কন্ট্রাক্ট ফার্মিং ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে জায়েয কি না?
Business and Job · Hanafi
Question
কোম্পানির সাথে কন্টাক্ট ফার্মিংঃ
*** কোম্পানির পক্ষ থেকে যা দেওয়া হয় (বিনা মূল্যে/অগ্রিম মূল্য ছাড়া) ***
১। খামারিকে কোনো অগ্রিম পুঁজি ছাড়া ১ দিনের মুরগির বাচ্চা, খাদ্য (ফিড), ওষুধ এবং ভ্যাকসিন কোম্পানি সরবরাহ করে।
২। কোম্পানির প্রতিনিধিরা নিয়মিত খামার পরিদর্শন করেন, ব্রুডিং ও পরিচর্যার বিষয়ে পরামর্শ দেন।
৩। কোম্পানি যে বাচ্চা, খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ করছে, তার নিরাপত্তা এবং চুক্তির সত্যতা নিশ্চিত করতে খামারির কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের সিকিউরিটি চেক বা জামানত রাখা হয়। (এটি শুধুমাত্র মালামাল বা মুরগি চুরি/ অনিয়ম রোধের জন্য নেওয়া হয়, বাজারের লোকসানের জন্য নয়)।
৪। মুরগি বড় হওয়ার পর কোম্পানি নিজেরাই বাজার দরে বিক্রি করে এবং খামারি নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক বা লাভ দেয়।
৫। কোনো কারণে খামারে রোগ দেখা দিলে বা মড়ক লেগে মুরগি মারা গেলেও খামারির পুঁজি হারানোর ভয় থাকে না। তবে যে কয়টি মুরগি বেঁচে থাকবে ও বিক্রি হবে, সেগুলোর ওজনের ওপর খামারি তাঁর গ্রোয়িং চার্জ পাবেন।
**৬। খামারের বিদ্যুৎ বিল, পানির খরচ, তুষ/লিটার, ব্রুডিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় তাপ (বিদ্যুৎ) এবং শ্রমিকের খরচ (বা নিজের শ্রম) খামারিকে বহন করতে হবে।
*** মুরগী প্রতিপালন খামারীর মজুরী ও ক্ষতিপূরণ সমন্বয়কৃত পদ্ধতি ***
(নিম্নোক্ত মজুরী নির্ধারণ *** ফার্মস লিমিটেড কর্তৃক সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হইতে পারে।)
*** ফার্মস লিমিটেড কর্তৃক সরবরাহকৃত একদিন বয়সী ব্রয়লার মুরগীর বাচ্চা পূর্ণ বয়স্ক বা প্রত্যাশিত বৃদ্ধি করণের জন্য ওজন অনুযায়ী নির্ধারিত মজুরী নিম্নোক্ত হারে প্রদান করা হইবে।
ইহা মুরগী প্রতিপালন খামারী কর্তৃক স্বীকৃত যে, খামারের প্রতিটি জীবিত মুরগী পূর্ণ বয়স্ককরণে বা বাচ্চা প্রত্যাশিত বৃদ্ধি করণের জন্য ওজন করণ সাপেক্ষে *** ফার্মস লিমিটেড খামারীকে নিম্নোক্ত হারে একটি নির্ধারিত মজুরী প্রদান করিবে। এখানে প্রত্যাশিত (Standard) উপাদানসমূহ, যেমন:
