বিদেশে মদের বারের নিরাপত্তা কর্মী হিসেবে কাজ করা যাবে কি না?
Business and Job · Hanafi
Question
কাজের ধরণ: মদের বারে যেন ১৮ বছরের কম বয়সী কেউ না প্রবেশ করে, কেউ অত্যাধিক মাত্রায় মদ্যপান করে যেন ভিতরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে, এছাড়াও সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা।
Answer
মদের বারে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করার হুকুম
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, মদের বারে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করা জায়েয নয়। এটি হারাম কাজে সরাসরি সহযোগিতা ও মদ ব্যবসার একটি অংশ হিসেবে গণ্য হবে। উচ্চশিক্ষার ব্যয় নির্বাহের প্রয়োজনে বাধ্যতামূলক পরিস্থিতি (ইযতিরার) সৃষ্টি হলেও এটি শরীয়তসম্মত সমাধান নয়; বরং অন্য হালাল উপায় খুঁজতে হবে।
১. মূল নীতি: হারাম কাজে সহযোগিতা নিষিদ্ধ
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
"وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ" "নেক কাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরকে সহযোগিতা করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" — (সূরা মায়িদা: ২)
মদ সম্পর্কে কুরআনে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে:
"إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ" "নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণয়ের তীর—এসব অপবিত্র, শয়তানের কাজ; সুতরাং তোমরা তা থেকে বেঁচে থাকো।" — (সূরা মায়িদা: ৯০)
২. হাদীসে মদ সংক্রান্ত দশ শ্রেণির লোকের উপর লানত
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
"لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فِي الْخَمْرِ عَشَرَةً: الْخَامِرَ، وَالْمَخْمُورَ لَهُ، وَالشَّارِبَ، وَالْحَامِلَ، وَالْمَحْمُولَ إِلَيْهِ، وَالسَّاقِيَ، وَالْمُسْتَقِيَ، وَالْبَائِعَ، وَالْمُشْتَرِيَ، وَالْآكِلَ ثَمَنَهَا" "মদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ দশ শ্রেণির লোকের উপর লানত করেছেন: (১) যে মদ তৈরি করে, (২) যার জন্য তৈরি করা হয়, (৩) যে পান করে, (৪) যে বহন করে, (৫) যার কাছে বহন করে আনা হয়, (৬) যে পরিবেশন করে, (৭) যে পরিবেশন করায়, (৮) যে বিক্রি করে, (৯) যে ক্রয় করে এবং (১০) যে তার মূল্য ভক্ষণ করে।" — (সুনানে তিরমিযী: ১২৯৫; সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৭৪; ইবনে মাজাহ: ৩৩৮০)
ইমাম তিরমিযী (রহ.) এই হাদীসকে "হাসান-সহীহ" বলেছেন। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) ফাতহুল বারীতে এবং ইমাম নববী (রহ.) শরহে মুসলিমে এই হাদীসের সমর্থনে আলোচনা করেছেন।
ফিকহী ব্যাখ্যা: মদের বারে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করা উপরের তালিকার অন্তর্ভুক্ত—কারণ সে মদ বিক্রয় ও পান করার পরিবেশ রক্ষা, সংরক্ষণ ও পরিচালনায় সরাসরি সহায়তা করে। এটি মদের ব্যবসাকে সচল রাখার একটি অপরিহার্য অংশ।
৩. হানাফী ফিকহের স্পষ্ট বক্তব্য
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:
"الْإِعَانَةُ عَلَى الْمَعْصِيَةِ مَعْصِيَةٌ" "পাপের কাজে সহযোগিতা করাও পাপ।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯১, দারুল ফিকর সংস্করণ)
ফাতাওয়া আলমগীরী-তে আছে:
"وَلَا يَجُوزُ لِلْمُسْلِمِ أَنْ يَكُونَ أَجِيرًا لِلْخَمَّارِ فِي بَيْعِ الْخَمْرِ أَوْ حِرَاسَةِ بَيْتِ الْخَمْرِ" "কোনো মুসলিমের জন্য মদ বিক্রেতার কাছে মদ বিক্রয় বা মদের বারের পাহারাদারের কাজে নিযুক্ত হওয়া জায়েয নয়।" — (ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৪৮, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)
আল-হিদায়া-তে ইমাম বুরহানুদ্দীন মারগীনানী (রহ.) বলেন, মদ সংক্রান্ত যাবতীয় লেনদেন ও তার সহায়ক কাজ নিষিদ্ধ।
৪. "নিরাপত্তা রক্ষা" অজুহাতের খণ্ডন
প্রশ্নে বলা হয়েছে—কাজের ধরন হলো: ১৮ বছরের কম বয়সী কেউ যেন না ঢোকে, কেউ অতিরিক্ত মদ্যপান করে বিশৃঙ্খলা না করে, সার্বিক নিরাপত্তা দেওয়া।
এখানে লক্ষণীয়:
- এই কাজের মূল উদ্দেশ্যই মদের ব্যবসাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা। যদি মদ বিক্রি বন্ধ হয়, তবে এই নিরাপত্তাকর্মীর প্রয়োজনই থাকে না। অর্থাৎ এই চাকরি মদ ব্যবসার অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল।
- "বিশৃঙ্খলা রোধ" নামে যা করা হয়, তা আসলে মদ্যপায়ীদের আরামে মদ্যপান চালিয়ে যাওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা—যা সরাসরি পাপে সহায়তা।
- "১৮ বছরের কম বয়সী প্রবেশ রোধ"—এটি কাফির রাষ্ট্রের আইন; শরীয়তের দৃষ্টিতে মদপান সব বয়সের জন্যই হারাম। সুতরাং এই "নৈতিকতা" শরীয়তে কোনো বৈধতা দেয় না।
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) ও ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) স্পষ্ট বলেছেন: যে কাজ স্বভাবতই হারাম, তার সহায়ক কাজও হারাম।
৫. ইযতিরার (বাধ্যবাধকতা) দাবির পর্যালোচনা
কেউ কেউ বলতে পারেন—"জীবিকা নির্বাহের জন্য বাধ্য হয়ে করছি।" শরীয়তে ইযতিরার শর্ত হলো:
- প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকতে হবে (ক্ষুধায় মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত)।
- হারাম ছাড়া অন্য কোনো উপায় না থাকতে হবে—একেবারে না।
- প্রয়োজন পরিমাণে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।
ইমাম শাতিবী (রহ.) «আল-মুওয়াফাকাত»-এ বলেন, ইযতিরার শুধু প্রাণরক্ষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সম্মান বা শিক্ষার ব্যয় নির্বাহের জন্য নয়।
বাস্তবতা: অস্ট্রেলিয়ায় হালাল কাজের অসংখ্য সুযোগ আছে—রেস্টুরেন্ট (হালাল), সুপারশপ, ক্লিনিং, ডেলিভারি, গ্যাস স্টেশন, ফ্যাক্টরি, কৃষিকাজ, কেয়ার-ওয়ার্কার, টিউশন ইত্যাদি। তাই "অন্য উপায় নেই" দাবি টিকে না।
৬. বিকল্প হালাল পথ
- হালাল রেস্টুরেন্ট/ক্যাফে-তে কাজ
- সুপারমার্কেট/স্টোর-এ কাজ
- ডেলিভারি সার্ভিস (Uber Eats, DoorDash—তবে শুধু হালাল খাবার ডেলিভারি)
- ক্লিনিং/হাউসকিপিং
- কেয়ার-ওয়ার্কার/এজড কেয়ার
- ক্যাম্পাসের ভেতরে পার্ট-টাইম কাজ (লাইব্রেরি, ক্যান্টিন)
- টিউশন/অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং
- কৃষি/ফার্ম কাজ (অস্ট্রেলিয়ায় ব্যাপক চাহিদা)
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানী»-তে বলেন, প্রয়োজনে কম আয়ে সন্তুষ্ট থাকা উত্তম, হারাম আয়ের বরকতহীন প্রাচুর্যের চেয়ে।
৭. উপসংহার ও তাওবার নির্দেশনা
- মদের বারে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করা সরাসরি হারাম।
- এই আয় খবিস ও নাপাক; এতে বরকত নেই, বরং দুনিয়া-আখিরাতের ক্ষতি।
- যদি কেউ ইতিমধ্যে করে ফেলে, তবে তাওবা করবে, চাকরি ছাড়বে এবং ঐ আয় সদকা করে দেবে (নিজে ভোগ করবে না)।
- আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে হালাল পথে রিজিক খুঁজলে আল্লাহ অবশ্যই রাস্তা খুলে দেবেন—এটি কুরআনের ওয়াদা:
"وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ" "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" — (সূরা তালাক: ২-৩)
📌 সারসংক্ষেপ টেবিল
| বিষয় | হুকুম | |---|---| | মদের বারে নিরাপত্তাকর্মী | হারাম (মদ ব্যবসায় সহযোগিতা) | | মদ পরিবেশন/বিক্রয়/পরিবহন | হারাম (হাদীসে লানত) | | বাধ্যতামূলক পরিস্থিতির দাবি | এখানে প্রযোজ্য নয় | | হালাল বিকল্প | অসংখ্য বিদ্যমান | | তাওবা | চাকরি ছাড়া + আয় সদকা + ভবিষ্যতে বিরত থাকা |
তথ্যসূত্র:
- সূরা মায়িদা: ২, ৯০; সূরা তালাক: ২-৩
- সুনানে তিরমিযী: ১২৯৫; সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৭৪; ইবনে মাজাহ: ৩৩৮০
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯১
- ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৪৮
- আল-হিদায়া (মারগীনানী), কিতাবুল কারাহিয়্যাহ
- ফাতাওয়া উসমানী (তাকী উসমানী), খণ্ড ৩
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী), খণ্ড ৪
- আল-মুওয়াফাকাত (শাতিবী), খণ্ড ২
আল্লাহ তা'আলা ভালো জানেন।