জোরপূর্বক তালাক

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6520
Questioner: Efty Efty
Question Asked: 07 Oct 2026, 01:30 PM
Reviewed & Published: 07 Oct 2026, 02:49 PM
Views: 21
Tokens: 18,517
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত ভালোবাসার সম্পর্কের মধ্যে ছিলাম। আমি আমার স্ত্রীকে অনেক ভালোবাসি এবং আমার স্ত্রীও আমাকে অনেক ভালোবাসে। আমাদের দুজনেরই ইচ্ছা ছিল সংসার ও সম্পর্ক বজায় রাখা।

আমাদের বিয়ে হয়েছে ৩ মাসের বেশি সময়,বিয়ের পর থেকেই আমার শশুর বাড়ীর লোক জন কোনোভাবেই এই বিয়ে মেনে নেয়নি।আমাদের সংসার ভাঙার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন,,

কিন্তু কিছুদিন ধরে আমার স্ত্রী তার পরিবারের পক্ষ থেকে প্রচণ্ড মানসিক চাপ, ভয়ভীতি ও হুমকির মধ্যে ছিল। একই সঙ্গে আমাকেও বিভিন্নভাবে ভয় দেখানো ও চাপ দেওয়া হতে থাকে।

আমাকে বলা হয়, আমি যদি আমার স্ত্রীকে তালাক না দিই, তাহলে আমার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। আমার মা ও ভাইদের বিরুদ্ধেও মামলা করে আমাদের কোর্টে-কোর্টে ঘোরানো হবে এবং জেলে পাঠানো হবে—এমন হুমকি দেওয়া হয়। আমাকে আরও বলা হয়, আমাকে হাতের কাছে পেলে মারধর করা হবে, এমনকি আমাকে মেরে ফেলা হতে পারে এবং আমাকে জেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

কিছুদিন আগে আমি যখন আমার স্ত্রীর কাছে যাই, তখন তার পরিবার পুলিশ ডেকে আনে। সেখানে আমার স্ত্রীকে অনেক ধরনের হেনস্তা ও মানসিকভাবে হয়রানি করা হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, আমি সেখান থেকে চলে আসতে বাধ্য হই। আমি সেখানে থাকলে আমাকেও মারধর করা হবে, মিথ্যা মামলায় জড়ানো হবে এবং জেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

এছাড়াও আমার ব্যাগ এবং আমার গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি কাগজপত্র—যেমন পাসপোর্ট, ভিসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট—আটকে রাখা হয়। আমাকে বলা হয়, আমি যদি আমার স্ত্রীকে তালাক না দিই, তাহলে এসব কাগজপত্র আমাকে ফেরত দেওয়া হবে না।

অন্যদিকে, আমার স্ত্রীও পারিবারিক চাপের কারণে আমাকে তালাক দেওয়ার জন্য বলতে থাকে। সে আমাকে এমন কথাও বলে যে, আমি যদি তাকে তালাক না দিই, তাহলে সে আত্মহত্যা করবে। আমার স্ত্রীকে আমি অনেক ভালোবাসতাম এবং তার কোনো ক্ষতি হোক—এমন ভয়ও আমার মধ্যে কাজ করছিল।

এই সমস্ত ঘটনা একসঙ্গে আমাকে প্রচণ্ড মানসিক চাপ, ভয় এবং অসহায় অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়। আমি তালাক দিতে চাইনি, কিন্তু আমার নিজের নিরাপত্তা, আমার মা ও ভাইদের নিরাপত্তা, আমার গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র এবং আমার স্ত্রীর আত্মহত্যার হুমকি—সবকিছু মিলিয়ে আমি অত্যন্ত চাপে পড়ে যাই।

শেষ পর্যন্ত এই পরিস্থিতির মধ্যেই, সবার সামনে মোবাইলের মাধ্যমে আমি আমার স্ত্রীকে মুখে বলি—

“এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক।”

আমি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে চাই যে, আমি এই তালাক স্বাভাবিক ও স্বাধীন ইচ্ছায় দিতে চাইনি। আমার উদ্দেশ্য ছিল না আমার প্রিয় স্ত্রীকে ছেড়ে দেওয়া বা আমাদের সম্পর্ক শেষ করে দেওয়া। বরং নিজের জীবনে ভয়, স্ত্রীর আত্মহত্যার হুমকি, মানসিক চাপ, এবং চারদিকের পরিস্থিতির চাপে পড়ে আমি এই কথাগুলো উচ্চারণ করি।

