স্বামী নামাজ না পড়লে, পরকীয়া করলে, যৌনরোগ ছড়ালে বা মানসিক জুলুম করলে স্ত্রী তালাক চাইতে পারবে কি?

Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 6612
Questioner: Jarin Tasnim Asma
Question Asked: 09 Oct 2026, 02:39 PM
Reviewed & Published: 09 Oct 2026, 03:42 PM
Views: 33
Tokens: 7,245
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার ২ টা বাচ্চা আছে। স্বামী নিয়মিত নামাজ পড়ে না, সিগারেট খায়। ২ বছর আগে নেপাল গিয়ে পরকীয়া ও খারাপ মেয়েদের সাথে সম্পর্ক করার কারনে তার যৌনবাহিত রোগ সিফিলিস হয়। তার থেকে আমার এ রোগ হয় আমি চিকিৎসা নেওয়ায় একবার সুস্থ হই। সে পরে বলে আর সমস্যা হবে না। তারপর আবার শারীরিক সম্পর্কের কারনে আমি আবার অসুস্থ হই এবং পেনিসিলিন ইনজেকশন নেই তিন সপ্তাহ তারপর সুস্থ হই। আমার আগে সে চিকিৎসা শুরু করে। সে সুস্থ হইছে কিনা রিপোর্ট কি আসছে আমাকে জানাচ্ছে না। আমার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করতে চাইলে আমি রিপোর্ট দেখানো ছাড়া সম্পর্ক করতে নিষেধ করি। সে এতে খুব রাগান্বিত হয় এবং বাসায় আসা বন্ধ করেছে ঘরভাড়া দেয়া বন্ধ করেছে। বাজার মাঝে মাঝে করে। তার বৈশিষ্ট নার্সাসিস্টিক মানুষের মত অনেক অহংকারী + এমন সব বৈশিষ্ট্য তার সাথে মিলে। সে আমার সাথে প্রতিশোধ পরায়ন সে ২য় বিয়ে করেছে আমাদের দুজন কে এক বাসায় রাখতে চায় আমাকে মানসিক ভাবে কষ্ট দেয়ার জন্য। আমি শুরু থেকেই তার মানসিক জুলুম সহ্য করতেছি। আমি খুব ক্লান্ত আর পারছি না। তার সাথে থাকলে সে আমাকে নানা ভাবে দোষ দিয়ে, তুলনা করে, অপমান করে, ছোট করে মানসিকভাবে কষ্ট দিচ্ছে, দিবে। আমার প্রশ্ন আমি খোলা তালাক চাইলে কি আল্লাহ আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হবে? আল্লাহর ভয়ে এবং বাচ্চাদের ভবিষ্যত চিন্তা করে তালাক চাইতে পারছি না।

Answer

খোলা তালাক চাওয়া সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার অবস্থায় খোলা তালাক চাওয়া জায়েয, বরং কখনো কখনো কর্তব্য। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে এ জন্য অসন্তুষ্ট হবেন না — বরং যে স্বামী আপনার দ্বীন, জান, ইজ্জত ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে, তার সাথে থাকার চেয়ে পৃথক হওয়া আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শরীয়তসম্মত পন্থা অবলম্বন করা জরুরি।


১. তালাক মূলত অপছন্দনীয়, কিন্তু নিষিদ্ধ নয়

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللَّهِ الطَّلَاقُ» "আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল বস্তু হলো তালাক।" — সুনানে আবু দাউদ ২১৭৮ (শায়খ আল-আলবানী সহীহ বলেছেন, ইরওয়াউল গালীল ২০৪০)

এখানে লক্ষণীয়: হাদীসে তালাককে "হালাল" বলা হয়েছে — অর্থাৎ এটি নিষিদ্ধ বা গুনাহ নয়, বরং অপছন্দনীয়। কিন্তু যখন স্বামীর জুলুম, দ্বীনদারীর অভাব, বা ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তখন এই অপছন্দনীয়তা দূর হয়ে যায় এবং তালাক জায়েয হয়ে যায়।


২. ক্ষতিকর স্বামীর সাথে থাকা বাধ্যতামূলক নয়

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَلَا تُلْقُوا بِأَنْفُسِكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ "আর তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না।" — সূরা আল-বাকারা ২:১৯৫

আরও বলেন:

وَلَا تَظْلِمُوا وَلَا تُظْلَمُونَ — অর্থ: "তোমরা জুলুম করো না, আর তোমাদের উপরও জুলুম করা হবে না।" — সূরা আল-বাকারা ২:২৭৯

শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:

"যখন স্বামীর অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য স্ত্রীর তালাক চাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না, তখন তা জায়েয। বরং কখনো তা ওয়াজিব হয়ে যায় যদি স্বামীর সাথে থাকা দ্বীন বা জানের ক্ষতির কারণ হয়।" — মাজমূউল ফাতাওয়া (৩২/২৭৭)


৩. আপনার স্বামীর মধ্যে যা যা রয়েছে — শরীয়তের দৃষ্টিতে

| বিষয় | শরীয়তের বিধান | |---|---| | নামাজ না পড়া | কাবীরা গুনাহ; ফাসিক; দ্বীনদারীর মৌলিক শর্ত পূরণ হয় না | | পরকীয়া/ব্যভিচার | কুরআনে স্পষ্ট হারাম (সূরা আল-ইসরা ১৭:৩২) | | যৌনরোগ ছড়ানো | জানের উপর জুলুম — আল্লাহর কাছে জবাবদিহি হবে | | স্ত্রীকে মানসিক জুলুম | কুরআনে নিষিদ্ধ (সূরা আন-নিসা ৪:১৯) | | দ্বিতীয় বিয়ে করে এক ঘরে রাখার হুমকি | স্পষ্ট জুলুম ও অপমান | | রিপোর্ট গোপন রাখা | প্রতারণা ও ক্ষতিসাধন |