(ক) মুরগীর দৈহিক ওজন ২ কেজি।
(খ) মুরগীর মৃত্যুহার ৫% (প্রতি ১০০ মুরগীতে মৃত্যু ৫টি)।
(গ) মুরগীর এফ সি আর ১.৫ (Feed Conversion Ratio অর্থাৎ খাদ্য গ্রহণের সাথে মুরগীর দৈহিক ওজন বৃদ্ধির অনুপাতকে বুঝায়, যেমন ৩ কেজি খাদ্য খেয়ে ২ কেজি ওজন হলে FCR হবে ৩/২ = ১.৫)।
(ঘ) মুরগীর গড় বিক্রয় মূল্য (১২০.০১–১৩০.০০ টাকা) ইত্যাদি।
উপরিউক্ত যেকোনো একটি উপাদানের হ্রাস বা বৃদ্ধির কারণে একজন মুরগী প্রতিপালন খামারী প্রণোদনা বা কর্তন নিম্নোক্ত তফসিল অনুযায়ী প্রাপ্ত হবেন:
মুরগী পূর্ণ বয়স্ক বা প্রত্যাশিত (Standard) বৃদ্ধি করণের জন্য নির্ধারিত মজুরী হিসাবে প্রতি কেজি ১৬.৫৭ টাকা খামারী পাবে, যখন মুরগীর প্রত্যাশিত (Standard) দৈহিক গড় ওজন ২ কেজি, প্রত্যাশিত মৃত্যুহার ৫%, প্রত্যাশিত এফ সি আর ১.৫ এবং প্রত্যাশিত গড় বিক্রয় মূল্য (১২০.০১–১৩০.০০ টাকা) হবে।
***মুরগির উৎপাদন ( প্রত্যাশিত/ Standard ওজন) কম বা বেশি হলে নির্ধারিত মজুরী কেজি প্রতি কম বেশি হয়, নিম্নে কিছু কারন দেয়া হলঃ
১. মুরগীর প্রত্যাশিত (Standard) দৈহিক গড় ওজন প্রতি ১০০ গ্রাম বৃদ্ধি বা কমের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত (Standard) মজুরী হতে ০.৫৩ টাকা বেশি বা কম হবে, যখন মুরগীর মৃত্যুহার ৫%, এফ সি আর ১.৫ ও মুরগীর গড় বিক্রয় মূল্য (১২০.০১–১৩০.০০ টাকা) প্রত্যাশিত (Standard) থাকবে।
যেমন, দৈহিক ওজন ২ কেজির পরিবর্তে ২.১ কেজি হলে খামারী প্রত্যাশিত মজুরীর সাথে আরও ০.৫৩ টাকা বেশি পাবে। তখন খামারীর প্রাপ্ত মজুরী হবে (১৬.৫৭ + ০.৫৩) = ১৭.১০ টাকা।
একইভাবে দৈহিক ওজন ২ কেজির পরিবর্তে ১.৯ কেজি হলে খামারী প্রত্যাশিত মজুরী হতে ০.৫৩ টাকা কম পাবে। তখন খামারীর প্রাপ্ত মজুরী হবে (১৬.৫৭ − ০.৫৩) = ১৬.০৪ টাকা।
২. মুরগীর মৃত্যুহার প্রত্যাশিত (Standard) মৃত্যুহার হতে প্রতি ১% কম বা বেশির ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত (Standard) মজুরী হতে ০.১৩ টাকা বেশি বা কম হবে, যখন দৈহিক গড় ওজন, এফ সি আর ও বিক্রয় মূল্য প্রত্যাশিত (Standard) থাকবে।
যেমন, প্রত্যাশিত মৃত্যুহার ৫% পরিবর্তে ৪% হলে খামারী প্রত্যাশিত (Standard) মজুরীর সাথে আরও ০.১৩ টাকা বেশি পাবে। তখন খামারীর প্রাপ্ত মজুরী হবে (১৬.৫৭ + ০.১৩) = ১৬.৭০ টাকা।
