শুধু মুখে "সে আমার স্ত্রী" বা "সে আমার স্বামী" বললে ইসলামী শরীয়তে কি বিবাহ হয়ে যায়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: সাক্ষীদের সামনে "সে আমার স্ত্রী" / "সে আমার স্বামী" বললে কি বিবাহ হয়ে যায়?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
না, শুধু মুখে "সে আমার স্ত্রী" বা "সে আমার স্বামী" বললে বিবাহ (নিকাহ) সংঘটিত হয় না। ইসলামী শরীয়তে বিবাহ একটি নির্দিষ্ট চুক্তি (ইজাব ও কবুল), যা নির্ধারিত শর্ত ও পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। নিছক দাবি বা স্বীকৃতি দ্বারা নিকাহ প্রতিষ্ঠিত হয় না।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. নিকাহ সংঘটিত হওয়ার শর্তসমূহ
হানাফী ফিকহ অনুযায়ী নিকাহ সহীহ হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তাবলী আবশ্যক:
- ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) — একই مجلسে পাত্র-পাত্রীর পক্ষ থেকে বা তাদের উকিল/অভিভাবকের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বিবাহের প্রস্তাব ও গ্রহণ।
- দুইজন সাক্ষী — প্রাপ্তবয়স্ক, বিবেকবান, মুসলিম দুইজন পুরুষ অথবা এক পুরুষ ও দুই মহিলা সাক্ষী উপস্থিত থাকা।
- মহর নির্ধারণ (কমপক্ষে কিছু হলেও)।
- পাত্র-পাত্রীর মধ্যে শরীয়তগত বাধা না থাকা (যেমন: রক্তসম্পর্ক, দুধসম্পর্ক, ইদ্দত ইত্যাদি)।
- ইজাব-কবুলে স্পষ্টতা — "আমি তোমাকে বিবাহ করলাম" / "আমি কবুল করলাম" এ ধরনের স্পষ্ট শব্দ ব্যবহার।
রেফারেন্স: আল-হিদায়া (কিতাবুন নিকাহ), রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) — কিতাবুন নিকাহ, ফাতাওয়া আলমগীরী (কিতাবুন নিকাহ)।
২. শুধু "সে আমার স্ত্রী" বলা নিকাহ নয়
কেউ যদি বলে "সে আমার স্ত্রী" — এটি একটি দাবি (ইদ্দিয়া) বা স্বীকৃতি (ইকরার)। কিন্তু নিকাহর মূল উপাদান হলো ইজাব-কবুল। শুধু দাবি করলে বা স্বীকৃতি দিলে নিকাহ সংঘটিত হয় না, যদি না পূর্বে প্রকৃত নিকাহ হয়ে থাকে।
- যদি পূর্বে প্রকৃত নিকাহ হয়ে থাকে, তাহলে "সে আমার স্ত্রী" বলা শুধু তার স্বীকৃতি — এতে নিকাহ নতুন করে হয় না, বরং বিদ্যমান নিকাহর ঘোষণা।
- যদি পূর্বে নিকাহ না হয়ে থাকে, তাহলে শুধু মুখে বলা দ্বারা নিকাহ হয় না।
রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, কিতাবুন নিকাহ — "النكاح لا يثبت بمجرد الدعوى" (নিকাহ শুধু দাবি দ্বারা প্রমাণিত হয় না)।
৩. সাক্ষীদের জানা থাকলে কী হবে?
প্রশ্নে বলা হয়েছে, লোকেরা আগে থেকেই জানে যে তারা স্বামী-স্ত্রী নয়। এমতাবস্থায়:
- সাক্ষীরা যদি জানে যে নিকাহ হয়নি, তাহলে তাদের সামনে "সে আমার স্ত্রী" বলা মিথ্যা দাবি।
- মিথ্যা বলা বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া হারাম।
- তবে এতে নিকাহ সংঘটিত হবে না, কারণ নিকাহর শর্ত (ইজাব-কবুল) পূর্ণ হয়নি।
৪. যদি উভয়ে একে অপরকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়?
এটিও নিকাহর জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ:
- নিকাহর জন্য ইজাব-কবুল প্রয়োজন, শুধু পারস্পরিক স্বীকৃতি নয়।
- ইজাব-কবুল ছাড়া শুধু "সে আমার স্ত্রী" / "সে আমার স্বামী" বলা নিকাহর শব্দ নয়।
- হানাফী মাযহাবে নিকাহর জন্য স্পষ্ট শব্দ (صريح) বা ইঙ্গিতবাহী শব্দ (كناية) সহ ইজাব-কবুল আবশ্যক।
রেফারেন্স: আল-হিদায়া — "النكاح ينعقد بالإيجاب والقبول" (নিকাহ ইজাব ও কবুল দ্বারা সংঘটিত হয়)। বাদায়েউস সানায়ে — কিতাবুন নিকাহ।
৫. একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক — সন্দেহ ও সতর্কতা
যদি কোনো পুরুষ ও মহিলা একসাথে বসবাস করে এবং বলে "আমরা স্বামী-স্ত্রী", কিন্তু প্রকৃত নিকাহ হয়নি — তাহলে এটি যিনা হিসেবে গণ্য হবে। মুসলিম সমাজে এ ধরনের মিথ্যা দাবি করা মারাত্মক গুনাহ।
তবে যদি তারা নিকাহ করতে চায়, তাহলে শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে (ইজাব-কবুল, দুই সাক্ষী, মহর) নিকাহ সম্পন্ন করতে হবে।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|--------| | শুধু "সে আমার স্ত্রী" বলা | নিকাহ হয় না | | শুধু "সে আমার স্বামী" বলা | নিকাহ হয় না | | উভয়ে পারস্পরিক স্বীকৃতি | নিকাহ হয় না | | সাক্ষীরা জানলে | নিকাহ হয় না, বরং মিথ্যা দাবি | | প্রকৃত নিকাহর শর্ত | ইজাব-কবুল + ২ সাক্ষী + মহর |
উপসংহার: প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় তাদের বিবাহ হয়নি। যদি তারা প্রকৃতপক্ষে স্বামী-স্ত্রী হতে চায়, তাহলে শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে নিকাহ করতে হবে। শুধু মুখে দাবি করলে নিকাহ প্রতিষ্ঠিত হয় না, বরং তা মিথ্যা বলা ও গুনাহর কাজ।
রেফারেন্স
- আল-হিদায়া — ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী, কিতাবুন নিকাহ
- রাদ্দুল মুহতার — ইবনে আবিদীন শামী, খণ্ড ৩, কিতাবুন নিকাহ
- ফাতাওয়া আলমগীরী — কিতাবুন নিকাহ
- বাদায়েউস সানায়ে — ইমাম কাসানী, কিতাবুন নিকাহ
- ফাতাওয়া উসমানী — মুফতি তাকী উসমানী, কিতাবুন নিকাহ
- ইমদাদুল ফাতাওয়া — মাওলানা আশরাফ আলী থানভী
- বেহেশতী জেওর — মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, নিকাহ অধ্যায়