উমরাহর সম্পূর্ন নিয়ম
Hajj and Umrah · Hanafi
Question
আল্লাহ চাইলে আগামী ২৬ শে অক্টোবর উমরাহতে যাবো। আমি হানাফি মাযহাব অনুসরণ করি। এখন আমি উমরাহর সময় করণীয় আমলগুলো জানতে চাচ্ছি। তাওয়াফের সময় কি কি দুয়া বা আয়াত পাঠ করতে হবে এবং সাঈ করার সময় কি কি পাঠ কররে হবে, উমরাহর সম্পূর্ন করণীয় আমলগুলো জানতে চাচ্ছি।
Answer
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ
উমরাহ একটি মহান ইবাদত। নিচে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী উমরাহর সম্পূর্ণ নিয়ম ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হলো। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
১. ইহরামের পূর্ব প্রস্তুতি
- নখ কাটা, অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করা, গোসল করা (সুন্নত)।
- ইহরামের কাপড় পরিধান করা (পুরুষ: দুই টুকরা সাদা কাপড়; নারী: সাধারণ পোশাক, মাথায় ক্যাপ ব্যবহার করে কাপড় ঝুলিয়ে দিবে। যাতে করে মুখে সরাসরি কাপড় না লাগে এবং পর্দাও হয়ে যায়)।
- সুগন্ধি ব্যবহার করা ইহরামের পূর্বে জায়েয, ইহরাম বাঁধার পর নয়।
- মিকাতের আগে ইহরাম বাঁধা। বিমানে গেলে মিকাত অতিক্রমের আগে ইহরাম পরিধান করে নেওয়া।
২. ইহরাম বাঁধা ও তালবিয়া
উমরাহর নিয়ত করে তালবিয়া পাঠ করা:
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
উচ্চারণ: লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক।
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "যে ব্যক্তি হজ বা উমরাহ করল, তার জন্য তালবিয়া পাঠ করা আবশ্যক।" (সহিহ বুখারি: ১৫৪৯; সহিহ মুসলিম: ১১৮৪)
ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ: সুগন্ধি, চুল/নখ কাটা, স্ত্রী-সহবাস, শিকার করা, বিবাহ দেওয়া-নেওয়া ইত্যাদি।
৩. মক্কায় প্রবেশ ও তাওয়াফ
- মসজিদুল হারামে প্রবেশের সময় ডান পা দিয়ে প্রবেশ করে দরুদ ও দুআ পড়া।
- হাজরে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ শুরু করা। সম্ভব হলে চুমু দেওয়া, না পারলে ডান হাত দিয়ে ইশারা করা এবং তাকবির বলা।
- তাওয়াফে ৭ চক্কর। প্রত্যেক চক্করে হাজরে আসওয়াদ থেকে শুরু করে সেখানে শেষ করা।
- পুরুষরা প্রথম তিন চক্করে রমল (দ্রুত পদক্ষেপে হাঁটা) করবে — এটি সুন্নত।
- মাকামে ইবরাহিমের পিছনে দুই রাকাত নামাজ পড়া (সূরা কাফিরুন ও ইখলাস পড়া উত্তম)।
- জমজমের পানি পান করা।
- সাফা-মারওয়া সাঈ।
তাওয়াফের সময় কী পড়বেন?
তাওয়াফে নির্দিষ্ট কোনো দুআ নেই; যেকোনো দুআ, তাসবিহ, তাওহিদ, দরুদ পড়া যায়। তবে হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানি অতিক্রমের সময় বিশেষ দুআ পড়া সুন্নত:
হাজরে আসওয়াদ অতিক্রমের সময়: বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার — অথবা আল্লাহু আকবার।
রুকনে ইয়ামানি থেকে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত (দুই রুকনের মাঝে):
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
(সূরা বাকারা: ২০১)
এছাড়া তাওয়াফের প্রত্যেক চক্করে ইচ্ছামতো দুআ পড়া যায়। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাওয়াফে আল্লাহর যিকির ও দুআ করতেন। (সুনানে আবু দাউদ: ১৮৯২; মুসনাদে আহমাদ)
৪. সাঈ (সাফা-মারওয়া)
- সাফা পাহাড়ে উঠে কাবার দিকে মুখ করে তাকবির ও তাওহিদ পাঠ করা। রাসূল ﷺ সাফায় দাঁড়িয়ে এই দুআ পড়েছেন:
اللَّهُ أَكْبَرُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ، أَنْجَزَ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ
(সহিহ মুসলিম: ১২১৮)
- সাফা থেকে মারওয়া পর্যন্ত এক চক্কর, মারওয়া থেকে সাফা পর্যন্ত আরেক চক্কর — এভাবে মোট ৭ চক্কর। সাফা থেকে শুরু, মারওয়ায় শেষ।
- পুরুষরা সবুজ বাতির মাঝের অংশে হারওয়ালা (দ্রুত হাঁটা) করবে।
- সাঈতে নির্দিষ্ট দুআ নেই; যিকির, তাসবিহ, দুআ, কুরআন তিলাওয়াত করা যায়। তবে বেশি বেশি আল্লাহর যিকির ও দুআ করা উত্তম।
৫. চুল কাটা (হালক/কসর)
- সাঈ শেষে পুরুষরা মাথা মুণ্ডানো (হালক) বা চুল ছোট করা (কসর) — হালক উত্তম।
- নারীরা এক আঙুলের অগ্রভাগ পরিমাণ চুল কাটবে।
- এতে ইহরামের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয় এবং উমরাহ সম্পন্ন হয়।
হাদিস: রাসূল ﷺ বলেছেন, "আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন যে মাথা মুণ্ডন করে।" (সহিহ বুখারি: ১২৬১)
৬. উমরাহর পর করণীয়
- মসজিদুল হারামে বেশি বেশি নামাজ, তাওয়াফ, তিলাওয়াত।
- মদীনা সফর করলে রওজা জিয়ারত।
- সর্বদা তালবিয়া, তাসবিহ, দরুদ, ইস্তিগফার।
গুরুত্বপূর্ণ হানাফি নোট
- সাঈর হুকুম: হানাফি মাযহাবে সাঈ ওয়াজিব; ছেড়ে দিলে দম (কুরবানি) ওয়াজিব হবে।
- মিকাত: ইহরাম মিকাতের আগে বাঁধা আবশ্যক; মিকাত অতিক্রম করে ইহরাম বাঁধলে দম ওয়াজিব।
- নারীদের বিশেষ মাসআলা: হায়েজ-নিফাস অবস্থায় তাওয়াফ করা যাবে না; ইহরাম বাঁধা যাবে, তবে পবিত্র হওয়ার পর তাওয়াফ করতে হবে।
- তাওয়াফে ইদতিবা: পুরুষরা তাওয়াফে চাদর ডান কাঁধে রেখে বাম কাঁধ খোলা রাখা সুন্নত (শুধু তাওয়াফে, নামাজে নয়)।
রেফারেন্স:
- আল-হিদায়া (কিতাবুল হজ)
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন) — কিতাবুল হজ
- ফাতাওয়া আলমগিরি (হজ অধ্যায়)
- ফাতাওয়া উসমানি (হজ-উমরাহ অধ্যায়)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া
- বেহেশতী জেওর (হজ-উমরাহ অংশ)
- মাআরিফুল কুরআন (সূরা বাকারা: ১৯৬-২০৩)
- সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম (কিতাবুল হজ)
আল্লাহ আপনার উমরাহ কবুল করুন এবং সুস্থতার সাথে ফিরিয়ে আনুন। আমিন।