একইভাবে প্রত্যাশিত মৃত্যুহার ৫% পরিবর্তে ৬% হলে খামারী প্রত্যাশিত মজুরী হতে ০.১৩ টাকা কম পাবে। তখন খামারীর প্রাপ্ত মজুরী হবে (১৬.৫৭ − ০.১৩) = ১৬.৪৪ টাকা।
৩. মুরগীর প্রত্যাশিত (Standard) এফ সি আর হতে প্রতি ০.০১ কম বা বেশির ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত (Standard) মজুরী হতে ০.২৫ টাকা বেশি বা কম হবে, যখন দৈহিক গড় ওজন, মুরগীর মৃত্যুহার ও বিক্রয় মূল্য প্রত্যাশিত (Standard) থাকবে।
যেমন, প্রত্যাশিত (Standard) এফ সি আর ১.৫০ পরিবর্তে ১.৪৯ হলে খামারী প্রত্যাশিত (Standard) মজুরীর সাথে আরও ০.২৫ টাকা বেশি পাবে। তখন খামারীর প্রাপ্ত মজুরী হবে (১৬.৫৭ + ০.২৫) = ১৬.৮২ টাকা।
একইভাবে প্রত্যাশিত (Standard) এফ সি আর ১.৫০ পরিবর্তে ১.৫১ হলে খামারী প্রত্যাশিত (Standard) মজুরী হতে আরও ০.২৫ টাকা কম পাবে। তখন খামারীর প্রাপ্ত মজুরী হবে (১৬.৫৭ − ০.২৫) = ১৬.৩২ টাকা।
৪. মুরগীর প্রত্যাশিত (Standard) গড় বিক্রয় মূল্য (১২০.০১–১৩০.০০ টাকা) হতে প্রতি ১০ টাকা বেশি বা কম হলে প্রত্যাশিত (Standard) মজুরীর সাথে ১ টাকা বেশি বা কম যুক্ত হবে, যখন দৈহিক গড় ওজন, মুরগীর মৃত্যুহার ও এফ সি আর প্রত্যাশিত (Standard) থাকবে।
যেমন, প্রত্যাশিত (Standard) বিক্রয় মূল্য (১২০.০১–১৩০.০০ টাকা) পরিবর্তে (১৩০.০১–১৪০.০০ টাকা) হলে খামারী প্রত্যাশিত (Standard) মজুরীর সাথে আরও ১ টাকা বেশি পাবে। তখন খামারীর প্রাপ্ত মজুরী হবে (১৬.৫৭ + ১) = ১৭.৫৭ টাকা।
একইভাবে প্রত্যাশিত বিক্রয় মূল্য (১২০.০১–১৩০.০০ টাকা) পরিবর্তে (১১০.০১–১২০.০০ টাকা) হলে খামারী প্রত্যাশিত মজুরীর সাথে আরও ১ টাকা কম পাবে। তখন খামারীর প্রাপ্ত মজুরী হবে (১৬.৫৭ − ১) = ১৫.৫৭ টাকা।
৫. সর্বনিম্ন (মজুরি) প্রত্যাশিত (Standard) বৃদ্ধিকরণ ফি প্রতি কেজিতে ৬ টাকা হারে প্রদান করা হবে।
৬. খামারী যদি কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কোম্পানি হতে ব্যবহার করে থাকে, তাহলে তাহার মূল্য খামারীর পাওনা টাকা হতে কর্তন করা হবে।
[***বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ খামারি পূর্ব থেকে আবগত থাকে যে মুরগির উৎপাদন খারাপ হলে কি পরিমান টাকা পাবে, আর উৎপাদন ভাল হলে কি পরিমান টাকা পাবে। ]
আমার প্রশ্ন হল এই পদ্ধতিতে কি কোম্পানির সাথে কন্টাক্ট ফার্মিং করা যাবে?
