখানি, চল্লিশা, বিশেষ মিলাদ ইত্যাদি) থেকে বিরত থাকুন।
২. স্বপ্নের ব্যাপারে মাসয়ালা
(ক) স্বপ্ন শরীয়তের দলিল নয়
স্বপ্ন তিন প্রকার — নবী ﷺ বলেছেন:
«الرُّؤْيَا ثَلَاثٌ: رُؤْيَا الصَّالِحَةُ بُشْرَى مِنَ اللَّهِ، وَرُؤْيَا تَحْزِينٌ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَرُؤْيَا مِمَّا يُحَدِّثُ بِهِ الْمَرْءُ نَفْسَهُ» "স্বপ্ন তিন ধরনের: ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ; (দ্বিতীয়) স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে দুঃখ দেওয়ার জন্য; (তৃতীয়) স্বপ্ন যা মানুষের নিজের মনের কথা।" (সহীহ মুসলিম: ২২৬৩-এর অর্থ)
সুতরাং এই স্বপ্ন থেকে কোনো হুকুম বা মাসয়ালা গ্রহণ করা যাবে না। এটি দ্বীনের দলিল নয়। মৃত ব্যক্তির অবস্থা সম্পর্কে আমরা জানি না — তার ব্যাপার আল্লাহর কাছে।
(খ) এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে বাড়াবাড়ি করবেন না
- স্বপ্নে বাবা মোটরসাইকেলে ঘুরাচ্ছেন — এ থেকে "বাবার শাস্তি হচ্ছে" বা "বাবা ভালো আছেন" — কোনো সিদ্ধান্ত টানা যাবে না। এটি হতে পারে শয়তানের ওয়াসওয়াসা, অথবা মনের চিন্তার প্রতিফলন, অথবা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো ইশারা — কিন্তু তার ভিত্তিতে আমল নির্ধারণ করা যাবে না।
- স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারী (যারা স্বপ্নের বই/হাফেজদের কাছে যান) — তাদের কাছে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন; এটি ভাগ্য-বিচার/গণকের কাছে যাওয়ার মতোই বিপজ্জনক পথে নিয়ে যেতে পারে।
«مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً» "যে ব্যক্তি গণকের কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করল, তার চল্লিশ রাতের সালাত কবুল হবে না।" (সহীহ মুসলিম: ২২৩০)
(গ) স্বপ্ন দেখলে করণীয়
নবী ﷺ বলেছেন: "সে আল্লাহর কাছে এর কল্যাণ চাইবে এবং শয়তান থেকে আশ্রয় চাইবে; আর কারো কাছে এর ব্যাখ্যা চাইবে না।" (সহীহ মুসলিম: ২২৬৩-এর অধ্যায়) — অর্থাৎ অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখলে বাম দিকে থুতু ফেলবে (৩ বার), শয়তান থেকে আশ্রয় চাইবে, এবং তা নিয়ে কারো সাথে আলোচনা করবে না।
(ঘ) মৃতের জন্য স্বপ্নের চেয়ে দু'আ ও সদকা উত্তম
আপনার বোনের স্বপ্ন নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে, বরং তার জন্য দু'আ ও সদকা বাড়িয়ে দিন। এটাই শরীয়তসম্মত ও সর্বোত্তম পথ।
সারসংক্ষেপ
| করণীয় | বর্জনীয় | |---|---| | বাবার জন্য দু'আ ও ইস্তিগফার | স্বপ্নকে দলিল বানানো | | সদকা (নিয়মিত, অল্প হলেও) | কুলখানি/চল্লিশা/মিলাদ | | ঋণ পরিশোধ, ওসিয়ত পূর্ণ করা | স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারীর কাছে যাওয়া | | সামর্থ্য থাকলে হজ/উমরাহ | বাবার গুনাহ নিয়ে মানুষের সামনে আলোচনা | | নেক সন্তান হওয়া | আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া |
আল্লাহ আপনার বাবাকে ক্ষমা করুন, তার কবরকে জান্নাতের বাগান বানান, এবং আপনার পরিবারকে সবর ও ঈমানের সাথে ধরে রাখুন। আমিন।