মানত হিসেবে একটার বেশি রোজা রাখতে হবে কি? হিন্দু মেয়েদের সামনে কিরূপ পর্দা করতে হবে?

Sunnah and Bid'ah · Hanafi

Question No: 6763
Questioner: Risa
Question Asked: 11 Oct 2026, 09:29 PM
Reviewed & Published: 11 Oct 2026, 10:01 PM
Views: 16
Tokens: 3,998
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

মানত হিসেবে কি একটার বেশি রোজা রাখতে হবে?
২, হিন্দু মেয়েদের সামনে কিরূপ পর্দা করতে হবে?

Answer

মানত প্রসঙ্গে: একাধিক রোজা ও হিন্দু মেয়েদের সামনে পর্দার বিধান

প্রশ্ন ১: মানত হিসেবে কি একটার বেশি রোজা রাখতে হবে?

উত্তর:

মানত (নযর) একটি ইবাদত, যা বান্দা নিজের উপর স্বেচ্ছায় ওয়াজিব করে নেয়। মানতের রোজার বিধান সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে হানাফি ফিকহের সিদ্ধান্ত নিম্নরূপ:

মূলনীতি

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَلْيُوفُوا نُذُورَهُمْ "আর তারা যেন তাদের মানত পূর্ণ করে।" (সূরা আল-হজ, আয়াত: ২৯)

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:

مَنْ نَذَرَ أَنْ يُطِيعَ اللَّهَ فَلْيُطِعْهُ "যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের মানত করে, সে যেন তাঁর আনুগত্য করে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৬৯৬)

মানতের রোজার সংখ্যা নির্ধারণ

১. মানত যদি নির্দিষ্ট সংখ্যার হয়: যদি কেউ বলে "আমি তিনটি রোজা রাখব" বা "সাতটি রোজা রাখব" — তাহলে ঠিক সেই সংখ্যক রোজাই রাখতে হবে। একটি বেশি বা কম করা যাবে না।

২. মানত যদি অনির্দিষ্ট হয়: যদি কেউ বলে "আমি রোজা রাখব" কিন্তু সংখ্যা উল্লেখ না করে — তাহলে একটি রোজা রাখলেই মানত পূর্ণ হয়ে যাবে। কারণ অনির্দিষ্ট মানতের সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো একটিই।

৩. মানত যদি "বেশি রোজা" বা "অনেক রোজা" বলে: এক্ষেত্রে কমপক্ষে তিনটি রোজা রাখা ওয়াজিব হবে। কারণ আরবি ভাষায় "বেশি" (كثير) শব্দের সর্বনিম্ন সংখ্যা তিন।

হানাফি কিতাবের বক্তব্য

আল-হিদায়া গ্রন্থে উল্লেখ আছে:

"যদি কেউ বলে 'আমি আল্লাহর জন্য রোজা রাখার মানত করলাম' এবং সংখ্যা উল্লেখ না করে, তাহলে একদিন রোজা রাখাই যথেষ্ট। আর যদি বলে 'কয়েকদিন' বা 'বেশি দিন', তাহলে তিনদিন।"

(আল-হিদায়া, কিতাবুস সাওম, মানতের অধ্যায়)

রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামি) গ্রন্থে এসেছে:

"অনির্দিষ্ট মানতের ক্ষেত্রে একদিনই ওয়াজিব। আর 'বেশি' শব্দ বললে তিনদিন ওয়াজিব।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৩০)

ফাতাওয়া উসমানি তে মুফতি তাকি উসমানি সাহেব বলেন:

"মানতের রোজা যদি নির্দিষ্ট সংখ্যায় হয়, তবে সেই সংখ্যাই আদায় করতে হবে। আর যদি অনির্দিষ্ট হয়, তবে এক রোজাই যথেষ্ট। তবে 'বেশি' বললে তিন রোজা ওয়াজিব হবে।"

সারসংক্ষেপ

| মানতের ধরন | ওয়াজিব রোজার সংখ্যা | |---|---| | নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ | ঠিক সেই সংখ্যা | | অনির্দিষ্ট (শুধু "রোজা") | ১টি | | "বেশি" বা "অনেক" | ৩টি |

তাই প্রশ্নের উত্তরে: আপনি যদি মানত করার সময় নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ না করে থাকেন, তবে একটি রোজা রাখলেই মানত পূর্ণ হবে। তবে যদি "বেশি রোজা" বলে থাকেন, তাহলে তিনটি রাখতে হবে। আর যদি নির্দিষ্ট সংখ্যা বলে থাকেন, তবে সেই সংখ্যাই রাখতে হবে।


প্রশ্ন ২: হিন্দু মেয়েদের সামনে কিরূপ পর্দা করতে হবে?

