সরকারি ভাতা, করযে হাসানাহ সহ বিবিধ ৭টি প্রশ্নের উত্তর জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১.আমার দাদা মুক্তিযোদ্ধা সেই হিসেবে একটা বৃত্তি পাই। বৃত্তির ইনফরমেশন দেওয়ার সময় বাবার পেশা এবং ইনকাম ভুল দি। কিন্তু যতটুকু জানি বৃত্তি রেজাল্ট দেওয়া হয় SSC ও HSC পরিক্ষার রেজাল্টের উপর নির্ভর করে। এখন বাবার ইনফরমেশন ভুল দেওয়ার কারণে টাকা কি আমার জন্য হালাল হবে?
২. কর্যে হাসানা নিয়ে কুরবানি করলে কুরবানি হবে? শতভাগ হালাল টাকা হলে?
৩l আমরা একটা বাসায় উঠছি নতুন,আমাদের আগের ফ্যামিলি যাওয়ার সময় মিটারে প্রায় ১৭০টাকা রেখে গেছে।আমরা এইটা ব্যবহার করতেছি।এইটা কি হারাম হচ্ছে?
হারাম হলে করণীয় কি?
৪/কোনকারনে ওয়াক্তের মধ্যে সাহু সেজদা না দিলে নামাযে যে ত্রুটি হয়েছে এতে কি নামাযটা বাতিল হয়ে কাযা হয়ে যাবে?
৫/একজন শাইখুনা হাফিযাহুল্লাহ বলছিলেন,ভাগের মধ্যে একজনের ইনকাম একটু সমস্যা থাকলে এইটা নিয়ে চিন্তিত না হতে।
কুরবানির ভাগের মধ্যে একজনের ইনকামে সমস্যা থাকলে বাকি ভাগ যারা থাকবে তাদের সমস্যা হবেনা?
৬.বটি দিয়ে কাজ করার সময় নখের একটা অংশ কেটে গিয়েছে,যা দ্বারা গুতা লাগলে ব্যথা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।এ পর্যায়ে নখের ওই অংশটা কেটে ফেললে কি কুরবানির সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবো?
৭.কেউ যদি জিলহজ্জের প্রথম দশকে নিয়ত না করেই রোজা রাখে, (অর্থাৎ সে কাযা রোজা বা নফল রোজা কোনোটির নিয়ত করে নি। গতানুগতিক ভাবে রোজা রেখেছে) তাহলে কি রোজার সওয়াব পাবে? এটা কি রোজা হিসেবে গণ্য হবে?
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله
প্রশ্নগুলোর উত্তর নিম্নরূপ দেওয়া হলো। উত্তরগুলো হানাফি ফিকহের বিশুদ্ধ মত এবং কিতাবসমূহের রেফারেন্সের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।
১. দাদার মুক্তিযোদ্ধা বৃত্তি ও বাবার তথ্য ভুল দেওয়া
উত্তর:
বৃত্তি যদি শুধুমাত্র এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে দেওয়া হয় (পারিবারিক আর্থিক অবস্থা নির্বিশেষে), তবে বাবার পেশা ও আয় সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়া সত্ত্বেও বৃত্তির টাকা আপনার জন্য হালাল হবে। কারণ বৃত্তি পাওয়ার মূল শর্ত পূরণ হয়েছে (উচ্চ ফলাফল), এবং তথ্য ভুল দেওয়ার কারণে বৃত্তি প্রদানের প্রক্রিয়া প্রভাবিত হয়নি। তবে এ কাজটি গুনাহ (মিথ্যা বলা) এবং এর জন্য তওবা করতে হবে।
কিন্তু যদি বৃত্তির শর্তে পারিবারিক আয়ের সীমা নির্ধারিত থাকে এবং আপনি সেই সীমা অতিক্রম করার পরও ভুল তথ্য দিয়ে বৃত্তি পেয়ে থাকেন, তাহলে টাকা হারাম হবে এবং তা ফেরত দেওয়া বা সদকা করা জরুরি।
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫ (মালিকের অনুমতি ছাড়া অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রহণ নিষিদ্ধ)
- রদ্দুল মুহতার, ৫/২৬৪ (মিথ্যা বলে সরকারি সুবিধা নেওয়া হারাম)
২. করযে হাসানা (উৎসাহী ঋণ) নিয়ে কুরবানি
উত্তর:
যদি ঋণের টাকা শতভাগ হালাল হয় এবং আপনি নিজে কুরবানির নেসাবের মালিক হন, তাহলে করযে হাসানা নিয়ে কুরবানি করা বৈধ এবং কুরবানি আদায় হবে। কারণ কুরবানির জন্য সম্পদের মালিকানা শর্ত, উৎস নয়। তবে ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য থাকতে হবে।
রেফারেন্স:
- হিদায়া, ৪/৩৩২ (ঋণ নিয়ে কুরবানি বৈধ)
- ফাতাওয়া আলমগিরী, ৫/২৯৪ (ঋণের টাকায় কুরবানি সহীহ)
৩. নতুন বাসায় পূর্বের ফ্যামিলির রেখে যাওয়া বিদ্যুৎ বিলের টাকা ব্যবহার
উত্তর:
টাকাটি পূর্বের ভাড়াটিয়ার সম্পত্তি। তাদের অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হারাম।
করণীয়:
- তাদের সাথে যোগাযোগ করে টাকা ফেরত দিন বা অনুমতি নিন।
- যদি সম্ভব না হয়, তবে টাকাটি সওয়াবের নিয়তে সদকা করে দিন (নিয়ত রাখবেন যে মালিকের পক্ষ থেকে সদকা)।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার, ৪/১৬৭ (অন্যের মাল অনুমতি ছাড়া ব্যবহার নিষিদ্ধ)
- বেহেশতী জেওর, ২/৪৫০ (হারাম টাকা থেকে বাঁচার উপায়)
৪. ওয়াক্তের মধ্যে সাহু সিজদা না দেওয়া
উত্তর:
সাহু সিজদা ওয়াজিব। যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়াক্তের মধ্যে (সালাম ফেরানোর আগে) সাহু সিজদা না দেওয়া হয়, তবে নামাজ বাতিল হবে এবং কাযা করতে হবে। আর যদি ভুলে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তারপর সালাম ফেরানোর পর মনে পড়ে, তবে যদি সালামের পর খুব অল্প সময় (যেমন কয়েক মিনিট) অতিবাহিত হয়, তাহলে আবার সাহু সিজদা দিতে হবে এবং নামাজ সহীহ হবে। কিন্তু যদি অনেক সময় চলে যায়, তবে নামাজ বাতিল হয়ে কাযা ওয়াজিব হবে।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার, ২/৮৫ (সাহু সিজদা ছেড়ে দিলে নামাজের হুকুম)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/২৫০ (ওয়াক্তের মধ্যে সাহু সিজদা না দেওয়ার বিধান)
৫. কুরবানির ভাগে একজনের আয় সমস্যা থাকলে অন্যদের ওপর প্রভাব
উত্তর:
হানাফি মতে, কুরবানির পশুটি হালাল টাকায় কিনতে হবে। যদি ভাগে অংশগ্রহণকারী কারো সম্পদ হারাম বা সন্দেহজনক হয়, তবে শুধু তার অংশের কুরবানি সহীহ হবে না এবং তার ভাগের গোশত তার জন্য খাওয়া হারাম হবে। কিন্তু অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের কুরবানি সহীহ হবে যদি তাদের টাকা হালাল হয়। তারা চাইলে নিজেদের ভাগের গোশত খেতে পারবেন।
সতর্কতা: ভাগের আগে সবাইকে হালাল সম্পদের শর্ত জানিয়ে নেওয়া উচিত।
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া আলমগিরী, ৫/২৯৮ (হারাম টাকায় কুরবানি বাতিল)
- শরহু মাআনিল আসার, ২/১৪৫ (অংশীদারদের পৃথক পৃথক হুকুম)
৬. নখের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কাটা ও কুরবানির সওয়াব
উত্তর:
যে ব্যক্তি কুরবানি করার নিয়ত করেছে, তার জন্য জিলহজের ১ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত চুল ও নখ না কাটা মুস্তাহাব (উত্তম), কিন্তু ওয়াজিব নয়। যদি নখের অংশ কেটে গিয়ে ব্যথা হয় বা সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে ফেলা জায়েজ এবং এতে কুরবানির সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবেন না।
রেফারেন্স:
- বেহেশতী জেওর, ৩/৩২ (কুরবানির সময় চুল-নখ না কাটার নিয়ম)
- ফাতাওয়া উসমানী, ২/১৪০ (প্রয়োজনে নখ কাটা জায়েজ)
৭. জিলহজের প্রথম দশকে নির্দিষ্ট নিয়ত ছাড়া রোজা রাখা
উত্তর:
রোজা সহীহ হওয়ার জন্য নিয়ত জরুরি। যদি কেউ শুধু অভ্যাসবশত রোজা রাখে (কোনো নির্দিষ্ট নিয়ত ছাড়া), কিন্তু মনে প্রাণে আল্লাহর জন্য রোজা রাখার ইচ্ছা থাকে, তাহলে তা নফল রোজা হিসেবে গণ্য হবে এবং সওয়াব পাবেন। তবে জিলহজের প্রথম দশকের রোজার বিশেষ ফজিলত লাভের জন্য নির্দিষ্টভাবে নিয়ত করা উত্তম।
- যদি কেউ কাযা বা মান্নতের রোজা না করে শুধু নফল হিসেবে রাখে, তাহলে সওয়াব পাবে।
- যদি খাওয়া-দাওয়া না করার নিয়তে রাখে কিন্তু ইবাদতের নিয়ত না থাকে, তবে রোজা সহীহ হবে কি না তা সন্দেহজনক। তাই নিয়ত করে রাখা জরুরি।
রেফারেন্স:
- উসুলুশ শাশী, ১/৪২ (নিয়তের গুরুত্ব)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/২১৫ (নির্দিষ্ট নিয়ত ছাড়া রোজা সহীহ নয়)
সারসংক্ষেপ:
প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তর হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে প্রদত্ত। কোনো বিষয়ে আরও বিস্তারিত প্রয়োজনে স্থানীয় আলেমের শরণাপন্ন হোন।
و الله أعلم بالصواب