ঈমান চলে গেছে কিনা কিভাবে বুঝব?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
ঈমান আছে নাকি চলে গেছে যদি কারোর এমন সন্দেহ থাকে-
১) সে যদি পুনরায় ঈমান নবায়ন করে নেয় তাহলে কি তার আগের সব ভালো আমল চলে যাবে?
২) আগের সব আমল চলে যাবে কিনা এই ভয়ে ঈমান নবায়ন করছে না, আবার শান্তি ও পাচ্ছে না। তার কিছু নিয়ত করা নফল নামাজ বাকি আছে। এখন সে কি যে কয় রাকাত বাকী সেই নামাজ পড়বে? নাকি পুরোটাই আবার পড়বে?
৩) এমন অবস্থায় ঈমান নবায়ন করলে, বিবাহিত হলে কি আবার বিয়ে পড়িয়ে নিতে হবে?
Answer
প্রশ্নোত্তর: ঈমান নবায়ন, আমল বাতিল ও বিবাহ পুনরায় সংঘটিত হওয়ার বিধান
উত্তর (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)
ভূমিকা: কুফরি ও ঈমান নবায়ন প্রসঙ্গে
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থা হলো—ব্যক্তি মনে মনে কুফরিমূলক কথা বলেছে, পরে একা একা মুখেও বলে ফেলেছে, কিন্তু তার উদ্দেশ্য কুফরি করা ছিল না; বরং সে তা বলতে চায়নি। এরপর সে আল্লাহর কাছে তাওবা করেছে এবং সংশোধন করতে চেয়েছে।
এক্ষেত্রে ফিকহি বিধান নিম্নরূপ:
১. কুফরি মূলক কথা মুখে উচ্চারণ করলে ঈমান চলে যায় কি?
হ্যাঁ। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
«إِذَا تَكَلَّمَ بِكَلِمَةِ الْكُفْرِ يَخْرُجُ مِنَ الْإِيمَانِ، وَلَا يُعْذَرُ بِعَدَمِ قَصْدِ الْكُفْرِ إِذَا كَانَ عَالِمًا بِمَعْنَاهَا»
অর্থ: "যখন কেউ কুফরির বাক্য উচ্চারণ করে, সে ঈমান থেকে বেরিয়ে যায়; যদি সে বাক্যের অর্থ জানে, তবে কুফরি না করার নিয়ত তাকে মুক্তি দেবে না।"
(রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল ঈমান, খণ্ড ৪, পৃ. ২২৪)
তবে যদি সে অজ্ঞতাবশত বা ভুলবশত বলে ফেলে এবং তার অর্থ না জানে, তবে ভিন্ন বিধান। কিন্তু প্রশ্নে বলা হয়েছে সে "ঠিক করে আবার আল্লাহকে বললো" — অর্থাৎ সে বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন ছিল।
সুতরাং: মুখে কুফরিমূলক কথা উচ্চারণ করলে ঈমান চলে যায় এবং তাওবা ও ঈমান নবায়ন করা ফরজ।
১) ঈমান নবায়ন করলে আগের সব ভালো আমল চলে যাবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, কুফরি করার কারণে আগের সমস্ত নেক আমল বরবাদ হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
«وَمَن يَرْتَدِدْ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولَٰئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ وَأُولَٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ»
অর্থ: "তোমাদের মধ্যে যে নিজের দ্বীন থেকে ফিরে যায় এবং কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তাদের সমস্ত আমল দুনিয়া ও আখিরাতে বরবাদ হয়ে যায়।"
(সূরা আল-বাকারা: ২১৭)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
«إِذَا ارْتَدَّ الْعَبْدُ ثُمَّ أَسْلَمَ فَإِنَّ أَعْمَالَهُ الصَّالِحَةَ الَّتِي عَمِلَهَا قَبْلَ الرِّدَّةِ تَبْطُلُ»
অর্থ: "বান্দা মুরতাদ হলে, অতঃপর ইসলাম গ্রহণ করলে, তার পূর্বের নেক আমলসমূহ বাতিল হয়ে যায়।"
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ২২৫)
কিন্তু: ঈমান নবায়ন করার পর যদি সে পুনরায় আমল করে, তবে নতুন করে সওয়াব লেখা হবে। পূর্বের আমল ফিরে আসবে না, তবে নতুন আমলের মাধ্যমে সে আবার সওয়াব অর্জন করতে পারবে।
গুরুত্বপূর্ণ: ঈমান নবায়ন করা ওয়াজিব। আমল বরবাদ হওয়ার ভয় দেখিয়ে ঈমান নবায়ন না করা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ ঈমান ছাড়া কোনো আমলই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ঈমান না থাকলে জান্নাতও হারাবে, যা সমস্ত আমল হারানোর চেয়েও ভয়াবহ।
২) নফল নামাজের কাজা প্রসঙ্গে
প্রশ্ন: তার কিছু নিয়ত করা নফল নামাজ বাকি আছে। সে কি শুধু বাকি রাকাতগুলো পড়বে, নাকি পুরোটা আবার পড়বে?