উত্তর:

মূলনীতি: পর্দা সর্বাবস্থায় ফরজ

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا "আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা প্রকাশ্য।" (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩১)

আল্লাহ আরও ইরশাদ করেন:

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ "হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের ও মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়।" (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৯)

হিন্দু মেয়েদের সামনে পর্দার বিধান

১. হিন্দু মেয়েরা যদি নিকটাত্মীয় হয়: যেমন — হিন্দু মা, হিন্দু বোন, হিন্দু খালা, হিন্দু ফুফু — তাহলে তাদের সামনে পর্দা করা ওয়াজিব নয়। কারণ আয়াতে "মা, বোন, খালা, ফুফু" বলে সাধারণভাবে আত্মীয়দের উল্লেখ করা হয়েছে, ধর্মের ভিত্তিতে নয়। তবে তাদের সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শন থেকে বিরত থাকা উত্তম।

২. হিন্দু মেয়েরা যদি গায়র-মাহরাম হয়: যেমন — প্রতিবেশী হিন্দু মেয়ে, সহপাঠী, সহকর্মী — তাহলে তাদের সামনে পূর্ণ পর্দা করতে হবে। অর্থাৎ:

  • মাথা, চুল, কান, গলা, বাহু, পা — সব ঢেকে রাখতে হবে।
  • শুধু মুখমণ্ডল, হাতের কব্জি ও পায়ের পাতা (হানাফি মতে) খোলা রাখা যাবে।
  • তবে ফিতনার আশঙ্কা থাকলে মুখমণ্ডলও ঢেকে রাখা ওয়াজিব।

৩. হিন্দু মেয়েদের সামনে পর্দার বিশেষ দিক: হিন্দু মেয়েরা যদি মুসলিম নারীদের সৌন্দর্য দেখে বর্ণনা করে দেয় মুসলিম পুরুষদের কাছে, তাহলে তা ফিতনার কারণ হতে পারে। তাই তাদের সামনে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা উচিত।

হানাফি কিতাবের বক্তব্য

রাদ্দুল মুহতার গ্রন্থে ইবনে আবিদীন শামি রহ. বলেন:

"গায়র-মাহরাম নারীর সামনে পর্দা করা ফরজ, সে মুসলিম হোক বা কাফির। কারণ পর্দার বিধান ঈমানের সাথে সম্পর্কিত, ব্যক্তির ধর্মের সাথে নয়।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৬৯)

ফাতাওয়া আলমগিরি তে এসেছে:

"মুসলিম নারীর জন্য গায়র-মাহরাম কাফির নারীর সামনেও পর্দা করা ওয়াজিব, যদি সে নারী প্রাপ্তবয়স্ক হয়।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩২৮)

বাহিশতী জেওর এ হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রহ. বলেন:

"গায়র-মাহরাম নারীর সামনে পর্দা করা ফরজ। হিন্দু, খ্রিস্টান বা অন্য কোনো ধর্মের নারী হলেও তার সামনে পর্দা করতে হবে।" (বাহিশতী জেওর, পর্দার অধ্যায়)

মা'আরিফুল কুরআন এ মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ. বলেন:

"পর্দার বিধান সব নারীর জন্য প্রযোজ্য, সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম। কারণ পর্দা হলো ঈমানের অংশ।" (মা'আরিফুল কুরআন, সূরা আন-নূরের তাফসির)

সারসংক্ষেপ

| সামনে কে? | পর্দার বিধান | |---|---| | নিকটাত্মীয় হিন্দু নারী (মা, বোন, খালা, ফুফু) | পর্দা ওয়াজিব নয়, তবে সতর্কতা উত্তম | | গায়র-মাহরাম হিন্দু নারী (প্রতিবেশী, সহপাঠী) | পূর্ণ পর্দা ওয়াজিব | | ফিতনার আশঙ্কা থাকলে | মুখমণ্ডলও ঢাকা ওয়াজিব |

তাই প্রশ্নের উত্তরে: হিন্দু মেয়েরা যদি আপনার নিকটাত্মীয় না হয়, তবে তাদের সামনে পূর্ণ পর্দা করতে হবে — মাথা, চুল, কান, গলা, বাহু, পা সব ঢেকে রাখতে হবে। শুধু মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জি খোলা রাখা যাবে (হানাফি মতে)। আর যদি ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তবে মুখমণ্ডলও ঢেকে রাখা ওয়াজিব।


সংক্ষিপ্ত উত্তর

১. মানতের রোজা: নির্দিষ্ট সংখ্যা না বললে এক রোজাই যথেষ্ট। "বেশি" বললে তিন রোজা ওয়াজিব। নির্দিষ্ট সংখ্যা বললে সেই সংখ্যাই আদায় করতে হবে।

২. হিন্দু মেয়েদের সামনে পর্দা: নিকটাত্মীয় হলে পর্দা ওয়াজিব নয়; গায়র-মাহরাম হলে পূর্ণ পর্দা ওয়াজিব — মাথা, চুল, কান, গলা, বাহু, পা ঢেকে রাখতে হবে।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.