Answer
কন্ট্রাক্ট ফার্মিং: ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ
উত্তর: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমান সময়ে বহুল প্রচলিত একটি ব্যবসায়িক পদ্ধতি নিয়ে। সংক্ষেপে বলতে গেলে—আপনার বর্ণিত পদ্ধতিতে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং সরাসরি জায়েয হবে না, কারণ এতে একাধিক শরীয়ত-বিরোধী উপাদান (গারার/অনিশ্চয়তা, জুয়ালার সাদৃশ্য, মজুরি ও ক্ষতিপূরণের সংমিশ্রণ) বিদ্যমান। তবে কিছু সংশোধনীর মাধ্যমে এটিকে শরীয়তসম্মত করা সম্ভব। বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো।
১. চুক্তির প্রকৃতি নির্ণয়
আপনার বর্ণিত চুক্তিতে দু'টি দিক মিশ্রিত রয়েছে:
- (ক) মুদারাবা/শিরকতের দিক: কোম্পানি পুঁজি (বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ) সরবরাহ করছে, খামারি শ্রম দিচ্ছে।
- (খ) ইজারার (মজুরির) দিক: খামারি নির্দিষ্ট হারে (প্রতি কেজি ১৬.৫৭ টাকা) মজুরি পাচ্ছে।
শরীয়তে একই চুক্তিতে ইজারা (মজুরি) ও শিরকত (লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্ব) একত্র করা নাজায়েয। কারণ এতে মজুরি নির্ধারিত থাকলে শ্রমিক লাভ-ক্ষতির অংশীদার থাকে না, আর অংশীদার হলে নির্দিষ্ট মজুরি থাকে না। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ইজারা ও শিরকতের সংমিশ্রণে চুক্তি ফাসিদ (দুর্বল) হয়ে যায়। [রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল ইজারা; আল-হিদায়া, কিতাবুল মুদারাবা]
২. প্রধান শরীয়ত-বিরোধী দিকসমূহ
(ক) গারার (অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা)
চুক্তিতে মুরগির ওজন, মৃত্যুহার, FCR, বাজারদর—এসবের ভিত্তিতে মজুরি ওঠানামা করবে। অথচ চুক্তির সময় মজুরির পরিমাণ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। ইসলামী ফিকহে মজুরি (উজরত) নির্দিষ্ট ও সুনির্দিষ্ট হওয়া শর্ত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ اسْتَأْجَرَ أَجِيرًا فَلْيُعْلِمْهُ أَجْرَهُ» "যে ব্যক্তি কোনো শ্রমিক নিয়োগ করবে, সে যেন তার মজুরি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৮২; সুনানে নাসাঈ)
আপনার চুক্তিতে মজুরি ৬ টাকা থেকে ১৭.৫৭ টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করতে পারে—এটি সুস্পষ্ট গারার।
(খ) জুয়ালার (জুয়া) সাদৃশ্য
মৃত্যুহার, FCR, বাজারদরের ওপর মজুরি নির্ভরশীল—এসবই খামারির নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ফলে এটি এক ধরনের শর্তসাপেক্ষ লটারির মতো হয়ে যায়, যা জুয়ার সাদৃশ্য তৈরি করে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ "হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণয়ের তীর—এসব অপবিত্র, শয়তানের কাজ; সুতরাং তোমরা তা থেকে বেঁচে থাকো।" — (সূরা মায়িদা: ৯০)
(গ) ক্ষতিপূরণ ও মজুরির সংমিশ্রণ
