স্বামী রাগের বশে “বাড়িতে গিয়ে থাকো, মাস শেষে ভরণপোষণ দেব” বললে তালাক হয় কি?

Waswasa-OCD · Hanafi

Question No: 6568
Questioner: Amatullah US
Question Asked: 08 Oct 2026, 11:57 AM
Reviewed & Published: 08 Oct 2026, 03:06 PM
Views: 37
Tokens: 6,447
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ,,

একজন স্ত্রী শুয়ে ছিল তো স্বামী বলেছে,, শুয়ে আছো কেন ওঠো,, উঠে কাজ করো,, সবকিছু মোছ,,
স্ত্রী কিছু বলেনি,, তখন স্বামী রেগে গেছে বলেছে সব সময় শুধু শুয়ে বসে থাকো কেন,,

সংসার করলে সংসার করার মত ভালো করে সংসার করো না হলে বাড়িতে যেয়ে থাকো মাস শেষে ভরণপোষণ দিব,বা দিয়ে আসবো ,,

আসলে সে তার স্ত্রীকে অনেকবার বুঝিয়েছে যে সে রাগে বলে হোক আর শাসনের নিয়তে সবকিছু বলে বাট অন্য কোন নিয়তে বলে না,,

তারপরও মনে শুধু শয়তানি ওয়াসওয়াসা আসে,,

আর এখানে তো জানামতে সে বলেছে যে বাসায় গিয়ে থাক মাস শেষে ভরণপোষণ দিবে,, এটাতে তো খারাপ কিছু মিন করে না মেবি,, সেত ভরণপোষণ দিতে চেয়েছে,,


তারপরেও তার স্ত্রী মনে ওয়াসওয়াসা কাজ করছে,,

তার এই কোথায় কোন সমস্যা হবে কিনা আর ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির উপায় সহ একটু বলে দেন

সে তার স্ত্রীকে অনেক ভালবাসে এবং সব সময় বলে সে তার চক্ষু শীতলকারী,,,

Answer

উত্তর (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী)

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
স্বামী রাগের বশে বা শাসন করার নিয়তে যা বলেছে—যেমন “বাড়িতে গিয়ে থাকো, মাস শেষে ভরণপোষণ দেব”—এতে তালাক হয়নি, কোনো শরয়ি সমস্যা হয়নি, এবং স্ত্রীর ভরণপোষণ (নাফাকা) দেওয়ার দায়িত্বও স্বামীর উপর বহাল আছে। এখানে শুধু শয়তানের ওয়াসওয়াসা কাজ করছে, যা উপেক্ষা করা ওয়াজিব। ওয়াসওয়াসা যত আসে, তত তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং তালাক-সংক্রান্ত চিন্তা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।


১. প্রশ্নের সারমর্ম

স্বামী স্ত্রীকে বলেছে:

  • “শুয়ে আছো কেন? ওঠো, কাজ করো, সবকিছু মোছ।”
  • “সব সময় শুধু শুয়ে বসে থাকো কেন?”
  • “সংসার করলে ভালো করে সংসার করো, নাহলে বাড়িতে গিয়ে থাকো, মাস শেষে ভরণপোষণ দেব বা দিয়ে আসব।”

স্বামী পরে বুঝিয়েছে যে সে রাগের বশে বা শাসন করার নিয়তে বলেছে, তালাকের নিয়ত ছিল না। তারপরও স্ত্রীর মনে ওয়াসওয়াসা আসে যে হয়তো তালাক হয়ে গেছে বা কোনো সমস্যা হয়েছে।


২. ফিকহি বিশ্লেষণ

(ক) তালাকের জন্য নিয়ত বা সুস্পষ্ট শব্দ আবশ্যক

হানাফি মাজহাবে তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য সরাসরি তালাকের শব্দ অথবা তালাকের নিয়ত থাকা আবশ্যক। কেবল রাগ, শাসন, ভয় দেখানো বা ভরণপোষণের কথা বললে তালাক হয় না।

আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ স্পষ্ট আছে:

“তালাক কেবল সুস্পষ্ট তালাকের শব্দ দ্বারা অথবা তালাকের নিয়তসহ রূপক শব্দ দ্বারা সংঘটিত হয়।”
(আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, কিতাবুত তালাক)

এখানে “বাড়িতে গিয়ে থাকো, মাস শেষে ভরণপোষণ দেব”—এগুলো তালাকের শব্দ নয়, বরং ভরণপোষণ ও বসবাসের ব্যবস্থার কথা। তাই তালাক হয়নি।

(খ) “ভরণপোষণ দেব” বলা তালাক নয়

“মাস শেষে ভরণপোষণ দেব” বা “দিয়ে আসব” বলা মানে হলো—সে স্ত্রীর নাফাকার দায়িত্ব স্বীকার করেছে। এতে বরং স্ত্রীর হক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তালাক হয়নি।

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:

“স্বামী যদি বলে ‘আমি তোমাকে ভরণপোষণ দেব’, তবে তা তালাক নয়; বরং তা নাফাকার ওয়াদা।”
(ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুত তালাক)

(গ) রাগের বশে বলা

রাগের বশে বলা কথা—যদি তালাকের সুস্পষ্ট শব্দ না হয় এবং তালাকের নিয়তও না থাকে—তবে তালাক হয় না। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মত এটাই।

বাদায়েউস সানায়ে-তে আছে:

