তালাক বা শর্তযুক্ত তালাক হয়েছে কিনা?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 703
Questioner: Mehedi Hassan
Question Asked: 24 May 2026, 09:27 PM
Reviewed & Published: 24 May 2026, 10:03 PM
Views: 71
Tokens: 3,737
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার স্ত্রী অনার্স ফাইনাল ইয়ারের একটা বিষয় অনুত্তীর্ণ হওয়ায় আবার পরীক্ষাটি দিতে চাচ্ছে। তো আমি চাইনা সে পরীক্ষা দিক এবং ফোন কলে খুব গরম হয়ে তাকে সেটা জানাইছিলাম। তো আমার স্ত্রী যখন আমাকে বুঝতোনা আমার ইচ্ছে হতো তাকে তালাক দিয়ে দিবো। তো প্রায় সময় আমি তাকে তালাক দিয়ে দিবো এরকমটা মনে মনে ইচ্ছে ছিলো।
এবার ঘটনাটি বলি একদিন সকালে আমি গোসল করার আগে মনে মনে বলতেছিলাম অথবা ভাবতেছিলাম যে সেদিন ফোন কলে আমি তাকে এটা বলতাম "তুমি যদি পরীক্ষা দাও তাহলে আমি তোমাকে তালাক দিয়ে দিবো" আবার এটাও বলেছিলাম "তুমি যদি পরীক্ষা দাও তাহলে তুমি তালাক হয়ে যাবা" তো খুব সম্ভবত দ্বিতীয় বাক্যটি মনে মনে বলার সময় হঠাৎ মুখ দিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে হালকা আওয়াজ হয়ে বের হয়ে গেছে তবে বাক্যটা মুখ দিয়ে সম্পূর্ণ বের হয়েছিলো কিনা সে ব্যাপারে বর্তমানে সন্দিহান।

প্রশ্ন:১. এই ঘটনায় তালাক কার্যকর হয়েছে কি হয়নি অথবা শর্তযুক্ত তালাক কি হবে?
২.বাক্যটি স্পষ্ট ছিলো কিনা যাচাই করার জন্য আমি আবার নিজেই মাগরিবের নামাজ আদায় করে মসজিদ থেকে বের হয়ে হালকা আওয়াজ দিয়ে অস্পষ্ট ভাবে বলেছি এতেও কি তালাকের বিষয় আসবে অথবা শর্তযুক্ত তালাক হবে??

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم

প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার ঘটনা বিশ্লেষণ করে আমরা নিম্নোক্ত সমাধান দিচ্ছি। দয়া করে মনোযোগ দিয়ে পড়ুন এবং নিজের অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নিন।

প্রশ্ন ১: প্রথম ঘটনায় তালাক কার্যকর হয়েছে কি?

আপনি বর্ণনা করেছেন যে, গোসলের আগে আপনি মনে মনে ভাবছিলেন বা বলছিলেন— “তুমি যদি পরীক্ষা দাও তাহলে আমি তোমাকে তালাক দিয়ে দিবো” এবং “তুমি যদি পরীক্ষা দাও তাহলে তুমি তালাক হয়ে যাবা”। দ্বিতীয় বাক্যটি বলার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে মুখ দিয়ে হালকা আওয়াজ বের হয়ে যায়, তবে পুরো বাক্যটি মুখ দিয়ে বের হয়েছিল কিনা তা নিয়ে আপনার সন্দেহ আছে।

হানাফী ফিকহের মূলনীতি:

১. তালাক শুধু তখনই কার্যকর হয় যখন তা স্পষ্ট শব্দে উচ্চারিত হয় এবং শ্রবণযোগ্য হয়।

  • ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, তালাকের জন্য অন্তত নিজের কানে শোনা যাওয়া আবশ্যক। যদি কেবল মনে মনে ভাবা হয় বা মুখে বললেও শব্দ না হয় (যেমন শুধু ঠোঁট নাড়ানো), তাহলে তালাক কার্যকর হয় না।
  • রদ্দুল মুহতার-এ এসেছে: “তালাকের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শুধু মনের ইচ্ছা বা চিন্তা যথেষ্ট নয়; বরং তা উচ্চারিত হতে হবে এবং নিজের কানে শোনা যেতে হবে।” (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪০)

২. মনের কথা এবং অস্পষ্ট উচ্চারণের বিধান:

  • হাদীসে এসেছে: “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনের কথা ক্ষমা করে দেন, যতক্ষণ না তারা তা বলার বা কাজ করার মাধ্যমে প্রকাশ করে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫২৬৯)
  • অর্থাৎ কেবল মনের কল্পনা বা ইচ্ছা তালাকের জন্য যথেষ্ট নয়। আপনার ক্ষেত্রে আপনি যখন দ্বিতীয় বাক্যটি ‘মনে মনে’ বলছিলেন, তখন তা যদি সম্পূর্ণ ভুলেও মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়, কিন্তু আপনি নিশ্চিত নন যে পুরো বাক্যটি শ্রবণযোগ্য আওয়াজে বের হয়েছে কিনা— সেক্ষেত্রে সন্দেহের কারণে মূল অবস্থা (তালাক না হওয়া) বলবৎ থাকবে।

৩. শর্তযুক্ত তালাক (তা‘লীক):

