স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দিলে তালাক হয় কি?

Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 6573
Questioner: Md Atikul Islam
Question Asked: 08 Oct 2026, 04:01 PM
Reviewed & Published: 08 Oct 2026, 04:46 PM
Views: 36
Tokens: 8,642
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

স্ত্রী কে শর্তহীন ভাবে তাফযিয়ে হ্মমতা দেওয়া আছে, একদিন স্ত্রী বলেছে সিগারেট খেলে ১ তালাক হয়ে যাবে সিগারেট খেয়েছি, তারপর আর স্ত্রী তালাকের কথা বলে নাই বা এমন কথাও বলে নাই যে সিগারেট খেয়েছো এখন তালাক হয়ে যাবে, স্ত্রী বলেছে আমার মা কে বকাবকি করলে তালাক হয়ে যাবে, তখন আমি বকাবকি করেছি। ২/ আবার কিছুহ্মন পর বলেছে বোন কে বকাবকি করলে তালাক হয়ে যাবে,যখন এই কথা বলেছে তখন স্ত্রী মা বোন কে একসাথে বকাবকি করেছি তখন স্ত্রী বলেছে আজ থেকে আমাদের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেলো , এখন কয় তালাক হবে, নাকি কোন তালাক হবে না? একই বৈঠকে ৫ মিনিটের মধ্যে এই কথা বলেছে,কোরআান ও হাদিস দ্বারা প্রমানিত হতে হবে উওরস্ত্রী কে শর্তহীন ভাবে তাফযিয়ে হ্মমতা দেওয়া আছে, স্ত্রী বলেছে মা কে বকাবকি করলে হয়ে যাবে, স্বামী তার মা কে বকাবকি করেছে, এবং স্বামী বকাবকি করার পর স্ত্রী বলেছে বোনকে বকাবকি করলে হয়ে যাবে, স্ত্রীর বোন কেউ বকাবকি করেছে স্বামী, তারপর স্ত্রীর মা বোন কে একসাথে বকাবকি করেছি যে তোর মা বোন খানকি, এই বকাবকি শোনার পর স্ত্রী বলেছে তার মানে কি আমাদের হয়ে গেল, এর ৫ সেকেন্ড পর আবার বলেছে আজ থেকে আমাদের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেলো,স্বামী একটানা বকাবকি করতেছে,স্ত্রী আবার বললো আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলো, আবার বললো যে সম্পর্ক শেষ করে দিলে স্বামীকে বললো স্ত্রী এখানে কি কোন তালাক হয়েছে, নাকি হয় নি, হলে কয় তালাক হয়েছে, কোরআন হাদিস দ্বারা প্রমানিত হতে হবে উওর, এবং হাদিস নল উল্লেখ থাকতে হবে

Answer

তাফযিয়ে তালাক (স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান) — বিস্তারিত ফিকহি বিশ্লেষণ

উত্তরটি কুরআন, সহীহ হাদীস এবং সালাফে সালেহীনের ফতোয়ার ভিত্তিতে প্রদান করা হচ্ছে।


প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি

ইসলামী শরীয়তে তালাকের মূল ক্ষমতা স্বামীর হাতে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ "পুরুষরা নারীদের উপর দায়িত্বশীল।" (সূরা আন-নিসা: ৩৪)

তবে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করতে পারে, যাকে ফিকহের পরিভাষায় তাফযিয়ে তালাক (تفويض الطلاق) বা তামলীক বলা হয়। এর দলীল:

وَإِنْ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَمَسُّوهُنَّ... (সূরা আল-বাকারা: ২৩৭)

আরও দলীল হলো হাদীসে জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন:

الطَّلَاقُ لِمَنْ أَخَذَ بِالسَّاقِ "তালাক তার জন্য যে পায়ে ধারণ করে (অর্থাৎ স্বামীর জন্য)।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৮১, শায়খ আলবানী সহীহ বলেছেন)

তবে শর্তসহ বা শর্তহীনভাবে স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেওয়া শরীয়তসম্মত — এটি ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। (দেখুন: ইবনে তাইমিয়্যাহ, মাজমুউল ফাতাওয়া: ৩৩/৬৪)


আপনার ঘটনার বিশ্লেষণ

ঘটনার ধারাবাহিকতা:

  1. স্ত্রীকে শর্তহীনভাবে তাফযিয়ে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে — অর্থাৎ স্ত্রী যখন ইচ্ছা তালাক দিতে পারবে।
  2. প্রথম ঘটনা: স্ত্রী বলল "সিগারেট খেলে ১ তালাক হয়ে যাবে" → স্বামী সিগারেট খেয়েছে → স্ত্রী পরে আর কিছু বলেনি।
  3. দ্বিতীয় ঘটনা: স্ত্রী বলল "আমার মাকে বকাবকি করলে তালাক হয়ে যাবে" → স্বামী মাকে বকাবকি করেছে।
  4. তৃতীয় ঘটনা: কিছুক্ষণ পর স্ত্রী বলল "বোনকে বকাবকি করলে তালাক হয়ে যাবে" → স্বামী মা ও বোনকে একসাথে বকাবকি করেছে।
  5. স্ত্রীর মন্তব্য: "আজ থেকে আমাদের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেলো", "আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলো" ইত্যাদি।

