বিয়ের আগে হারাম প্রেমের সম্পর্কের অতীত গোপন করে মিথ্যা বললে, সেই কারণে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া কি গুনাহ হবে?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6755
Questioner: MD Sakib Hasan Joy
Question Asked: 11 Oct 2026, 08:01 PM
Reviewed & Published: 13 Oct 2026, 01:36 AM
Views: 13
Tokens: 12,760
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

আমি একজন পুরুষ। আলহামদুলিল্লাহ, আমি নিজে কখনো কোনো হারাম প্রেমের সম্পর্কে জড়াইনি। বিয়ের ক্ষেত্রেও আমার একটি নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে—আমি এমন একজন নারীকে জীবনসঙ্গী হিসেবে চাই, যিনি বিয়ের আগে কখনো কোনো হারাম প্রেমের সম্পর্কে জড়াননি। এখানে আমি শুধু শারীরিক সম্পর্ক বোঝাচ্ছি না; বরং বিয়ের আগে অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে হারাম প্রেমের সম্পর্ক থাকাকেও বোঝাচ্ছি।

বিয়ের আলোচনার সময় আমি পাত্রীকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলাম যে, তাঁর অতীতে এমন কোনো হারাম সম্পর্ক থেকে থাকলে আমাকে বিস্তারিত কিছু বলতে হবে না; তিনি শুধু এই বিয়ের আলোচনা থেকে সরে যেতে পারেন। তিনি তার পরিবারকে বলতে পারেন ছেলেকে পছন্দ হয়নি বা এমনকিছু। কারন আমি এমন কাউকে বিয়ে করব না।

কিন্তু পাত্রী যদি আমার এই শর্ত জানার পরও সরাসরি বলেন যে, তাঁর অতীতে কোনো হারাম প্রেমের সম্পর্ক ছিল না, অথচ বাস্তবে তাঁর এমন সম্পর্ক ছিল, তাহলে আমি তাঁর কথায় বিশ্বাস করে বিয়ে করলেও পরবর্তীতে বিষয়টি নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত হলে নিজেকে প্রতারিত মনে করব। এমন পরিস্থিতিতে আমি তাঁর সঙ্গে দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যেতে চাই না এবং তাঁকে তালাক দিতে চাই। এটা আমি তাকে বিয়ের পূর্বেও জানিয়েছিলাম যদি কখনো এমন অতীত সামনে আসে আমি সংসার করব না আপনার সাথে। আমি বিয়েতে আর কোনো শর্ত রাখিনি এটা ছাড়া। একটাই শর্ত ছিল। বিয়ের আগে হারাম অনৈতিক সম্পর্ক থাকা যাবে না যেটা কেবলমাত্র একজন স্বামীর হক!

আমার প্রশ্ন হলো:

১. আমার শর্ত জানা সত্ত্বেও পাত্রী যদি সরাসরি মিথ্যা বলে আমাকে বিয়েতে রাজি করান, তাহলে ইসলামের দৃষ্টিতে এটি কি প্রতারণা ও গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে?

২. বিয়ের আগে হারাম প্রেমের সম্পর্কের কথা গোপন রাখা এবং এ বিষয়ে সরাসরি মিথ্যা বলা কি শরিয়তের দৃষ্টিতে একই বিষয়, নাকি দুটির বিধান আলাদা?

৩. বিয়ের পর নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত হলে যে স্ত্রী বিয়ের আগে এমন সম্পর্কে জড়িত ছিলেন এবং আমার কাছে সরাসরি মিথ্যা বলেছেন, সেই প্রতারণার কারণে তাঁকে তালাক দেওয়া কি আমার জন্য জায়েজ হবে? এমন তালাক দিলে কি আমি গুনাহগার হবো?

৪. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে মিথ্যা বলার যে হাদিস রয়েছে, সেটি কি বিয়ের আগে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মিথ্যা বলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?

অনুগ্রহ করে কুরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহি দলিলের আলোকে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবেন।

বিশেষভাবে উল্লেখ করছি, আমি জানতে চাইছি না যে তালাক দেওয়া আমার জন্য বাধ্যতামূলক কিনা। বরং আমার স্পষ্ট শর্ত জানা সত্ত্বেও স্ত্রী যদি অতীতের হারাম সম্পর্ক সম্পর্কে সরাসরি মিথ্যা বলে আমাকে বিয়ে করেন, তাহলে সেই প্রতারণার কারণে তাঁকে তালাক দেওয়া শরিয়তসম্মত হবে কিনা এবং এতে আমি গুনাহগার হবো কি না, সেটিই জানতে চাই।

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

Answer

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

উত্তর


১. শর্ত জানা সত্ত্বেও পাত্রী মিথ্যা বলে বিয়েতে রাজি করালে শরয়ী হুকুম (প্রতারণা ও গোনাহ কি না?):

  • শরয়ী সিদ্ধান্ত: পাত্রী যদি আপনার স্পষ্ট শর্ত জানা সত্ত্বেও সরাসরি মিথ্যা বলে আপনাকে বিয়েতে রাজি করান, তবে এটি শরীআতের দৃষ্টিতে স্পষ্ট ধোঁকাবাজি (تغرير/غش) এবং গোনাহে কবীরা (কবিরা গুনাহ) হিসেবে গণ্য হবে।

  • প্রমাণ ও ব্যাখ্যা: ইসলামে যে কোনো চুক্তিতে বা বিবাহের মতো পবিত্র বন্ধনে মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:

    «مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا»
    "যে ব্যক্তি আমাদের ধোঁকা বা প্রতারণা দিল, সে আমাদের সমাজ/উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়" [দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৬২]।

    তাছাড়া মিথ্যা বলা মুনাফিকীর আলামত ও অন্যতম প্রধান কবিরা গুনাহ [দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৬১–৩৬২; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৮শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৪৫]। সুতরাং পাত্রীর এরূপ আচরণ শরীআতের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ ও গোনাহ।


২. অতীত গোনাহ গোপন রাখা (ستر الذنب) এবং সরাসরি মিথ্যা বলার পার্থক্য:

  • শরয়ী সিদ্ধান্ত: ইসলামি শরীআতে নিজের অতীতের গোনাহ গোপন রাখা (ستر الذنب) এবং সরাসরি মিথ্যা বলা (الكذب الصريح) দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
  • বিস্তারিত ফিকহী ব্যাখ্যা:
    • গোনাহ গোপন রাখা (ستر الذنب): কেউ অতীতে কোনো গোনাহ করে থাকলে এবং পরবর্তীতে তওবা করে নিলে শরীআতের নির্দেশ হলো—সেটি অন্য কারো কাছে প্রকাশ না করে আল্লাহর চাদরে আবৃত রাখা [দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৬৮]। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষ যেন তার অপকর্ম আল্লাহর দরবারে গোপন রাখে। তাই আপনার শর্ত জানার পর পাত্রীর উচিত ছিল সরাসরি মিথ্যা না বলে সুকৌশলে এ বিয়ের প্রস্তাব থেকে সরে যাওয়া (যেমন: পারিবারিক অনীহার কথা বলা)।
    • সরাসরি মিথ্যা বলা (الكذب): কিন্তু প্রস্তাব থেকে সরে না গিয়ে আপনার প্রশ্নের জবাবে যখন তিনি সরাসরি মুখ ফুটে মিথ্যা বলেছেন ("আমার কোনো অতীত ছিল না"), তখন তিনি গোনাহ গোপন রাখার শরয়ী সীমারেখা অতিক্রম করে সরাসরি মিথ্যা ও প্রতারণার কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়েছেন।
    • অতএব, গোনাহ গোপন রাখা শরীআতে অনুমোদিত হলেও, বিবাহ চুক্তির উদ্দেশ্যে সরাসরি মিথ্যা বলা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও পৃথক গোনাহ।

৩. সত্য উদঘাটিত হওয়ার পর প্রতারণার কারণে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার বিধান:

  • শরয়ী সিদ্ধান্ত: বিবাহের পর যদি নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত হয় যে স্ত্রী পূর্বে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িত ছিলেন এবং আপনার কাছে সরাসরি মিথ্যা বলে বিয়ে করেছেন, তবে এই প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের কারণে তাঁকে তালাক দেওয়া আপনার জন্য সম্পূর্ণ জায়েয ও বৈধ। এতে আপনি বিন্দুমাত্র গোনাহগার হবেন না।
  • প্রমাণ ও ফিকহী কারণ: ১. তালাকের অধিকার: ইসলামি শরীআতে তালাক প্রদানের একক অধিকার ও ক্ষমতা একমাত্র স্বামীর হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে [দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৫৯; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১১০]। ২. ন্যায্য কারণে তালাক দেওয়া গোনাহ নয়: বিনা কারণে বা নিছক খামখেয়ালি করে তালাক দেওয়া অপছন্দনীয় হলেও, স্ত্রীর প্রতারণা, মিথ্যাচার, বিশ্বাসভঙ্গ বা দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক আস্থা ও ভালোবাসা বিনষ্ট হওয়ার মতো যুক্তিসঙ্গত কারণে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া সম্পূর্ণ শরিয়তসম্মত এবং এতে স্বামী গোনাহগার হয় না [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১২শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৩, ১৫৭; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১১০]। (দ্রষ্টব্য: হানাফী ফিকহ অনুযায়ী শর্ত ভঙ্গের কারণে বিবাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বা ফাসখ হয় না, বরং বিবাহ সঠীকভাবেই সম্পন্ন থাকে; তবে স্বামী চাইলে নিজের তালাকের অধিকার প্রয়োগ করে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করতে পারেন [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৪, ৩৮)।

৪. স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা রক্ষায় মিথ্যা বলার হাদীসের প্রয়োগ ক্ষেত্র:

  • শরয়ী সিদ্ধান্ত: হাদীস শরীফে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে যে মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত কথা বলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তা বিয়ের পূর্বে কোনো শর্তের জবাবে সরাসরি মিথ্যা বলার ক্ষেত্রে কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়।

  • প্রমাণ ও ব্যাখ্যা: হাদীসে যে মিথ্যা বা কৌশলী কথার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তা হলো—দাম্পত্য জীবন শুরু হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার পারস্পরিক মান-অভিমান দূর করা, সৌন্দর্য বা ভালোবাসার অতিরঞ্জিত প্রশংসা করা বা সংসার টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে।

    কিন্তু বিবাহের পূর্বে প্রস্তাব বা আকদের সময় অপর পক্ষকে ধোঁকা দিয়ে বা মিথ্যা বলে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য উক্ত হাদীস প্রযোজ্য নয়। বিবাহপূর্ব আলোচনায় এমন মিথ্যা বলা অকাট্যভাবে হারাম ও প্রতারণা (غش/تغرير) [দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৬২; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২৪শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২২৯]।


সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:

১. দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):

  • পৃষ্ঠা: ২৫৯ & ২৬৭: (অধ্যায়: ইসলামে তালাকের অবস্থান — তালাকের একক অধিকার স্বামীর হওয়া এবং বাস্তব প্রয়োজনে তালাক দেওয়ার শরয়ী অনুমোদন)।
  • পৃষ্ঠা: ৩৬১–৩৬২: (অধ্যায়: শরীআতের দৃষ্টিতে হ্যাকিং/প্রতারণা — মিথ্যা বলা ও ধোঁকাবাজি করার কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং হাদীস "من غشنا فليس منا")।
  • পৃষ্ঠা: ৩৬৮: (অধ্যায়: সতরের বিধান — অতীত অপরাধ বা গোনাহ গোপন রাখা সংক্রান্ত ফিকহী মূলনীতি)।

২. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী:

  • ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১০: (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক, ১ম পরিচ্ছেদ — তালাকের সংজ্ঞা, রুকন, শর্ত ও শরয়ী ফায়সালা)।
  • ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৪ & ৩৮: (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ, ৩য় পরিচ্ছেদ: খিয়্যার ও শর্ত — বিবাহে পাত্র-পাত্রীর শর্ত ভঙ্গ ও ফাসখ না হওয়া সংক্রান্ত মাসআলা)।

৩. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া:

  • ১২শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৩৩ & ১৫৭: (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক — যুক্তিসঙ্গত কারণে বা অপছন্দের কারণে স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদ/তালাক দেওয়ার বৈধতা)।
  • ১৮শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৪৫: (অধ্যায়: বাবুল কিজবি ওয়াব বুহতান — মিথ্যা ও প্রতারণার শরয়ী হুকুম)।
  • ২৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২২৯: (অধ্যায়: কিতাবুল কসব ওয়াল বিউ' — লেনদেন ও আকদে ধোঁকাবাজির নিষেধাজ্ঞা)।

আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.