হাদিসের ব্যাখা নিয়ে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
উপরের এই হাদিস নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলাম
নিচে
১।উপরের এই হাদিসের মান কি সহীহ
২।আল্লাহ পাক হস্তেমৈথুন, প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারকারী এবং প্রতিবেশীকে এমন কষ্টদানকারী যে, যার কারণে সে তাদের কে অভিশাপ দেয়। আল্লাহ পাক অভিশাপ দিবেনই নাকি দয়া করতে পারেন দুনিয়া এবং আখিরাতে । আর আল্লাহ পাক অভিশাপ দিলে কি হালাল ধনসম্পদ পাবো না ইমান নিয়ে মরতে পারবো না। আর এগুলো কি কবিরা গুনাহ
Answer
উত্তর
১. উল্লেখিত হাদিসের মান (সনদ) কী?
আপনি যে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন, এটি বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে। তবে অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে, হাদিসটি সহীহ নয়; বরং যঈফ (দুর্বল) বা জয়িফ।
- ইমাম তাবারানী, ইমাম বায়হাকী, ইমাম ইবনে আবিদ্দুনিয়া প্রমুখ এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।
- হাদিসটির সনদে "ইবনে লাহীআহ" নামক একজন দুর্বল রাবী (বর্ণনাকারী) এবং "ঈসা ইবনে আবি ঈসা" নামক একজন অপরিচিত রাবী রয়েছে। এ কারণে হাদিসটি হাসান বা সহীহ পর্যায়ের নয়।
- তবে হাদিসটির অর্থগত কিছু অংশ কুরআন ও সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন, সমকামিতা,[^1] স্ত্রীর সাথে পায়ুপথে সঙ্গম[^2] এবং কোনো মহিলা ও তার কন্যাকে একসাথে বিবাহ করা[^3]—এগুলো কুরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ এবং কবিরা গুনাহ।
সারকথা: হাদিসটির সনদ দুর্বল, তবে এর অন্তর্ভুক্ত গুনাহগুলোর নিষিদ্ধতা কুরআন ও সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
২. আল্লাহ কি এসব গুনাহের জন্য অভিশাপ দেবেনই, নাকি দয়া করতে পারেন? আর এসব গুনাহ কি কবিরা?
ক. অভিশাপ ও দয়া প্রসঙ্গ:
- অভিশাপের অর্থ: আল্লাহর অভিশাপ অর্থ হলো তাঁর রহমত থেকে দূরে থাকা এবং লা'নত (অভিশাপ) পাওয়া। এটি ইঙ্গিত করে যে, এসব কাজ অত্যন্ত জঘন্য এবং এদের প্রতি আল্লাহর অসন্তোষ ও শাস্তির হুঁশিয়ারি বিদ্যমান।
- দয়া ও ক্ষমা: ইসলামের মূলনীতি হলো, যে কোনো গুনাহই তাওবা (অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসা) করলে আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, "নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না; কিন্তু এছাড়া অন্য যেকোনো গুনাহকে তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন।" (সূরা আন-নিসা: ৪৮)
- শর্ত: তাওবা করতে হবে আন্তরিকভাবে, গুনাহ ছেড়ে দিতে হবে, ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে এবং কারো হক নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে বা ক্ষমা চাইতে হবে।
- সুতরাং, আল্লাহ যেকোনো বান্দাকে, যেকোনো গুনাহ থেকে তাওবা করলে, ক্ষমা করতে পারেন। হাদিসে উল্লেখিত গুনাহগুলো কবিরা হলেও, তাওবার দরজা খোলা। তবে কেউ যদি তাওবা না করে মৃত্যুবরণ করে, তাহলে সে আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তিনি যদি চান, শাস্তি দেবেন অথবা তাঁর অনুগ্রহে ক্ষমা করবেন (যদি তার আমলনামায় ঈমান থাকে)।
খ. "অভিশাপ দিলে কি হালাল ধনসম্পদ পাবো না? ইমান নিয়ে মরতে পারবো না?"—এই ধারণা প্রসঙ্গে:
- সম্পদের সম্পর্ক: অভিশপ্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, তার হালাল উপার্জিত সম্পদ শেষ হয়ে যাবে বা সে সম্পদ ভোগ করতে পারবে না। এটি ভুল ধারণা। আল্লাহ দুনিয়ায় অনেক পাপী-অপরাধীকেও সম্পদ দান করেন। তবে পরকালে এর হিসাব দিতে হবে।
- ঈমানের সম্পর্ক: ব্যভিচার, হস্তমৈথুন ইত্যাদি কবিরা গুনাহ হলেও এগুলো কুফরী বা শিরক নয়। তাই এগুলো করলে ঈমান চলে যায় না, তবে ঈমানের পূর্ণতা এবং আল্লাহর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। হাদিসে এসেছে, "ব্যভিচারী ব্যভিচারের সময় মুমিন থাকে না।" (সহীহ বুখারী) অর্থাৎ গুনাহের সময় তার ঈমানের পূর্ণতা থাকে না, কিন্তু ঈমান সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয় না। তাই তাওবা করলে আবার পূর্ণ ঈমান ফিরে পাবে। আর কেউ যদি এগুলোকে হালাল মনে করে বা নিয়মিতভাবে বিনা তাওবায় করে মারা যায়, তাহলে তার শাস্তি কঠিন হবে, কিন্তু যদি তাওবা না করেও ঈমান নিয়ে মারা যায়, তাহলে সে জাহান্নামে কিছুদিন শাস্তি ভোগ করবে, শেষ পর্যন্ত মুক্তি পাবে (যদি আল্লাহ ক্ষমা না করেন)।
গ. এগুলো কি কবিরা গুনাহ?
হ্যাঁ, উপরোক্ত গুনাহগুলোর মধ্যে অধিকাংশই কবিরা গুনাহ (বৃহৎ পাপ)।
- সমকামিতা (লিওয়াত): ইমাম আবু হানীফা (রহ.) সহ অধিকাংশ ফকীহের মতে এটি কবিরা গুনাহ। এর শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড (হাদ্দ)।
- স্ত্রীর সাথে পায়ুপথে সঙ্গম: নবী (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে পায়ুপথে সঙ্গম করে, সে অভিশপ্ত।" (আবু দাউদ, তিরমিযী) এটি কবিরা গুনাহ।
- কোনো মহিলা ও তার কন্যাকে একসাথে বিবাহ: কুরআনে স্পষ্টভাবে নিষেধ করা হয়েছে (সূরা আন-নিসা: ২৩)। এটি কবিরা গুনাহ।
- প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার: যিনা (ব্যভিচার) নিজেই কবিরা গুনাহ, তাও আবার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে করা অত্যন্ত জঘন্য।
- জীবজন্তুর সাথে সঙ্গম: এটি একটি জঘন্য ও নিষিদ্ধ কাজ, অধিকাংশ ফকীহের মতে কবিরা গুনাহ এবং এর জন্য তাজির (শাস্তি) নির্ধারিত।
- হস্তমৈথুন (মাস্টারবেশন): অধিকাংশ হানাফি ফকীহের মতে এটি কবিরা গুনাহ নয়, বরং ছগিরা (ছোট) গুনাহ বা হারাম কাজ। তবে এটি নিষিদ্ধ এবং একে লা'নত (অভিশাপ) বলা হয়েছে, যা এর জঘন্যতা নির্দেশ করে। তবুও কবিরা হিসেবে গণ্য না হলেও এটি থেকে বিরত থাকা জরুরি।
- প্রতিবেশীকে এমন কষ্ট দেওয়া যার কারণে সে অভিশাপ দেয়: এটি নিঃসন্দেহে কবিরা গুনাহ। হাদিসে প্রতিবেশীর হকের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
উপসংহার ও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা
- হাদিসের মান: উল্লেখিত হাদিসটি সনদের দিক থেকে দুর্বল (যঈফ) হলেও এর বক্তব্য ভুল নয়; বরং কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে এসব কাজ নিষিদ্ধ ও জঘন্য।
- ক্ষমার ব্যাপারে: আল্লাহর রহমত অপরিসীম। যে কোনো গুনাহ থেকে বান্দা যদি আন্তরিকভাবে তাওবা করে, তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন। তাওবার পূর্বশর্ত হলো: (১) গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, (২) অনুতপ্ত হওয়া, (৩) ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা, এবং (৪) কারো হক নষ্ট করলে তা ফিরিয়ে দেওয়া।
- ঈমানের ব্যাপারে: এসব গুনাহ ঈমান নষ্ট করে না (যদি হালাল মনে না করে), কিন্তু ঈমানের পূর্ণতা ও বরকত নষ্ট করে এবং আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
- আমল করার নির্দেশ: আপনার করণীয় হলো, উপরোক্ত গুনাহগুলো থেকে দূরে থাকা। যদি কখনো এসব গুনাহ হয়ে যায়, তাহলে দেরি না করে লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া (ইস্তিগফার করা) এবং পুনরায় না করার প্রতিজ্ঞা করা।
[^1]: সমকামিতার নিষিদ্ধতা: সূরা আল-আরাফ (৭:৮০-৮১), সূরা আন-নামল (২৭:৫৪-৫৫) [^2]: স্ত্রীর সাথে পায়ুপথে সঙ্গম নিষিদ্ধ: সূরা আল-বাকারাহ (২:২২৩), হাদিস: আবু দাউদ, তিরমিযী [^3]: মহিলা ও তার কন্যাকে একত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ: সূরা আন-নিসা (৪:২৩)