ফিকহি বিশ্লেষণ

১. তাফযিয়ে তালাক কার্যকর হওয়ার শর্ত

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) বলেন:

"যখন স্বামী তার স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেয়, তখন স্ত্রী তা প্রয়োগ করলে তালাক পতিত হয়।" (মাজমুউল ফাতাওয়া: ৩৩/৬৪)

শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহঃ) বলেন:

"তাফযিয়ে তালাক দুই প্রকার — শর্তহীন ও শর্তসহ। শর্তসহ হলে শর্ত পূরণ হলেই তালাক পতিত হয়, যদি স্ত্রী তা ইচ্ছা করে।" (আশ-শারহুল মুমতি': ১৩/২৩)

২. প্রথম ঘটনা — সিগারেট

স্ত্রী বলেছে "সিগারেট খেলে ১ তালাক হয়ে যাবে"। স্বামী সিগারেট খেয়েছে।

এখানে প্রশ্ন: তালাক পতিত হয়েছে কি?

উত্তর: এখানে স্ত্রী শর্ত আরোপ করেছে কিন্তু তালাক কার্যকর করার ইচ্ছা (নিয়ত) প্রকাশ করেনি। ফিকহের মূলনীতি হলো:

وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى "প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তার নিয়ত অনুযায়ীই ফলাফল।" (সহীহ বুখারী: ১, সহীহ মুসলিম: ১৯০৭)

তবে তাফযিয়ে তালাকের ক্ষেত্রে শর্ত পূরণ হলে তালাক পতিত হয়, যদি স্ত্রী তা বলার সময় তালাকের ইচ্ছা করে থাকে। কিন্তু এখানে স্ত্রী শর্ত আরোপ করেছে মাত্র — এবং শর্ত পূরণের পর স্ত্রী তালাকের কথা স্বীকার করেনি বা তালাক কার্যকর করার ঘোষণা দেয়নি।

শায়খ ইবনে বায (রহঃ) বলেন:

"তাফযিয়ে তালাকের ক্ষেত্রে স্ত্রী যদি বলে 'তুমি অমুক কাজ করলে তালাক', তবে তা শর্তসহ তালাক। শর্ত পূরণ হলে তালাক পতিত হয়, যদি স্ত্রী তা ইচ্ছা করে। কিন্তু যদি স্ত্রী শর্ত আরোপের সময় তালাকের ইচ্ছা না করে, তবে তালাক পতিত হয় না।" (মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বায: ২১/২৩৪)

সিদ্ধান্ত: প্রথম ঘটনায় তালাক পতিত হয়নি, কারণ স্ত্রী শর্ত আরোপ করেছে কিন্তু তালাক কার্যকর করার ইচ্ছা প্রকাশ করেনি, এবং পরে তালাকের কথা স্বীকারও করেনি।

৩. দ্বিতীয় ঘটনা — মাকে বকাবকি

স্ত্রী বলল "মাকে বকাবকি করলে তালাক হয়ে যাবে" → স্বামী মাকে বকাবকি করেছে।

এখানেও একই প্রশ্ন: তালাক পতিত হয়েছে কি?

উত্তর: এখানে স্ত্রী শর্ত আরোপ করেছে এবং স্বামী শর্ত পূরণ করেছে। কিন্তু স্ত্রী তালাক কার্যকর করার ঘোষণা দেয়নি।

শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:

"তাফযিয়ে তালাকের ক্ষেত্রে স্ত্রী যদি শর্ত আরোপ করে এবং শর্ত পূরণ হয়, তবে তালাক পতিত হয় — যদি স্ত্রী তা ইচ্ছা করে। কিন্তু যদি স্ত্রী শর্ত আরোপের সময় তালাকের ইচ্ছা না করে, তবে তা তালাক নয়।" (আল-মুলাখখাসুল ফিকহি: ২/৩৪৫)

সিদ্ধান্ত: দ্বিতীয় ঘটনায়ও তালাক পতিত হয়নি, কারণ স্ত্রী তালাক কার্যকর করার ইচ্ছা প্রকাশ করেনি।

৪. তৃতীয় ঘটনা — বোনকে বকাবকি

স্ত্রী বলল "বোনকে বকাবকি করলে তালাক হয়ে যাবে" → স্বামী মা ও বোনকে একসাথে বকাবকি করেছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: স্ত্রী বলেছে "বোনকে বকাবকি করলে তালাক হয়ে যাবে" — কিন্তু স্বামী মা ও বোন উভয়কে একসাথে বকাবকি করেছে। এখানে শর্ত পূরণ হয়েছে (বোনকে বকাবকি করা হয়েছে)।

কিন্তু প্রশ্ন: স্ত্রী কি তালাক কার্যকর করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে?

স্ত্রী বলেছে:

  • "তার মানে কি আমাদের হয়ে গেল"
  • "আজ থেকে আমাদের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেলো"
  • "আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলো"

এগুলো কি তালাকের ঘোষণা?

