হানাফি মাযহাবের অনুসারীদের জন্য তিন তালাকে এক তালাকের মাস'আলা গ্রহণ করা যাবে কি?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6876
Questioner: Zannatul Nayem
Question Asked: 14 Oct 2026, 12:55 AM
Reviewed & Published: 14 Oct 2026, 01:21 AM
Views: 9
Tokens: 8,273
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একটা বিষয় জানতে চাই, হানাফি ফিকহে এক বৈঠকে ৩ তালাক কে ৩ তালাক গণ্য করা হয়। কিন্তু আহলে হাদীস অনুসারে ১ বৈঠকে ৩ তালাক হলে ১ তালাক হয়ে। ধরি, একজন ব্যক্তির হানাফি অনুযায়ী তার তালাক হয়ে গেছে কিন্তু আহলে হাদীস অনুযায়ী তো তার তালাক হচ্ছে না । তো আমার question হচ্ছে যে একটা মানুষ হয়তোবা মাজহাবের ব্যাপারে জানেই না অথবা তার মাযহাবের জ্ঞান নাই কিন্তু সে সারাটা জীবন হানাফি মাজহাবের আন্ডারেই সে থেকেছে । কিন্তু সংসার বাঁচানোর উদ্দেশ্যে হোক বা যেভাবেই হোক না কেন, সে এখন আহলে হাদিসের এই মতটা গ্রহণ করতে চায় । তো সাধারণত আমরা যে মাজহাবের আন্ডারে থাকি অন্য মাজহাবের কোনো একটা কথা নিলে সেটাকে বলা হয় হচ্ছে তাকলিদ। তো তাকলিদ যদি করে তাহলে হচ্ছে সেটা তো গুনাহ । কিন্তু সেটা তো সরাসরি হারাম না তাই না? তো সেক্ষেত্রে যদি কেউ সংসার বাঁচানোর উদ্দেশ্যে অথবা মতপার্থক্যের কারণে আহলে হাদিসের মতটা নিতে চায় এবং সংসার কন্টিনিউ করে তাহলে কি তার সংসার করাটা নাজায়েজ হবে? কারণ আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষই তো মাজহাবের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল না এবং দেখা যাচ্ছে অনেকে লা মাজহাবীও আছে । তো সেক্ষেত্রে আসলে আমি যেটা বললাম যে যদি তারা মতপার্থক্যের কারণে তালাক হয়নি এই মতটা গ্রহণ করে সংসার কন্টিনিউ করে তাহলে কি তাদের তারা গুনাগার হবে?

Answer

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

জবাব,


১. মূল শরয়ী সিদ্ধান্ত:

হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, এক বৈঠকে বা এক বাক্যে তিন তালাক দিলে তিনটি তালাকই (তালাকে মুগাল্লাযাহ) পতিত হয়ে যায়।

তিন তালাক পতিত হওয়ার পর কেবল সংসার বাঁচানোর উদ্দেশ্যে বা সুবিধা নেওয়ার জন্য হানাফী মাযহাব ছেড়ে আহলে হাদীস/গায়রে মুকাল্লিদদের "১ তালাক হয়েছে" এমন মত গ্রহণ করে সংসার কন্টিনিউ করা ইসলামি শরীআতের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম, নাজায়েয এবং জঘন্য গোনাহ।

এমন অবস্থায় শরয়ী হালালা (অন্যত্র বিবাহের পর তালাক/মৃত্যু ও ইদ্দত পার হওয়া) ব্যতিত উক্ত নারীর সাথে স্বামী হিসেবে সহবাস বা সংসার পরিচালনা করা ব্যভিচার/যিনার সমতুল্য অকাট্য হারাম কাজ হবে।


২. ফিকহী প্রমাণ ও বিশদ ব্যাখ্যা:

  • ক) এক বৈঠকে তিন তালাকের শরয়ী বিধান:
    সাহাবায়ে কেরামের ইজমা (ঐকমত্য), ইমাম আবু হানীফা (রহ.), ইমাম মালিক (রহ.), ইমাম শাফে'ঈ (রহ.) ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ জুমহুরে উলামার মতানুযায়ী—কেউ এক বৈঠকে একত্রে তিন তালাক দিলে তিনটি তালাকই কার্যকর হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

    «فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ»
    "অতঃপর সে যদি তাকে (তৃতীয়) তালাক দেয়, তবে এরপর সে আর তার জন্য হালাল হবে না; যতক্ষণ না সে অন্য কোনো স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।" (সূরা বাকারা: ২৩১)।

