তালাকের নিয়ত ছাড়া শর্তযুক্ত কসম উচ্চারণ করলে কি তালাক হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
২য় ঘটনা : এই তালাকের বিষয়টি নিয়ে বারবার প্রশ্ন করছি, সে বারবার বোঝচ্ছে এই রখম কিছু নিয়তেও ছিলো না, তখন আমি উনাকে বলি আমি বিভিন্ন হুজুরের ওয়াজে শুনেছি এই রখন শব্দ বললে ১ তালাক হয়ে যায়, প্রতিউত্তরে সে বলে বলছে তোমাকে, এক তালাক হতে যায় আর ২ তালাক হয়ে যায়,, অথবা সে বলেছিলো এই বলছে তোমাকে এই রখম করলে তোমার সাথে ১ তালাক হয়ে যায়, বা ২ তালাক হয়ে যায়, আমার এবং উনার দুজনের ঠিকভাবে মনে নেই কথাগুলো ঠিক কিভাবে বলা হয়েছিলো,
কিন্তু আবারো কসম করে বলেছে সে কোনো নিয়ত বা উদ্দেশ্য নিয়ে ঐ সময় উচ্চারণ করে নি, শুধুমাত্র বোঝানোর জন্য বলেছে,
২য় ঘটনা আমি একজন হাফেজ এবং মাদ্রাসার শিক্ষক কে বলেছিলাম তারা বলেছেন তালাক হয় নি, কিন্তু তারপরও আমি কোনোভাবেই শান্তি পাচ্ছি, ঘুম, খাবার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে,
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। আপনার মানসিক অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা আমরা বুঝতে পারছি। আল্লাহ তাআলা আপনার অন্তরকে প্রশান্তি দান করুন এবং বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে সাহায্য করুন। আমিন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর: আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথম ঘটনায় কোনো তালাক পতিত হয়নি। কারণ আপনার স্বামী কসম করে বলেছেন যে তিনি তালাক দেওয়ার নিয়ত বা উদ্দেশ্য ছাড়াই শুধু বোঝানোর জন্য কথাটি বলেছিলেন। ফিকহের মূলনীতি হলো—তালাকের জন্য ইচ্ছা ও নিয়ত শর্ত। নিয়ত ছাড়া শুধু শর্তযুক্ত বাক্য উচ্চারণ করলে তালাক পতিত হয় না।
দ্বিতীয় ঘটনায় আপনার স্বামী যখন বলেছেন "তোমাকে এক তালাক হয়ে যায় বা দুই তালাক হয়ে যায়"—এটি মূলত তিনি আপনাকে বোঝাচ্ছিলেন যে আপনি যা বলছেন (অর্থাৎ এই ধরনের শব্দে তালাক হয়ে যায়) সেটি যদি সত্য হয়, তাহলে এক বা দুই তালাক হয়ে যাবে। তিনি নিজে তালাক দেওয়ার নিয়তে বলেননি; বরং আপনার কথার প্রতিউত্তরে বোঝানোর জন্য বলেছেন। তাই এতেও তালাক পতিত হয়নি।
তবে সতর্কতা: ভবিষ্যতে তালাকের শব্দ বা শর্তযুক্ত কসম (যেমন "যদি আমি মিথ্যা বলি তবে আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যাক") এ ধরনের কথা বলা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি। কারণ অনেক সময় নিয়ত ছাড়াও কিছু শব্দে তালাক পতিত হয়ে যায় (যেমন স্পষ্ট তালাকের শব্দ)। আর শর্তযুক্ত তালাকের ক্ষেত্রে শর্ত পূরণ হলে নিয়ত ছাড়াও তালাক পতিত হয়। তাই এ বিষয়ে চরম সতর্কতা অবলম্বন করা কর্তব্য।
বিস্তারিত ফিকহি বিশ্লেষণ:
১. তালাকের মূলনীতি: হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য দুটি বিষয় আবশ্যক:
- (ক) তালাকের স্পষ্ট বা ইঙ্গিতবাহী শব্দ উচ্চারণ করা।
- (খ) তালাক দেওয়ার ইচ্ছা ও নিয়ত থাকা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তালাক দুইবার।" (সূরা বাকারা: ২২৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের অন্তরের কুমন্ত্রণা, ভুল-ভ্রান্তি ও বিস্মৃতিজনিত বিষয়সমূহ ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা বলে বা আমল করে।" (সহিহ বুখারি: ৫২৬৯, সহিহ মুসলিম: ১২৭)
২. নিয়ত ছাড়া তালাক: হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) বলেন:
"তালাকের ক্ষেত্রে নিয়ত শর্ত। কেননা তালাক একটি ইচ্ছাকৃত কর্ম। নিয়ত ছাড়া তা সংঘটিত হয় না।" (রাদ্দুল মুহতার: ৩/২৩২)
তবে স্পষ্ট তালাকের শব্দ (যেমন "তুমি তালাক" বা "তোমাকে তালাক দিলাম") বললে নিয়ত ছাড়াও তালাক পতিত হয়। কিন্তু শর্তযুক্ত বা কসমের বাক্য (যেমন "যদি আমি মিথ্যা বলি তবে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাক") ক্ষেত্রে শর্ত পূরণ হলে তালাক পতিত হয়, নিয়ত ছাড়াও। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে শর্তটি (অর্থাৎ আপনি ধোকা বা প্রতারণা করেছেন কি না) প্রমাণিত নয়, বরং স্বামী নিজেই বলেছেন তিনি ধোকা বা প্রতারণা করেননি। তাই শর্ত পূরণ হয়নি, ফলে তালাক পতিত হয়নি।
৩. কসমের বাক্য: আপনার স্বামী বলেছেন: "আল্লাহর কসম আমি যদি ধোকা বা প্রতারণা করে থাকি তাহলে যেন আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।" এটি একটি শর্তযুক্ত তালাক (তালাক মুআল্লাক)। হানাফি ফিকহে শর্তযুক্ত তালাকের ক্ষেত্রে শর্ত পূরণ হলে তালাক পতিত হয়। কিন্তু এখানে শর্ত হলো—তিনি ধোকা বা প্রতারণা করেছেন। যেহেতু তিনি নিজেই বলেছেন তিনি ধোকা বা প্রতারণা করেননি, এবং আপনি তো বরং সন্দেহ করছেন মাত্র—তাই শর্ত পূরণ হয়নি। ফলে তালাক পতিত হয়নি।
৪. দ্বিতীয় ঘটনা: আপনার স্বামী যখন বলেছেন "তোমাকে এক তালাক হয়ে যায় বা দুই তালাক হয়ে যায়"—এটি তিনি আপনার কথার প্রতিউত্তরে বলেছেন, অর্থাৎ আপনি বলেছিলেন "এই রকম শব্দ বললে এক তালাক হয়ে যায়", তখন তিনি বলেছেন "তোমাকে এক তালাক হয়ে যায় বা দুই তালাক হয়ে যায়"। এটি তালাক দেওয়ার বাক্য নয়; বরং আপনার কথার পুনরুক্তি বা বোঝানো। তাই এতে তালাক পতিত হয়নি।
৫. হাফেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকের বক্তব্য: আপনি বলেছেন, একজন হাফেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক বলেছেন তালাক হয়নি। তাদের বক্তব্য ফিকহের মূলনীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কারণ নিয়ত ছাড়া এবং শর্ত পূরণ না হওয়ায় তালাক পতিত হয়নি।
৬. আপনার মানসিক অবস্থা: আপনার ঘুম, খাবার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে—এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইসলামে এভাবে নিজেকে কষ্ট দেওয়া ঠিক নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আল্লাহ কারো উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)
আপনি নিশ্চিত থাকুন, আপনার তালাক হয়নি। আপনার স্বামীর সাথে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনযাপন করুন। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। আর আপনার স্বামীকে বলুন, তিনি যেন কসম করে এ ধরনের শর্তযুক্ত তালাকের বাক্য না বলেন।
পরামর্শ:
- আপনার স্বামীকে বলুন, তিনি যেন ভবিষ্যতে "তালাক" শব্দ বা শর্তযুক্ত কসম (যেমন "যদি আমি মিথ্যা বলি তবে তালাক") না বলেন।
- আপনি নিজেও রাগের সময় এ ধরনের প্রসঙ্গ তুলবেন না।
- উভয়ে মিলে একজন বিশ্বস্ত মুফতি বা দারুল ইফতার সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন, যাতে আপনার অন্তরের প্রশান্তি আসে।
- আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দোয়া করুন।
দোয়া: اللَّهُمَّ أَصْلِحْ بَيْنَنَا وَأَلِّفْ بَيْنَ قُلُوبِنَا وَاهْدِنَا سُبُلَ السَّلَامِ "হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে সংশোধন করে দাও, আমাদের অন্তরকে মিলিয়ে দাও এবং শান্তির পথ দেখাও।"
আল্লাহ তাআলা আপনার সমস্যা সমাধান করুন এবং আপনার অন্তরকে প্রশান্তি দান করুন। আমিন।