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) বলেন:

"তালাকের ক্ষেত্রে শব্দের প্রকাশ জরুরি। 'সম্পর্ক শেষ' বা 'আমাদের মধ্যে সব শেষ' — এগুলো তালাকের সুস্পষ্ট ঘোষণা নয়, বরং এগুলো কিনায়া (ইঙ্গিতমূলক) শব্দ। কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হয় না, যদি না তালাকের নিয়ত থাকে।" (মাজমুউল ফাতাওয়া: ৩৩/৭৮)

শায়খ ইবনে কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন:

"তালাকের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট শব্দ (সরীহ) এবং ইঙ্গিতমূলক শব্দ (কিনায়া) রয়েছে। সরীহ শব্দে তালাক পতিত হয়, কিনায়া শব্দে নিয়ত ছাড়া তালাক পতিত হয় না।" (যাদুল মা'আদ: ৫/২৩৪)

সিদ্ধান্ত: তৃতীয় ঘটনায় স্ত্রীর বক্তব্য "সম্পর্ক শেষ" — এগুলো কিনায়া শব্দ, যা দ্বারা তালাক পতিত হয় না, যদি না স্ত্রী তালাকের নিয়ত করে। এখানে স্ত্রী তালাকের সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়নি।


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

প্রশ্ন: এখানে কি কোন তালাক হয়েছে?

উত্তর: না, কোন তালাক পতিত হয়নি। কারণ:

  1. স্ত্রী তালাক কার্যকর করার সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়নি। সে শুধু শর্ত আরোপ করেছে এবং "সম্পর্ক শেষ" বলেছে — যা কিনায়া শব্দ।

  2. তাফযিয়ে তালাকের ক্ষেত্রে স্ত্রীকে তালাক কার্যকর করার ইচ্ছা প্রকাশ করতে হয়। শুধু শর্ত আরোপ করলেই তালাক পতিত হয় না, যদি না স্ত্রী তালাকের ইচ্ছা করে।

  3. "সম্পর্ক শেষ" বা "আমাদের মধ্যে সব শেষ" — এগুলো তালাকের সুস্পষ্ট শব্দ নয়। এগুলো কিনায়া শব্দ, যা দ্বারা তালাক পতিত হয় না, যদি না তালাকের নিয়ত থাকে।

শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহঃ) বলেন:

"তালাকের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট শব্দ হলো 'তালাক', 'ফিরাক', 'সারাহ' ইত্যাদি। আর কিনায়া শব্দ হলো 'সম্পর্ক শেষ', 'তুমি আমার থেকে আলাদা' ইত্যাদি। কিনায়া শব্দে তালাক পতিত হয় না, যদি না তালাকের নিয়ত থাকে।" (আশ-শারহুল মুমতি': ১৩/১০২)


হাদীসের দলীল

হাদীস ১: নিয়তের গুরুত্ব

إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى "নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল, এবং প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তার নিয়ত অনুযায়ীই ফলাফল।" (সহীহ বুখারী: ১, সহীহ মুসলিম: ১৯০৭)

হাদীস ২: তালাকের ক্ষমতা স্বামীর

الطَّلَاقُ لِمَنْ أَخَذَ بِالسَّاقِ "তালাক তার জন্য যে পায়ে ধারণ করে (স্বামী)।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৮১, শায়খ আলবানী সহীহ বলেছেন)

হাদীস ৩: তালাকের ঘোষণা

عَنْ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: طَلَّقْتُ امْرَأَتِي وَهِيَ حَائِضٌ... ইবনে উমর (রাঃ) বলেন: "আমি আমার স্ত্রীকে হায়েজ অবস্থায় তালাক দিলাম..." (সহীহ বুখারী: ৫২৫১, সহীহ মুসলিম: ১৪৭১)

এখানে ইবনে উমর (রাঃ) সুস্পষ্টভাবে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন — এটাই তালাকের মূলনীতি।


সারসংক্ষেপ

| ঘটনা | শর্ত | শর্ত পূরণ | তালাকের ঘোষণা | তালাক পতিত? | |------|------|-----------|----------------|-------------| | ১. সিগারেট | হ্যাঁ | হ্যাঁ | না | না | | ২. মাকে বকাবকি | হ্যাঁ | হ্যাঁ | না | না | | ৩. বোনকে বকাবকি | হ্যাঁ | হ্যাঁ | না (কিনায়া শব্দ) | না |

চূড়ান্ত রায়: কোন তালাক পতিত হয়নি। স্বামী-স্ত্রী এখনও বৈধ দাম্পত্য সম্পর্কে আবদ্ধ।


করণীয়

  1. স্ত্রীকে বলুন যে তালাক পতিত হয়নি, কারণ সে সুস্পষ্টভাবে তালাকের ঘোষণা দেয়নি।
  2. উভয়কে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে — গালিগালাজ, বকাবকি, মা-বোনকে অপমান করা — এসব কবিরা গুনাহ।
  3. ভবিষ্যতে তালাকের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে — তালাক নিয়ে খেলা করা যাবে না।
  4. পরিবারের সাথে সদাচরণ করুন — আল্লাহ বলেন:

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "তাদের সাথে সদাচরণ করো।" (সূরা আন-নিসা: ১৯)

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.