  • খ) সুবিধা অনুযায়ী মত পরিবর্তন ('ততব্বু'উর রুখাছ'):
    কোনো ব্যক্তি যদি সাধারণত হানাফী মাযহাব বা হানাফী আলেমদের অধীনে পরিচালিত সমাজে বসবাস করে, তবে কোনো বিপদে পড়ে বা নিজের চাহিদা/সংসার বাঁচানোর স্বার্থে ভিন্ন মাযহাব বা গায়রে মুকাল্লিদদের শিথিল মত গ্রহণ করাকে ফিকহের পরিভাষায় 'ততব্বু'উর রুখাছ' (تتبع الرخص - সুবিধাবাদ/প্রবৃত্তির অনুসরণ) বলা হয়।

    ফুকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো—নিজের খেয়ালখুশি মতো বা বিপদ থেকে বাঁচতে ভিন্ন মতের অনুসরণের মাধ্যমে 'ততব্বু'উর রুখাছ' করা শরীআতে অকাট্যভাবে হারাম ও নাজায়েয।

  • গ) অজ্ঞতা ও মাযহাব না জানার ওযর:
    সাধারণ মানুষ মাযহাবের পারিভাষিক গভীরতা না জানলেও তারা যে সমাজ, পরিবেশ ও আলেমদের ফতোয়া মেনে চলে, তাদের ওপর সেই মাযহাবের শরয়ী বিধানই প্রয়োগ হয়। তিন তালাক হয়ে যাওয়ার পর পাপ থেকে বাঁচতে বা সংসার টিকিয়ে রাখতে ভিন্ন কোনো মাযহাবের রূপ নিয়ে '১ তালাক হয়েছে' বলে চলা শরীআতের সাথে প্রতারণার শামিল।

  • ঘ) সংসার কন্টিনিউ করলে তার শরয়ী মর্যাদা:
    ৩ তালাকের পর উক্ত নারী স্বামীর জন্য সম্পূর্ণ 'হারামে মুগাল্লাযাহ' (অকাট্য হারাম) হয়ে যায়। সুতরাং আহলে হাদীসের '১ তালাক' সংক্রান্ত মত গ্রহণ করে সংসার চালিয়ে গেলে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক শরীআতের বিচারে উচ্ছেদ হয়ে যায় এবং তাদের মিলন ব্যভিচার হিসেবে গণ্য হবে।


৩. সংক্ষেপে আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর:

১. সংসার বাঁচানোর উদ্দেশ্যে আহলে হাদীসের মত নেওয়া কি জায়েয?
উত্তর: না, এটি জায়েয নয়। এটি 'ততব্বু'উর রুখাছ' বা দ্বীনের মধ্যে নিজের সুবিধা খোঁজার শামিল, যা হারাম। ২. এভাবে সংসার কন্টিনিউ করলে তারা কি গোনাহগার হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, তারা অকাট্যভাবে কঠিন গোনাহগার হবে এবং তাদের দাম্পত্য সম্পর্কটি সম্পূর্ণ অবৈধ বা হারাম সম্পর্ক হিসেবে গণ্য থাকবে।


সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:

১. দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):

  • পৃষ্ঠা: ২৬৬–২৬৭: (অধ্যায়: নিকাহ ও তালাক — এক বৈঠকে তিন তালাক দিলে তিন তালাকই পতিত হওয়া এবং তালাকে মুগাল্লাযাহ হওয়ার ফিকহী প্রমাণ) [দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৬৬, ২৬৭]।

২. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১২ খণ্ড):

  • পৃষ্ঠা: ২২০, ২২৫ & ২২৬: (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক, বাব তালাকুত তিন — এক মজলিসে তিন তালাকের শরয়ী বিধান এবং হালালা ছাড়া পুনরায় ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হওয়া) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১২ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২২০, ২২৫, ২২৬]।

৩. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):

  • পৃষ্ঠা: ২০৭ & ২৭০: (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক — একই বাক্যে বা বৈঠকে তিন তালাক দিলে তিন তালাক কার্যকর হওয়ার অকাট্য মাসআলা) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২০৭, ২৭০]।

৪. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১ খণ্ড):

  • পৃষ্ঠা: ১৪৯–১৫৩: (অধ্যায়: বাবুত তাকলীদ — তাকলীদের বিবরণ এবং সুবিধার্থে মাযহাব পরিবর্তন বা 'ততব্বু'উর রুখাছ' করা হারাম ও নাজায়েয হওয়ার ফতোয়া) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১ তম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৪৯]।

৫. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১১ খণ্ড):

  • পৃষ্ঠা: ৬২–৬৫: (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ — তিন তালাক হওয়ার পর অন্য মাযহাব বা গায়রে মুকাল্লিদদের ফতোয়া নিয়ে সংসার করার কঠিন নাজায়েয ও হারাম হওয়ার বিবরণ) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১১ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৬২]।

আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.