আল্লাহ বলেন:

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "আর তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — সূরা আন-নিসা ৪:১৯

রাসূল ﷺ বলেছেন:

«لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ» "ক্ষতি করা যাবে না, ক্ষতিগ্রস্তও করা যাবে না।" — সুনানে ইবনে মাজাহ ২৩৪১ (আলবানী সহীহ বলেছেন)


৪. খোলা (খুলা') তালাকের বিধান

খুলা' হলো স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর কাছে কিছু (সাধারণত মোহর ফেরত) দিয়ে বিচ্ছেদ চাওয়া। এটি শরীয়তে বৈধ।

সাহাবী সাবিত ইবনে কায়েস (রা.)-এর স্ত্রী রাসূল ﷺ-এর কাছে এসে বললেন:

"হে আল্লাহর রাসূল! আমি তার দ্বীন বা চরিত্রে কোনো দোষ দেখি না, কিন্তু আমি ইসলামে কুফরি করতে ভয় পাই (অর্থাৎ তার সাথে থাকতে পারি না)।" রাসূল ﷺ তাকে বললেন: "তুমি কি তার বাগানটি ফেরত দেবে?" সে বলল: "হ্যাঁ।" রাসূল ﷺ সাবিতকে বললেন: "বাগানটি নিয়ে তাকে তালাক দাও।" — সহীহ বুখারী ৫২৭৩

শায়খ ইবনু উসাইমীন (রহ.) বলেন:

"যদি স্ত্রী স্বামীর সাথে থাকতে না পারে — দ্বীনদারীর অভাব, চরিত্রের দোষ, বা জুলুমের কারণে — তাহলে খুলা' চাওয়া জায়েয। আর যদি স্বামী তার ওপর জুলুম করে, তাহলে মোহর ফেরত না দিয়েও তালাক চাওয়ার অধিকার তার আছে।" — শারহুল মুমতি' (১৩/৩০০)


৫. আল্লাহ কি অসন্তুষ্ট হবেন?

না — ইনশাআল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন না। কারণ:

  1. আল্লাহ জালিমকে পছন্দ করেন না (সূরা আশ-শূরা ৪২:৪০-৪২)। আপনার স্বামী জালিম।
  2. আল্লাহ আপনার জান ও ইজ্জত রক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। নিজেকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করা হারাম।
  3. আপনার সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব: অসুস্থ, জালিম, দ্বীনহীন পরিবেশে সন্তান লালন-পালন তাদের জন্যও ক্ষতিকর। আল্লাহ বলেন: "নিজেদের ও তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো" (সূরা আত-তাহরীম ৬৬:৬)।
  4. আল্লাহর ভয় মানে জুলুম সহ্য করা নয় — বরং আল্লাহর সীমা রক্ষা করা। আপনার স্বামী আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করছে।

৬. করণীয় — ধাপে ধাপে

ধাপ ১: সালাতুল ইস্তিখারা ও দুআ

আল্লাহর কাছে সাহায্য চান, সিদ্ধান্তে বরকত কামনা করুন।

ধাপ ২: আহলে ইলমের সাথে পরামর্শ

স্থানীয় বিশ্বস্ত আলিম/মুফতির সাথে সরাসরি বসে বিস্তারিত আলোচনা করুন।

ধাপ ৩: শর্তসহ শেষ চেষ্টা

যদি সম্ভব হয়, পরিবারের সম্মানিত কেউ বা আলিমের মাধ্যমে তাকে জানান:

  • নামাজ শুরু করতে হবে
  • চিকিৎসার রিপোর্ট দেখাতে হবে
  • দ্বিতীয় স্ত্রীকে এক ঘরে রাখার হুমকি বন্ধ করতে হবে
  • মানসিক জুলুম বন্ধ করতে হবে

ধাপ ৪: খুলা বা তালাক

যদি সে না মানে, তাহলে খুলা চাওয়া আপনার অধিকার। প্রয়োজনে ইসলামী আদালত/শরীয়ত বোর্ডের মাধ্যমে।

ধাপ ৫: ইদ্দত ও সন্তান

  • ইদ্দত পালন করুন (৩ হায়েজ বা গর্ভবতী হলে সন্তান জন্ম পর্যন্ত)।
  • সন্তানদের হক (খোরপোশ, বাসস্থান) স্বামীর উপর বাধ্যতামূলক — সূরা আত-তালাক ৬৫:৬-৭।

৭. সতর্কতা

  • তালাকের সিদ্ধান্ত আবেগে নয়, ইস্তিখারা ও ইলমের ভিত্তিতে নিন।
  • তালাকের পরও সন্তানদের পিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না — সন্তানদের হক আছে।
  • অভিভাবক/মাহরামের সহায়তা নিন — একা সিদ্ধান্ত নেবেন না।
  • নিরাপত্তা: যদি শারীরিক নির্যাতনের আশঙ্কা থাকে, আগে নিরাপদ আশ্রয় নিন।

উপসংহার

আপনি যে জুলুম, রোগ, অপমান ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করছেন — তা ইসলামে কখনোই কাঙ্ক্ষিত নয়। আল্লাহর ভয় মানে জুলুম সহ্য করা নয়; আল্লাহর ভয় মানে আল্লাহর সীমা রক্ষা করা। আপনার স্বামী আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করছে। আপনি খোলা তালাক চাইলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন না — বরং আপনি নিজের দ্বীন, জান, ইজ্জত ও সন্তানদের রক্ষা করছেন, যা আল্লাহর কাছে প্রিয়।

«وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا» "আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" — সূরা আত-তালাক ৬৫:২

আল্লাহ আপনার জন্য উত্তম ফয়সালা করুন। আমীন।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.