  • আপনি যে বাক্যটি বলেছেন তা যদি শর্তযুক্ত তালাক হয় (যেমন “যদি পরীক্ষা দাও তাহলে তালাক”), তবে শর্ত পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হয় না। এখানে আপনি পরীক্ষা দেওয়ার শর্তারোপ করেছিলেন, কিন্তু আপনি অনিশ্চিত যে শর্তটি উচ্চারিত হয়েছে কিনা। যেহেতু উচ্চারণ নিয়ে সন্দেহ, শর্তযুক্ত তালাকও প্রমাণিত হবে না।
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে বলা হয়েছে: “শর্তযুক্ত তালাকের ক্ষেত্রেও উচ্চারণ স্পষ্ট ও শ্রবণযোগ্য হওয়া জরুরি।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৩০)

সিদ্ধান্ত:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথম ঘটনায় কোনো তালাক কার্যকর হয়নি। কারণ:

  • আপনি নিশ্চিত নন যে বাক্যটি সম্পূর্ণ মুখ দিয়ে বের হয়েছে কিনা।
  • অনিচ্ছাকৃত এবং অস্পষ্ট আওয়াজ হওয়ায় তা তালাকের জন্য যথেষ্ট নয়।
  • মনের ইচ্ছা বা চিন্তা তালাকের কারণ হয় না।

প্রশ্ন ২: মাগরিবের নামাজের পরে আবার নিজেই হালকা আওয়াজে অস্পষ্টভাবে সেই বাক্য বলার কারণে কি তালাক হবে?

আপনি লিখেছেন যে বাক্যটি স্পষ্ট ছিল কিনা যাচাই করার জন্য আপনি মাগরিবের নামাজের পরে মসজিদ থেকে বের হয়ে নিজেই হালকা আওয়াজে অস্পষ্টভাবে বাক্যটি বলেছেন। এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:

১. নিয়ত (ইচ্ছা):

  • আপনি যদি শুধু পরীক্ষা করার জন্য বা আগের ঘটনার সত্যতা যাচাই করার জন্য বলেন, এবং আপনার উদ্দেশ্য তালাক দেওয়া না হয়, তবে তা তালাক গণ্য হবে না।
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় উল্লেখ আছে: “তালাকের জন্য নিছক শব্দ উচ্চারণ যথেষ্ট নয়; বরং তা তালাকের নিয়তে বলতে হবে। যদি কেউ শুধু ‘তালাক’ শব্দটি বারবার বলে কিন্তু তার দাম্পত্য সম্পর্ক ছিন্ন করার ইচ্ছা না থাকে, তবে তালাক হয় না।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৫৮)

২. শব্দের অস্পষ্টতা:

  • আপনি নিজেই বলেছেন যে ‘হালকা আওয়াজ দিয়ে অস্পষ্টভাবে’ বলেছেন। যদি তা আপনার নিজের কানেও স্পষ্ট না শোনা যায়, তবে তা তালাকের জন্য যথেষ্ট নয়।
  • উসুলুশ শাশী-তে বলা হয়েছে: “তালাকের উচ্চারণ এমন স্পষ্ট হতে হবে যে তা নিজের কানে শোনা যায়। নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়ানো বা অস্পষ্ট গুঞ্জন তালাকের জন্য যথেষ্ট নয়।”

৩. নতুন তালাকের ঘটনা:

  • যদি আপনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে থাকেন এবং তা নিজের কানে শুনতে পান, তবে তা একটি নতুন তালাক গণ্য হতে পারে। কিন্তু আপনি যেহেতু ‘পরীক্ষা’ করার জন্য বলেছেন, সেক্ষেত্রে আপনার নিয়ত ছিল না। সুতরাং তালাক কার্যকর হবে না।
  • তবে সতর্কতার জন্য বলা যায়, এ ধরনের পরীক্ষা করা উচিত নয়। কারণ এতে নিজের এবং স্ত্রীর মনে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

সিদ্ধান্ত:
দ্বিতীয় ঘটনাটি তালাকের জন্য গণ্য হবে না, কারণ:

  • আপনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে তালাক দেননি, বরং পরীক্ষা করছিলেন।
  • শব্দটি অস্পষ্ট ও হালকা আওয়াজে ছিল।
  • হানাফী ফিকহে তালাকের জন্য স্পষ্ট উচ্চারণ এবং তালাকের নিয়ত উভয়ই শর্ত।

সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ:

  • প্রথম ঘটনায় তালাক হয়নি।
  • দ্বিতীয় ঘটনায়ও তালাক হয়নি।
  • আপনার স্ত্রী যদি পরীক্ষা দেয়, তবুও কোনো তালাক কার্যকর হবে না, কারণ আপনি শর্তারোপও স্পষ্টভাবে করেননি।

পরামর্শ:

  • ভবিষ্যতে এ ধরনের সন্দেহজনক পরিস্থিতি এড়িয়ে চলুন। রাগ বা কথা বলার সময় তালাকের শব্দ ব্যবহার না করাই উত্তম।
  • আপনি যদি নিজেই নিশ্চিত না হন, তবে স্থানীয় কোনো নির্ভরযোগ্য মুফতির নিক�ে সরাসরি যান। তারা আপনার অবস্থা ভালোভাবে বুঝে ফতোয়া দিতে পারবেন।
  • আপনার স্ত্রীর সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করুন এবং দ্বীনি শিক্ষার ভিত্তিতে মতানৈক্য সমাধান করুন।

আল্লাহ তাআলা আপনার দাম্পত্য জীবনকে বরকতময় করুন এবং সন্দেহ থেকে রক্ষা করুন। (আমীন)

উল্লেখিত কিতাব:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন)
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
  • উসুলুশ শাশী
  • সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীস

مَنْ سَأَلَ عَنْ شَيْءٍ فَلْيَسْأَلْ بِرِفْقٍ
(যে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে, সে যেন নম্রভাবে জিজ্ঞাসা করে।)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.