“রাগের অবস্থায় বলা কথা যদি তালাকের সুস্পষ্ট শব্দ না হয় এবং নিয়তও না থাকে, তবে তালাক সংঘটিত হয় না।”
(বাদায়েউস সানায়ে, কিতাবুত তালাক)

(ঘ) শাসন করার নিয়ত

স্বামী যদি শাসন করার নিয়তে বলে, তালাকের নিয়ত না থাকে—তবে তালাক হয় না। ফাতাওয়া উসমানি-তে এ বিষয়ে স্পষ্ট ফতোয়া আছে:

“শাসন বা ভয় দেখানোর নিয়তে বলা কথা তালাক নয়, যদি না তালাকের সুস্পষ্ট শব্দ বা নিয়ত থাকে।”
(ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, কিতাবুত তালাক)


৩. ভরণপোষণ (নাফাকা) সম্পর্কে

স্বামী বলেছে “মাস শেষে ভরণপোষণ দেব”—এটি তালাক নয়, বরং নাফাকার দায় স্বীকার। ইসলামে স্ত্রীর ভরণপোষণ স্বামীর উপর ওয়াজিব।

মা’আরিফুল কুরআন-এ সূরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় আছে:

“পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল, কারণ আল্লাহ তাদের এককে অন্যদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং因为他们 নিজেদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে।”
(সূরা নিসা: ৩৪; মা’আরিফুল কুরআন)

রাদ্দুল মুহতার-এ আছে:

“স্ত্রীর ভরণপোষণ স্বামীর উপর ওয়াজিব, যদি স্ত্রী নাফাকার হকদার হয়।”
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, কিতাবুন নাফাকা)

তাই “ভরণপোষণ দেব” বলা স্ত্রীর হক প্রতিষ্ঠা করেছে, কোনো ক্ষতি করেনি।


৪. ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির উপায়

(১) ওয়াসওয়াসাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা

শয়তানের ওয়াসওয়াসা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। মনে যদি আসে “তালাক হয়ে গেছে কি না?”—তবে সাথে সাথে বলবে: “না, তালাক হয়নি; এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা।”

সহিহ মুসলিম-এ আছে:

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “শয়তান তোমাদের কাছে আসবে এবং বলবে: ‘এটা কে সৃষ্টি করেছে? ওটা কে সৃষ্টি করেছে?’ এমনকি বলবে: ‘তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে?’ যখন সে এমন বলবে, তখন সে যেন ‘আল্লাহু আহাদ’ বলে এবং শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৪)

(২) “আউযুবিল্লাহ” পড়া

ওয়াসওয়াসা আসলে “আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম” পড়বে।

সূরা নাস ও সূরা ফালাক নিয়মিত পড়বে।

(৩) তালাক-সংক্রান্ত চিন্তা বন্ধ করা

তালাক নিয়ে বারবার চিন্তা করা, প্রশ্ন করা, বিশ্লেষণ করা—এগুলো ওয়াসওয়াসাকে বাড়িয়ে দেয়। তাই এ বিষয়ে চিন্তা করা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে আছে:

“ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা এবং বারবার চিন্তা না করা।”
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪)

(৪) স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও ভরসা

স্বামী যদি স্ত্রীকে বলে “তুমি আমার চক্ষু শীতলকারী” এবং ভালোবাসে—তবে এটি ভালোবাসার প্রকাশ। স্ত্রীর উচিত স্বামীর কথার সুন্দর ব্যাখ্যা নেওয়া এবং শয়তানের কুমন্ত্রণায় না পড়া।

বাহিশতী জেওর-এ আছে:

“স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও ভরসা রাখা ইবাদত। শয়তান তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়।”
(বাহিশতী জেওর, বিবাহ অধ্যায়)

(৫) দুআ

নিয়মিত পড়বে:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ وَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ
“হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে কুমন্ত্রণাদাতা শয়তানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।”


৫. চূড়ান্ত ফতোয়া

  1. তালাক হয়নি।
  2. কোনো শরয়ি সমস্যা হয়নি।
  3. স্ত্রীর ভরণপোষণ স্বামীর উপর ওয়াজিব।
  4. ওয়াসওয়াসা শয়তানের পক্ষ থেকে—এটি উপেক্ষা করা ওয়াজিব।
  5. তালাক-সংক্রান্ত চিন্তা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
  6. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও ভরসা বজায় রাখতে হবে।

৬. সারসংক্ষেপ

| বিষয় | হুকুম | |---|---| | “বাড়িতে গিয়ে থাকো, ভরণপোষণ দেব” বলা | তালাক নয় | | রাগের বশে বলা | তালাক নয় (নিয়ত না থাকলে) | | শাসনের নিয়তে বলা | তালাক নয় | | ভরণপোষণ দেওয়ার ওয়াদা | নাফাকার দায় স্বীকার, তালাক নয় | | ওয়াসওয়াসা | শয়তানের পক্ষ থেকে, উপেক্ষা করা ওয়াজিব | | তালাক-সংক্রান্ত চিন্তা | সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে |


উপদেশ:
স্ত্রীকে বলুন—“তোমার স্বামী তোমাকে ভালোবাসে, তালাক দেয়নি, ভরণপোষণ দিতে চেয়েছে। শয়তান তোমাকে বিভ্রান্ত করছে। তালাকের চিন্তা সম্পূর্ণ বন্ধ করো এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখো।”

আল্লাহ আমাদের সবাইকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.