মুরগি মারা গেলে খামারির "পুঁজি হারানোর ভয় থাকে না"—কিন্তু মৃত মুরগির খাদ্য, ওষুধ, বিদ্যুৎ, শ্রমের ক্ষতি কে বহন করবে? চুক্তিতে স্পষ্ট নয়। অথচ কোম্পানি মৃত মুরগির জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না, শুধু জীবিত মুরগির ওজনে মজুরি দিচ্ছে। এতে খামারি প্রকৃত ক্ষতির সম্মুখীন হয়, যা ইজারায় ক্ষতিপূরণের নীতি-এর পরিপন্থী।
(ঘ) সিকিউরিটি চেক/জামানত
চুরি বা অনিয়ম রোধে জামানত রাখা কবুল করা যায় (কাফালা/রাহন হিসেবে), যদি তা প্রকৃত ক্ষতির সমপরিমাণ হয় এবং অন্যায়ভাবে আটকে না রাখা হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক কোম্পানি এই জামানতকে বাজারের লোকসানের জন্য ব্যবহার করে, যা নাজায়েয। আপনার বর্ণনায় বলা হয়েছে "শুধুমাত্র চুরি/অনিয়ম রোধের জন্য"—এটি ঠিক থাকলে জামানত রাখা জায়েয। [রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুর রাহন]
(ঙ) অ্যান্টিবায়োটিকের মূল্য কর্তন
খামারি যদি অন্য কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে, তার মূল্য খামারির পাওনা থেকে কেটে নেওয়া—এটি একতরফা শর্ত, যা চুক্তিতে আগে থেকে স্পষ্ট না থাকলে ফাসিদ। তবে চুক্তিতে উল্লেখ থাকলে এবং খামারি সম্মত থাকলে জায়েয।
৩. শরীয়তসম্মত বিকল্প পদ্ধতি
আপনার চুক্তিকে শরীয়তসম্মত করতে নিম্নোক্ত দু'টি পদ্ধতির যেকোনো একটি অবলম্বন করুন:
পদ্ধতি-১: বিশুদ্ধ মুদারাবা (লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্ব)
- কোম্পানি পুঁজি দেবে (বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ), খামারি শ্রম ও খামার দেবে।
- মুনাফা নির্দিষ্ট অনুপাতে (যেমন ৬০:৪০) ভাগ হবে—টাকার অঙ্কে নয়।
- ক্ষতি হলে পুঁজির ক্ষতি কোম্পানি বহন করবে, শ্রমের ক্ষতি খামারি বহন করবে।
- মুরগি বিক্রির পর হিসাব হবে; আগে থেকে নির্দিষ্ট মজুরি থাকবে না।
- এটি ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মুদারাবা নীতির সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। [আল-হিদায়া, কিতাবুল মুদারাবা; ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ২৪৫]
পদ্ধতি-২: বিশুদ্ধ ইজারা (নির্দিষ্ট মজুরি)
- খামারি কোম্পানির কাছে নির্দিষ্ট মজুরিতে মুরগি প্রতিপালনের সেবা দেবে।
- মজুরি নির্দিষ্ট ও সুনির্দিষ্ট হবে (যেমন প্রতি মুরগি প্রতি মাসে X টাকা, বা প্রতি কেজি Y টাকা—কিন্তু ওজন, মৃত্যুহার, বাজারদরের ওপর নির্ভরশীল নয়)।
- খাদ্য, ওষুধ, বাচ্চা কোম্পানির মালিকানায় থাকবে; খামারি শুধু সেবা দেবে।
- মুরগি মারা গেলে মজুরি কমবে না (যদি খামারির অবহেলা না থাকে)।
- এটি ইজারার শরীয়তসম্মত রূপ। [রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল ইজারা; ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল ইজারা]
পদ্ধতি-৩: মুদারাবা + ওয়াদা (Promise) ভিত্তিক প্রণোদনা
- মূল চুক্তি হবে মুদারাবা (লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্ব)।
- অতিরিক্ত প্রণোদনা (বোনাস) কোম্পানি স্বেচ্ছায় ওয়াদা হিসেবে দেবে—চুক্তির শর্ত হিসেবে নয়।
- যেমন: "যদি FCR ১.৫-এর কম হয়, কোম্পানি স্বেচ্ছায় বোনাস দেবে"—এটি চুক্তির শর্ত নয়, বরং একতরফা ওয়াদা (ওয়াদা-ই-ইখতিয়ারি)।
