আর্থিক নিরাপত্তার জন্য কাফির দেশে চাকরি করা কি জায়েজ?
Business and Job · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
ফিতনাপূর্ণ কাফির দেশে চাকরি ও ইলম অর্জনের মধ্যে অগ্রাধিকার: ইসলামের দিকনির্দেশনা
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চান—যদি হাদিস ও হিফজ করার মতো পর্যাপ্ত সম্পদ থাকে, তবে শুধু আর্থিক নিরাপত্তার জন্য ফিতনাপূর্ণ কাফির দেশে আরও সাত বছর চাকরি করা উচিত হবে, নাকি ইলম অর্জনে নিজেকে নিয়োজিত করা উচিত?
প্রথমেই বলে রাখি, এখানে চাকুরী জীবি ব্যাক্তি যদি মহিলা হয়,তার জন্য এভাবে কাফের রাষ্ট্রে চাকরি করা কোনোক্রমেই জায়েজ নেই।
এখানে চাকুরী জীবি ব্যাক্তি যদি পুরুষ হয়,তাহলে জবাবঃ-
মূল নীতি: ইলম অর্জন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের ইলম দেওয়া হয়েছে, তাদেরকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করবেন।" — (সূরা আল-মুজাদালাহ: ১১)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণে কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।" — (সহীহ মুসলিম: ২৬৯৯)
"আলিমের শ্রেষ্ঠত্ব আবিদের উপর এমন, যেমন পূর্ণিমার রাতে চাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব অন্যান্য তারকার উপর।" — (সুনান আবু দাউদ: ৩৬৪১, সহীহ)
দ্বিতীয় নীতি: কাফির দেশে অবস্থান ও ফিতনার আশঙ্কা
কাফির দেশে অবস্থানের বিধান
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
"কাফির দেশে অবস্থান করা জায়েজ নয়, যদি না সেখানে দ্বীন প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকে অথবা দাওয়াতের প্রয়োজন হয়। আর যদি ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তবে হিজরত করা ওয়াজিব।" — (মাজমুউল ফাতাওয়া: ১৮/২৮১)
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"নিশ্চয়ই যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছে, তাদের প্রতি ফেরেশতারা জান নেওয়ার সময় বলবে: তোমরা কোথায় ছিলে? তারা বলবে: আমরা পৃথিবীতে দুর্বল ছিলাম। ফেরেশতারা বলবে: আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা সেখানে হিজরত করতে?" — (সূরা আন-নিসা: ৯৭)
ফিতনার আশঙ্কা থাকলে করণীয়
শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন:
"যদি কাফির দেশে অবস্থানের কারণে দ্বীনের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে সেখানে অবস্থান করা হারাম। কারণ দ্বীন রক্ষা করা সম্পদ রক্ষার চেয়ে অগ্রাধিকারযোগ্য।" — (শারহুল মুমতি: ১৪/১৪২)
তৃতীয় নীতি: সম্পদ অর্জনের সীমা
প্রয়োজনীয় পরিমাণ সম্পদই যথেষ্ট
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"মানুষের জন্য এতটুকু সম্পদই যথেষ্ট, যা তার প্রয়োজন পূরণ করে।" — (সুনান তিরমিজি: ২৩৪৪, হাসান)
শাইখ ইবন বায (রহ.) বলেন:
"দুনিয়ার সম্পদ অর্জনে লিপ্ত হয়ে দ্বীনি ইলম অর্জন থেকে বিরত থাকা মুমিনের জন্য উচিত নয়। বরং প্রয়োজনীয় সম্পদ অর্জনের পর ইলম অর্জনে মনোযোগ দেওয়া উচিত।" — (মাজমুউ ফাতাওয়া ইবন বায: ৯/৩৪৫)
চতুর্থ নীতি: হাদিস ও হিফজের গুরুত্ব
হাদিস সংরক্ষণ করা ফরজে কিফায়া
ইমাম আল-আওযায়ী (রহ.) বলেন:
"ইলম সংরক্ষণ করা ফরজে কিফায়া। যদি কোনো সম্প্রদায় তা না করে, তবে সবাই গুনাহগার হবে।" — (শারফু আসহাবিল হাদিস: ৩৭)
হিফজুল কুরআনের মর্যাদা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি কুরআন পড়ে এবং তা মুখস্থ করে, সে জান্নাতে সম্মানিত ফেরেশতাদের সাথে থাকবে।" — (সহীহ বুখারি: ৪৯৩৭)
পঞ্চম নীতি: শাইখ আল-আলবানী (রহ.)-এর দিকনির্দেশনা
শাইখ আল-আলবানী (রহ.) বলেন:
"আমি মুসলিম ভাইদের উপদেশ দিচ্ছি—তোমরা কাফির দেশে সম্পদ অর্জনের পিছনে ছুটো না। বরং নিজ দেশে বা মুসলিম দেশে ইলম অর্জন কর। কারণ ইলম অর্জনই প্রকৃত সম্পদ।" — (সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর: ২৩৪)
ব্যবহারিক দিকনির্দেশনা
যদি আপনার অবস্থা নিম্নরূপ হয়:
| অবস্থা | বিধান | |--------|-------| | পর্যাপ্ত সম্পদ আছে, ফিতনার আশঙ্কা আছে | ইলম অর্জনে মনোযোগ দেওয়া ওয়াজিব | | সম্পদ নেই, ফিতনার আশঙ্কা নেই | প্রয়োজনীয় সম্পদ অর্জন করা জায়েজ | | সম্পদ আছে, ফিতনার আশঙ্কা নেই | ইলম অর্জন উত্তম | | সম্পদ নেই, ফিতনার আশঙ্কা আছে | হিজরত করা ওয়াজিব |
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর:
যেহেতু আপনার কাছে দাওরায়ে হাদিস ও হিফজ করার মতো পর্যাপ্ত টাকা আছে, এবং আপনি অনেক টাকার মালিক হতে চান না, বরং শুধু নিরাপদে জীবনযাপনের মতো আর্থিক স্থিতিশীলতা চান—তাহলে:
-
আরও সাত বছর ফিতনাপূর্ণ কাফির দেশে চাকরি করা আপনার জন্য উচিত নয়—বিশেষত যদি সেখানে দ্বীন পালনে বাধা বা ফিতনার আশঙ্কা থাকে।
-
ইলম অর্জনে নিজেকে নিয়োজিত করা আপনার জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার—কারণ আপনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে আপনার প্রয়োজনীয় সম্পদ রয়েছে।
-
আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন—তিনি রিযিকের ব্যবস্থা করবেন:
"আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন। এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" — (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
উপসংহার
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.)-এর একটি মূলনীতি স্মরণ রাখুন:
"দ্বীনি ইলম অর্জন করা দুনিয়ার সম্পদ অর্জনের চেয়ে উত্তম। কারণ ইলম হলো নবীদের উত্তরাধিকার, আর সম্পদ হলো ফিরআউন ও কারুনের উত্তরাধিকার।" — (মাজমুউল ফাতাওয়া: ১৩/২৪৫)
পরামর্শ: আপনার প্রয়োজনীয় আর্থিক নিরাপত্তা থাকলে, ফিতনাপূর্ণ কাফির দেশে আরও সাত বছর না থেকে ইলম অর্জনে নিজেকে নিয়োজিত করুন। এটি আপনার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে সর্বোত্তম বিনিয়োগ। আল্লাহ আপনার ইলম অর্জনের প্রচেষ্টাকে কবুল করুন। আমিন।