বিবাহে পাত্র পছন্দ সংক্রান্ত বিস্তারিত বিষয় জানতে চাই।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
ছেলের পরিবার পুরোপুরি জামাত ইসলাম করে। ছেলের মা জামাত ইসলামির মহিলা শাখায় দাওয়াতি কাজ করছেন। ছেলের মায়ের সাথে কথা বলে বুঝলাম, কুরআন ও হাদিসের অনেক জ্ঞান তিনি রাখেন। জামাত ইসলাম মেয়েদের পর্দা, চাকুরীর বিষয়ে যেমন চিন্তা লালন করে, ছেলের মাও একই চিন্তা লালন করে। ছেলের বোনেরা বোরখা, নিকাব পড়ে স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাকতা করেন। ছেলের মাঝে দ্বীনদারিতায় কিছু ঘাটতি আছে। জামাতের সলাতে একটু গাফিলতি আছে, মাঝেমধ্যে নাটক দেখা হয়। ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, সুন্নতি দাঁড়ি, টাখনুর উপর পোশাক পরিধান সহ পায়জামা পাঞ্জাবি পরিধান করে। ছেলে নিজের সংসোধনের ব্যাপারে সচেতন এবং পজেটিভ। তাই, ছেলে এবং ছেলের পরিবার একজন দ্বীনদার, তাকওয়াবান মেয়ে খুঁজছেন।
আমি বা আমার পরিবার জামাত ইসলাম নই। আমি বিশ্ববিদ্যালয় থাকতে তাবলিগের তালিমে যেতাম। অন্তরে ওনাদের প্রভাব আছে, ভালো লাগও আছে। তবে, তাদের সাথে ইনভলভ নই। ছেলের মা আবার তাবলিগ সম্পর্কে একটু নেতিবাচক মন্তব্য করেছে।
এদিকে, আমার বাহিরে গিয়ে চাকুরী করতে ভালো লাগে না। ছেলের মায়ের মানসিকতা যেমন, আমার উপরে একটা চাপ আসতে পারে সম্ভাবনা থেকে বলছি। আবার, নিকাব পড়ে ছেলের বড় ভাই এমন মানুষের সাথে ডাইনিং টেবিলে হয়ত খাবার খেতে হতে পারে। আমি ঠিক জানি না, কি হতে পারে।
ছেলের মায়ের হৃদয়টা খুব নরম মনে হয়ছে। কথাগুলে হৃদয় থেকে বলেন। ওনার কথাগুলো আমার হৃদয়ে গেঁথে গেছে। তিনি বলেন, তাকওয়া, নিয়ত এগুলো থাকাটা বেশি জরুরী।
আমার একই সাথে ভালো লাগা, ভয়, শঙ্কা---দুটোই কাজ করছে। ইস্তেখারা করেছি, তারপর আমার কাছে একটা বিষয় মনে হচ্ছে, নিয়ত ঠিক থাকলে যে কোন কিছু করা যায়। মনে হচ্ছে, এটা আমার জন্য একটা পজেটিভ সাইন।
ওস্তায, আমাকে পরামর্শ করুন আমি কি করবো? আমার পরিবারের সবার এই বিষয়গুলোতে এত জ্ঞান নেই যে, তাদের সাথে আলেচনা করে একটা পরামর্শে যাবে।
ছেলের এডুকেশন কোয়ালিফিকেশন যথেষ্ট ভালে। পরিবারও শিক্ষিত, সম্মানিত।
আমিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করি।
আমার পরিবারও শিক্ষিত, সম্মানিত।
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসূলিল্লাহ
ভূমিকা
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। বিবাহ জীবনের একটি বড় সিদ্ধান্ত, যা শুধু দুই ব্যক্তির নয়, বরং দুই পরিবারের সমন্বয়। আপনার মনে যে দ্বিধা, ভয় ও শঙ্কা কাজ করছে—তা স্বাভাবিক। ইসলামে বিবাহের পূর্বে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করার নির্দেশনা রয়েছে।
প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: জামাত ইসলাম ও তাবলিগ জামাত প্রসঙ্গে
জামাত ইসলাম (Jamaat-e-Islami) এবং তাবলিগ জামাত (Tablighi Jamaat) দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সংগঠন। এদের আকিদা, মানহাজ ও কর্মপদ্ধতিতে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের (হানাফি) দৃষ্টিতে:
-
তাবলিগ জামাত মূলত দাওয়াত ও তাবলিগের একটি প্রচলিত ধারা, যা মাওলানা ইলিয়াস রহ. কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। এর মূল কাজ হলো মুসলমানদের দ্বীনের প্রতি উদাসীনতা দূর করা, নামাজ-রোজা-যিকিরের প্রতি উৎসাহ দেওয়া। তবে এতে কিছু বেদআতি পদ্ধতি ও অতিরিক্ত বিষয় অনুপ্রবেশ করেছে বলে উলামায়ে কেরাম সমালোচনা করেছেন। বিশেষত, ফাযায়েলে আমল গ্রন্থে কিছু অতি দুর্বল ও বানোয়াট বর্ণনা রয়েছে বলে মুহাদ্দিসীন ও ফকীহগণ উল্লেখ করেছেন।
-
জামাত ইসলাম একটি রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠন। এর রাজনৈতিক দর্শন, মাওলানা মওদুদী রহ.-এর কিছু মতবাদ—বিশেষত "খিলাফত ও মালিকিয়্যাত" প্রভৃতি বিষয়ে উলামায়ে কেরামের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। তবে এর সদস্যগণ সাধারণত নামাজ-রোজা-পর্দা ইত্যাদি ইসলামি বিধান পালনে সচেষ্ট থাকেন।
মূল বিষয়: কোনো সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ততা বা না থাকা ইসলামি বিবাহের মূল মানদণ্ড নয়। মূল মানদণ্ড হলো দ্বীনদারিতা ও তাকওয়া।
কুরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে বিবাহের মানদণ্ড