- এটি মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর বর্ণিত পদ্ধতি। [ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ২৫০-২৫৫]
৪. আপনার চুক্তির নির্দিষ্ট বিষয়সমূহের ফিকহী বিধান
| বিষয় | বিধান | |------|------| | বিনা অগ্রিমে বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ সরবরাহ | জায়েয (মুদারাবা/শিরকতের পুঁজি হিসেবে) | | কোম্পানির প্রতিনিধির পরিদর্শন ও পরামর্শ | জায়েয | | সিকিউরিটি চেক/জামানত (চুরি রোধে) | জায়েয (কাফালা/রাহন হিসেবে) | | কোম্পানি নিজে বাজারদরে বিক্রি | জায়েয (মুদারাবায় কোম্পানি বিক্রয়ের দায়িত্বে থাকলে) | | মৃত্যুহার/FCR/ওজনের ওপর মজুরি ওঠানামা | নাজায়েয (গারার) | | মৃত মুরগির ক্ষতি খামারির বহন | নাজায়েয (ইজারার নীতির পরিপন্থী) | | বিদ্যুৎ, পানি, তুষ, শ্রম খামারির বহন | জায়েয (খামারি নিজের খরচ বহন করলে) | | অ্যান্টিবায়োটিকের মূল্য কর্তন | চুক্তিতে স্পষ্ট থাকলে জায়েয, নাহলে নাজায়েয | | সর্বনিম্ন ৬ টাকা মজুরি | জায়েয (যদি এটি ন্যূনতম গ্যারান্টি হয়) |
৫. চূড়ান্ত ফতোয়া
আপনার বর্ণিত পদ্ধতিতে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং করা যাবে না, কারণ:
১. মজুরি সম্পূর্ণ অনিশ্চিত (গারার) — যা ইজারার শর্ত পরিপন্থী। ২. মৃত্যুহার, FCR, বাজারদরের ওপর মজুরি নির্ভরশীল — জুয়ার সাদৃশ্য। ৩. মজুরি ও লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্বের সংমিশ্রণ — ফাসিদ। ৪. মৃত মুরগির ক্ষতি খামারির বহন — ইজারার নীতির পরিপন্থী।
সমাধান: উপরে বর্ণিত তিনটি পদ্ধতির যেকোনো একটি অবলম্বন করুন। বিশেষত পদ্ধতি-১ (বিশুদ্ধ মুদারাবা) অথবা পদ্ধতি-২ (বিশুদ্ধ ইজারা) অবলম্বন করা সর্বোত্তম। যদি কোম্পানি প্রণোদনা দিতে চায়, তবে তা চুক্তির শর্ত নয়, বরং স্বেচ্ছায় ওয়াদা হিসেবে দেবে।
৬. সংশোধিত চুক্তির খসড়া (মুদারাবা ভিত্তিক)
মুদারাবা চুক্তি
১. প্রথম পক্ষ (কোম্পানি) সরবরাহ করবে: ১ দিনের বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ, ভ্যাকসিন—যা মুদারাবার পুঁজি হিসেবে গণ্য হবে। ২. দ্বিতীয় পক্ষ (খামারি) সরবরাহ করবে: খামার, শ্রম, বিদ্যুৎ, পানি, তুষ/লিটার—যা মুদারাবার শ্রম হিসেবে গণ্য হবে। ৩. মুরগি বিক্রয়লব্ধ মুনাফা নির্দিষ্ট অনুপাতে ভাগ হবে (যেমন কোম্পানি ৬০%, খামারি ৪০%)। ৪. ক্ষতি হলে পুঁজির ক্ষতি কোম্পানি বহন করবে, শ্রমের ক্ষতি খামারি বহন করবে। ৫. মুরগি বিক্রয়ের পর হিসাব হবে; আগে থেকে নির্দিষ্ট মজুরি থাকবে না। ৬. কোম্পানি স্বেচ্ছায় প্রণোদনা দিতে চাইলে তা চুক্তির শর্ত নয়, বরং একতরফা ওয়াদা হিসেবে দেবে। ৭. চুরি/অনিয়ম রোধে জামানত রাখা যাবে, তবে বাজারের লোকসানের জন্য নয়।
উপসংহার: ইসলাম ব্যবসাকে উৎসাহিত করে, কিন্তু অনিশ্চয়তা ও জুয়া থেকে বিরত থাকতে বলে। আপনার চুক্তিতে কিছু সংশোধনী আনলে এটি হালাল ও বরকতময় হতে পারে। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب