বিয়ের জন্য ইস্তেখারা করার পর স্বপ্নে বিভিন্ন দৃশ্য দেখা—এটি কি পজিটিভ?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6662
Questioner: Umama Tahiya
Question Asked: 10 Oct 2026, 08:18 AM
Reviewed & Published: 10 Oct 2026, 09:41 AM
Views: 11
Tokens: 6,382
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বিয়ের জন্য ইস্তেখারা করেছি প্রথম দিন দেখলাম এক বৃদ্ধ লোক হুইল চেয়ারে বসে আছে একটা যুবক ছেলেকে বলতেছে আমার মেয়ে সর্বনাশ করলে কেন? কিভাবে পারলা করতে কিন্তু তাদের তিনজনের কাউকে আমি চিনি না। এরপর দিন স্বপ্ন দেখলাম কেউ আমাকে বলছে সুরা সেজদার ১৫ আয়াত থেকে অর্থ দেখতে। ঘুমানোর আগে আমি এভাবে ইস্তেখারা করতে চেয়েছিলাম যে ইস্তেখারার দোয়া করব তারপর কোরআন শরীফ খুলে দেখব কোন আয়াতটা আমার সামনে আসে। এরপর কিন্তু আপনি দেখলাম সমুদ্রের কাছাকাছি আছি আমি আম্মু এমন সময় জোয়ার আসতেছে আমি আম্মুকে বলতেছি এটা অনেক বড় ঢেউ তুমি বুঝতে পারছো না চলো এখান থেকে চলে যাই। এরপর অনেক দূর যায় যে দেখি ওইখানে ড্রেনগুলো জোয়ারের পানি দিয়ে ভরে গেছে এছাড়া কোনো ক্ষয়ক্ষতি দেখি নাই। তারপরের দিন স্বপ্নে দেখি আমি সূরা নাযিয়াতের 25 থেকে 27 অথবা আরো কিছু আয়াত স্পষ্ট বলে নাই তেলাওয়াত করতেছি এমন অবস্থায় ঘুম ভেঙ্গে গেছে। আজকে স্বপ্নে দেখি আমি পড়ছি "ফা ওয়া সাত্বনা বিহী জামআ" এইটা কি পজিটিভ ধরব ইস্তেখারা? নাকি আমার আরো চালিয়ে যাওয়া উচিত। এখন কি আমার আগানো উচিত?

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রশ্নটি মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। আপনি বিয়ের সিদ্ধান্তের জন্য ইস্তেখারা করেছেন এবং ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি স্বপ্ন দেখেছেন। বিষয়টি স্পষ্ট করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আলোচনা করছি।


১. ইস্তেখারার মূল পদ্ধতি ও স্বপ্নের ভূমিকা

ইস্তেখারা হলো আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর নির্দেশনা চাওয়া। রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদেরকে ইস্তেখারা শেখাতেন এবং বলতেন:

«إِذَا هَمَّ أَحَدُكُمْ بِالْأَمْرِ فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ مِنْ غَيْرِ الْفَرِيضَةِ ثُمَّ لِيَقُلْ...» — সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৬৬

অর্থাৎ, কেউ কোনো কাজের সংকল্প করলে সে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়বে এবং ইস্তেখারার দুআ পড়বে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: ইস্তেখারার মূল ভিত্তি হলো দুআ ও আল্লাহর উপর ভরসা। স্বপ্ন দেখা ইস্তেখারার বাধ্যতামূলক অংশ নয়, বরং এটি একটি সম্ভাব্য ইশারা মাত্র। ফকীহগণ স্পষ্ট বলেছেন—ইস্তেখারার ফলাফল কেবল স্বপ্নের উপর নির্ভরশীল নয়; বরং অন্তরের দিক পরিবর্তন, পারিপার্শ্বিক অবস্থার অনুকূলতা, এবং অভিজ্ঞদের পরামর্শও এর অন্তর্ভুক্ত।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন যে, ইস্তেখারার পর অন্তর যেদিকে ঝুঁকে যায় এবং কাজটি সহজ হয়ে যায়—সেটিই আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণের ইশারা হিসেবে বিবেচিত হয়।


২. আপনার স্বপ্নগুলোর বিশ্লেষণ

আপনি যে স্বপ্নগুলো দেখেছেন, সেগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

প্রথম স্বপ্ন: এক বৃদ্ধ হুইলচেয়ারে বসে এক যুবককে বলছেন—"আমার মেয়ে সর্বনাশ করলে কেন?" — এখানে আপনি তিনজনকেই চেনেন না। স্বপ্নে অপরিচিত ব্যক্তিদের দেখা সাধারণত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়; এটি মনের দুশ্চিন্তা বা শয়তানের কুমন্ত্রণাও হতে পারে।

দ্বিতীয় স্বপ্ন: কেউ বলছে সূরা সিজদার ১৫ নম্বর আয়াতের অর্থ দেখতে। সূরা সিজদার ১৫ নম্বর আয়াতটি সিজদা (সাজদাহ) সম্পর্কিত—এটি আল্লাহর আনুগত্য ও বিনয়ের আয়াত, বিয়ের সিদ্ধান্তের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।

তৃতীয় স্বপ্ন: সমুদ্রের কাছে জোয়ারের পানি, ড্রেন ভরে যাওয়া কিন্তু কোনো ক্ষতি না হওয়া — এতে ভয় ও নিরাপত্তার মিশ্রণ। এটিকে সরাসরি বিয়ের অনুকূল বা প্রতিকূল প্রমাণ বলা যায় না।

চতুর্থ স্বপ্ন: সূরা নাযিয়াতের ২৫-২৭ আয়াত তেলাওয়াত। এই আয়াতগুলো ফিরআউনের শাস্তি সম্পর্কিত—এটি বিয়ের সিদ্ধান্তের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।

আজকের স্বপ্ন: "فَأَوْسَعْنَا بِهِ جَمْعًا" — এই বাক্যটি সূরা নূহ বা সূরা শুআরার সাথে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে স্বপ্নে কুরআনের আয়াত দেখা বা পড়া—এটি সাধারণত কল্যাণের ইশারা হিসেবে বিবেচিত হয়, বিশেষত যখন তা ইবাদতের সাথে সম্পর্কিত।


৩. ফকীহদের মতামত

ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) «আল-মাবসূত»-এ এবং ইমাম সারাখসী (রহ.) উল্লেখ করেছেন—স্বপ্ন কোনো শরয়ী দলিল নয়। এটি কেবল একটি সম্ভাব্য ইশারা। হাদীসে এসেছে:

«الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللَّهِ، وَالرُّؤْيَا السَّوْءُ مِنَ الشَّيْطَانِ» — সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৯৮৪

অর্থাৎ, ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং খারাপ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে। কিন্তু স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিশ্চিত জ্ঞান নয়।

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ বলেছেন—ইস্তেখারার পর যদি অন্তর কোনো দিকে ঝুঁকে যায় এবং কাজটি সহজ হয়, তবে সেদিকেই অগ্রসর হওয়া উচিত। কেবল স্বপ্নের উপর নির্ভর করা উচিত নয়।


৪. আপনার করণীয়

আপনার প্রশ্ন—"এখন কি আমার আগানো উচিত?"

উত্তর হলো:

  1. স্বপ্নের উপর এককভাবে নির্ভর করবেন না। আপনার স্বপ্নগুলো মিশ্র ও অস্পষ্ট। এগুলোকে সরাসরি "পজিটিভ" বা "নেগেটিভ" বলা যায় না।

  2. ইস্তেখারার দুআ পুনরায় করুন এবং সাথে সাথে ইস্তিখারা (পরামর্শ) করুন—অভিজ্ঞ, দ্বীনদার ও বিশ্বস্ত লোকদের সাথে পরামর্শ করুন। বিশেষত আপনার অভিভাবক, দ্বীনদার আলেম বা বিশ্বস্ত আত্মীয়দের সাথে।

  3. ছেলের দ্বীন, চরিত্র, পরিবার, আর্থিক সামর্থ্য—এই বিষয়গুলো যাচাই করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

    «إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ» — সুনানে তিরমিযী, হাদীস ১০৮৪

  4. ইস্তেখারার ফলাফল সাধারণত তিনভাবে প্রকাশ পায়:

    • কাজটি সহজ হয়ে যায় → অগ্রসর হোন
    • কাজটি বাধাগ্রস্ত হয় বা অন্তর সায় দেয় না → বিরত থাকুন
    • স্পষ্ট কিছু না বুঝলে → পুনরায় ইস্তেখারা ও পরামর্শ
  5. স্বপ্নের ব্যাখ্যা কেবল অভিজ্ঞ মুফাসসিরে স্বপ্ন (যেমন ইবনে সীরীন রহ.-এর নীতি অনুসারে) জানতে পারেন। তবে সাধারণভাবে—কুরআন তেলাওয়াতের স্বপ্ন কল্যাণের ইশারা।


৫. সারসংক্ষেপ

  • আপনার স্বপ্নগুলো সরাসরি বিয়ের অনুকূল বা প্রতিকূল প্রমাণ নয়।
  • ইস্তেখারার মূল ভিত্তি দুআ, পরামর্শ ও অন্তরের প্রবণতা।
  • "فَأَوْسَعْنَا بِهِ جَمْعًا" জাতীয় কুরআনীয় বাক্য স্বপ্নে দেখা সাধারণত কল্যাণের ইশারা।
  • তবে কেবল স্বপ্নের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেবেন না।
  • দ্বীনদার ও বিশ্বস্ত লোকদের সাথে পরামর্শ করে, ছেলের দ্বীন-চরিত্র যাচাই করে, পুনরায় ইস্তেখারা করে অগ্রসর হোন।
  • যদি অন্তর সায় দেয় এবং কোনো বাধা না থাকে—তবে বিয়ের জন্য অগ্রসর হওয়া উচিত।
  • যদি অন্তর সায় না দেয় বা স্পষ্ট বাধা দেখা দেয়—তবে বিরত থাকুন।

আল্লাহ তা'আলা আপনার জন্য যা কল্যাণকর, তা-ই দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.