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَنكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّىٰ يُؤْمِنَّ ۚ وَلَأَمَةٌ مُّؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ ۗ وَلَا تُنكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّىٰ يُؤْمِنُوا ۚ وَلَعَبْدٌ مُّؤْمِنٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ ۗ
"তোমরা মুশরিক নারীদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। নিশ্চয়ই একজন মুমিন দাসী একজন মুশরিক নারীর চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে। আর তোমরা মুশরিক পুরুষদের সাথে (নিজেদের নারীদের) বিবাহ দেবে না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। নিশ্চয়ই একজন মুমিন দাস একজন মুশরিক পুরুষের চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে।"
(সূরা আল-বাকারা: ২২১)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ
"নারীকে চারটি বিষয়ের ভিত্তিতে বিবাহ করা হয়: তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার দ্বীনদারিতা। তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, (তাহলে) তোমার হাত ধূলিমলিন হবে (অর্থাৎ তুমি সফল হবে)।"
(সহিহ বুখারি: ৫০৯০, সহিহ মুসলিম: ১৪৬৬)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَأَنْكِحُوهُ، إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ كَبِيرٌ
"যখন তোমাদের কাছে এমন কেউ (বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে) আসে, যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তখন তার সাথে (নারীদের) বিবাহ দাও। যদি তোমরা তা না করো, তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা ও বড় ফাসাদ ছড়িয়ে পড়বে।"
(সুনানে তিরমিজি: ১০৮৪, হাসান)
আপনার পরিস্থিতির বিশ্লেষণ
১. ছেলের দ্বীনদারিতা
আপনি বলেছেন, ছেলের মধ্যে দ্বীনদারিতায় কিছু ঘাটতি আছে—জামাতের সালাতে গাফিলতি, মাঝেমধ্যে নাটক দেখা। তবে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, সুন্নতি দাঁড়ি রাখে, টাখনুর উপরে পোশাক পরে।
ফিকহি দৃষ্টিতে:
- ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা, সুন্নতি দাঁড়ি রাখা, টাখনুর উপরে কাপড় রাখা—এগুলো দ্বীনদারিতার বড় নিদর্শন।
- নাটক দেখা যদি হারাম বিষয়বস্তু (অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, কুফরি) না হয়, তাহলে তা মাকরুহ বা কমপক্ষে অপছন্দনীয়। তবে তা ফাসিক হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছায় না।
- জামাতের সালাতে গাফিলতি—যদি কখনো জামাত ছুটে যায়, তবে তা গুনাহ, কিন্তু এতে সে ফাসিক বা বিবাহের অযোগ্য হয়ে যায় না।
ইসলামি বিধান: ফাসিক (গুনাহগার) মুসলিমের সাথে বিবাহ বৈধ। তবে দ্বীনদার মুত্তাকি ব্যক্তির সাথে বিবাহ উত্তম।
২. ছেলের মায়ের মানসিকতা ও পরিবারের পরিবেশ
ছেলের মা জামাত ইসলামের মহিলা শাখায় দাওয়াতি কাজ করেন। তিনি পর্দা, চাকুরি ইত্যাদি বিষয়ে জামাত ইসলামের চিন্তা লালন করেন। আপনি বলেছেন, তিনি তাবলিগ সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন।
এখানে বিবেচনার বিষয়:
- শাশুড়ির মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি আপনার দাম্পত্য জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।
- যদি তিনি আপনার উপর চাপ প্রয়োগ করেন (যেমন: বাইরে চাকুরি না করা, নির্দিষ্ট পোশাক ইত্যাদি), তাহলে তা আপনার জন্য কষ্টদায়ক হতে পারে।
- তবে আপনি বলেছেন, তার হৃদয় নরম এবং তিনি তাকওয়া ও নিয়তের গুরুত্বের কথা বলেন—এটি ইতিবাচক দিক।
ইস্তেখারা প্রসঙ্গে
আপনি ইস্তেখারা করেছেন এবং মনে হচ্ছে এটি পজিটিভ সাইন। ইস্তেখারার মূল কথা হলো—আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা এবং সিদ্ধান্তে দৃঢ় হওয়া।
তবে মনে রাখবেন:
- ইস্তেখারা শুধু স্বপ্ন বা অনুভূতির উপর নির্ভর করে না।
- ইস্তেখারার সাথে সাথে ইস্তিশারা (পরামর্শ) করাও সুন্নত।
- আপনার মনে যে "নিয়ত ঠিক থাকলে যে কোনো কিছু করা যায়" —এটি সঠিক, তবে নিয়তের সাথে বাস্তবতা ও পরিণতিও বিবেচনা করতে হবে।
★আপনার ইস্তিখারা যেহেতু পজিটিভ, তাই আপনি যদি সেই পরিবারে গিয়ে পূর্ণ দ্বীন মেনে চলতে পারেন,পূর্ণ পর্দা মেইনটেইন করে চলতে পারেন, এক্ষেত্রে কোন বাধা যদি না থাকে, সেক্ষেত্রে আপনি তার সাথে বিবাহ বসতে পারেন।