উত্তর:
ক. নফল নামাজের বিধান:
নফল নামাজ ওয়াজিব নয়; বরং এটি ঐচ্ছিক ইবাদত। তবে যদি কেউ নফল নামাজ শুরু করে (তাকবিরে তাহরিমা বাঁধে), তবে তা পূর্ণ করা ওয়াজিব হয়ে যায়। একে বলে "নফল মুআক্কাদাহ" বা "নফল যা শুরু করা হয়েছে"।
ইমাম হাসকাফি (রহ.) বলেন:
«وَلَوْ شَرَعَ فِي نَفْلٍ لَزِمَهُ إِتْمَامُهُ»
অর্থ: "যদি কেউ নফল নামাজ শুরু করে, তবে তা সম্পূর্ণ করা তার জন্য আবশ্যক হয়ে যায়।"
(আদ-দুররুল মুখতার, খণ্ড ২, পৃ. ২৫)
খ. কুফরি করার কারণে কি নফল নামাজ বাতিল হয়?
হ্যাঁ, কুফরি করলে সমস্ত ইবাদত বাতিল হয়ে যায়, এমনকি অসম্পূর্ণ নফল নামাজও। সুতরাং ঈমান নবায়নের পর:
- যে নফল নামাজ শুরু করেছিল কিন্তু শেষ করেনি — সেটি বাতিল হয়ে গেছে। এখন তাকে পুরো নামাজটি আবার শুরু থেকে পড়তে হবে (শুধু বাকি রাকাত নয়)।
- যে নফল নামাজ সম্পূর্ণ করেছিল — সেটিও বাতিল হয়ে গেছে; তবে তা পুনরায় পড়া ওয়াজিব নয়, কারণ নফল মূলত ঐচ্ছিক। তবে উত্তম হলো পুনরায় পড়ে নেওয়া।
মূল কথা: কুফরি করলে অসম্পূর্ণ নফল নামাজও বাতিল হয়ে যায়; তাই পুরো নামাজটি নতুন করে পড়তে হবে, শুধু বাকি রাকাত পড়লে হবে না।
৩) ঈমান নবায়ন করলে বিবাহ পুনরায় সংঘটিত করতে হবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, বিবাহ পুনরায় সংঘটিত করতে হবে।
কারণ:
কুফরি করার কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার বিবাহ বন্ধন ভেঙে যায়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
«إِذَا ارْتَدَّ أَحَدُ الزَّوْجَيْنِ انْفَسَخَ النِّكَاحُ بَيْنَهُمَا»
অর্থ: "স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কেউ মুরতাদ হলে তাদের মধ্যকার বিবাহ বন্ধন ভেঙে যায়।"
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ১৯০; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ২, পৃ. ২৮০)
বিধান:
- যদি স্বামী কুফরি করে, তবে বিবাহ বন্ধন ভেঙে যায়।
- যদি স্ত্রী কুফরি করে, তবে বিবাহ বন্ধন ভেঙে যায়।
- ঈমান নবায়নের পর নতুন করে বিবাহ করতে হবে (নতুন মোহর, নতুন ইজাব-কবুল, নতুন সাক্ষী)।
- ইদ্দত পালন করতে হবে কি? — যদি কুফরির কারণে বিবাহ ভেঙে যায় এবং স্ত্রী ঈমান নবায়ন করে, তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে ইদ্দত পালন করতে হবে না; তবে ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে ইদ্দত পালন করতে হবে। সতর্কতামূলকভাবে ইদ্দত পালন করা উত্তম।
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ১৯১)
তবে: যদি কুফরি মুখে উচ্চারণ না করে শুধু মনে মনে হয়, তবে বিবাহ ভেঙে যায় না। কিন্তু প্রশ্নে বলা হয়েছে সে মুখেও বলে ফেলেছে, তাই বিবাহ ভেঙে গেছে।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. ঈমান নবায়ন করলে আগের আমল চলে যাবে? | হ্যাঁ, কুফরির কারণে পূর্বের সমস্ত নেক আমল বাতিল হয়ে যায়। তবে ঈমান নবায়ন করা ওয়াজিব; আমল বরবাদ হওয়ার ভয়ে ঈমান নবায়ন না করা জায়েজ নয়। | | ২. অসম্পূর্ণ নফল নামাজ? | পুরো নামাজ নতুন করে পড়তে হবে; শুধু বাকি রাকাত পড়লে হবে না। | | ৩. বিবাহ পুনরায় করতে হবে? | হ্যাঁ, নতুন করে বিবাহ সংঘটিত করতে হবে। |
প্রয়োজনীয় দোয়া ও আমল
ঈমান নবায়ন করার জন্য নিম্নলিখিত দোয়া পড়া উত্তম:
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ شَيْئًا وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ»
অর্থ: "হে আল্লাহ! আমি জেনে-বুঝে আপনার সাথে কাউকে শরিক করা থেকে আপনার আশ্রয় চাই, এবং না জেনে যা করেছি তার জন্য ক্ষমা চাই।"
এছাড়া কালিমা শাহাদাত পড়ে ঈমান নবায়ন করবে এবং তাওবার নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে।
সতর্কতা
ঈমানের বিষয়টি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। কোনো সন্দেহ হলে দ্রুত ঈমান নবায়ন করে নেওয়া উচিত। শয়তান মানুষকে "আমল বরবাদ হয়ে যাবে" বলে ভয় দেখায়, যাতে সে ঈমান নবায়ন না করে এবং কুফরির উপরই থাকে। এটি শয়তানের ধোঁকা। ঈমান নবায়ন করলে আখিরাত রক্ষা পাবে, যা সমস্ত আমলের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রেফারেন্স
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ৪, পৃ. ২২৪-২২৫; খণ্ড ৩, পৃ. ১৯০-১৯১
- ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ২, পৃ. ২৮০
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৫-১৩৭
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৫০
- বাহিশতী জেওর, ঈমান ও কুফরির বিধান
- মা'আরিফুল কুরআন, সূরা আল-বাকারা: ২১৭-এর তাফসীর