আমরা দুজনেই একে অপরকে ভালোবাসি এবং এখনো একসঙ্গে সংসার করতে চাই। আমাদের উদ্দেশ্য কোনো হারাম সম্পর্কে থাকা নয়; বরং যদি শরিয়াহ অনুযায়ী আমাদের একসঙ্গে থাকার কোনো বৈধ পথ থাকে, আমরা সেটিই অনুসরণ করতে চাই।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন আমি সৌদি ফতোয়া সেন্টারে গিয়েছিলাম ।সেখানে লিখিত দেই এই সকল ঘটনা।এবং ওইখানে মুফতি বলছেন জোরপূর্বক এমন করে তালাক হয়না।আমি হেসে হেসে বা রাগ করে বা দুষ্টামি করে যেভাবেই তালাক দেয় তালাক পতিত হবে কিন্তু জোড় পূর্বক এরকম হয়না।ইসলামে জোর পূর্বক কিছুই করানোর নির্দেশ নেই।আরও অনেক হাদীস এবং আয়াত উল্লেখ করেছেন

এই পরিস্থিতিতে আমি একজন যোগ্য আলেম/মুফতির কাছে জানতে চাই:

১. আমি যে পরিস্থিতিতে প্রচণ্ড ভয়, হুমকি ও মানসিক চাপে পড়ে “এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক” উচ্চারণ করেছি, এই তালাক শরিয়াহ অনুযায়ী কার্যকর হয়েছে কি না?

২. যেহেতু আমি তালাক দিতে চাইনি এবং আমার ওপর শারীরিক ক্ষতি, মামলা, জেল, মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি ছিল, এটিকে শরিয়াহর দৃষ্টিতে ইকরাহ (জবরদস্তি/বাধ্য করা) হিসেবে গণ্য করা হবে কি না?

৩. আমার স্ত্রী যদি আমার ওপর এই তালাকের আগে আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে থাকে, সেটিও কি এই ঘটনার শরিয়াহগত হুকুম নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচিত হবে?

৪. যদি তালাক কার্যকর না হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের বিবাহ কি এখনো বহাল আছে এবং আমরা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একসঙ্গে থাকতে পারব কি না?

৫. আর যদি তালাক কার্যকর হয়ে থাকে, তাহলে ঠিক কতটি তালাক গণ্য হবে এবং আমাদের পুনরায় একসঙ্গে থাকার শরিয়াহসম্মত কোনো পথ আছে কি না?

৬. বিশেষভাবে জানতে চাই—আমার স্ত্রী আমাকে তৃতীয় বিয়ে করেছেন বলে কি “তৃতীয় স্বামী” হওয়ার কারণে আলাদা কোনো হুকুম প্রযোজ্য হয়, নাকি বর্তমান স্বামীর দেওয়া তালাকের সংখ্যা ও পূর্বের বিবাহগুলো আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে?

আমি চাই, আমাদের বিষয়টি পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে কুরআন-সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য ফিকহের আলোকে নির্ধারণ করা হোক। আমরা দুজনেই একে অপরকে ভালোবাসি এবং যদি শরিয়াহ অনুযায়ী বৈধভাবে একসঙ্গে থাকার সুযোগ থাকে, আমরা সেই পথেই ফিরতে চাই।আর এই পুরো ঘটনা আমি এবং আমার স্ত্রী একত্রে লিখেছি।

Answer

জোরপূর্বক তালাক (ইকরাহ) সম্পর্কিত ফতোয়া

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

ভূমিকা

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। ইসলামী শরীয়তে তালাক একটি গুরুতর বিষয়, যা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয় হলেও বৈধ। তবে জোরপূর্বক বা ইকরাহর (বাধ্যবাধকতা) মাধ্যমে উচ্চারিত তালাকের হুকুম সম্পর্কে ফকীহগণের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। নিচে কুরআন, সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য হানাফী ফিকহের আলোকে আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রদান করা হচ্ছে।


১. জোরপূর্বক তালাকের শরীয়াহগত হুকুম

হানাফী মাযহাবের মূল অবস্থান

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, জোরপূর্বক (ইকরাহ) তালাক কার্যকর হয় না। এটি হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত।

দলিল:

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيمَانِ" "কিন্তু যে ব্যক্তি বাধ্য হয়, অথচ তার অন্তর ঈমানে অবিচল" (সূরা নাহল: ১০৬)

এই আয়াত প্রমাণ করে যে, জোরপূর্বক অবস্থায় মুখে উচ্চারিত কথা অন্তরের বিশ্বাসের বিপরীত হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

"إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ" "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং যেসব কাজে তারা বাধ্য হয়েছে তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।" — (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪৩, সুনানে বায়হাকী)

হানাফী ফিকহের বিস্তারিত

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: ইকরাহর মাধ্যমে তালাক পতিত হয় না, কারণ তালাক একটি ইচ্ছাকৃত কাজ, যা অন্তরের সংকল্প ছাড়া সম্পন্ন হয় না।

ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতও অনুরূপ।

আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) লিখেন:

"وَلَا يَقَعُ طَلَاقُ الْمُكْرَهِ عِنْدَ أَبِي حَنِيفَةَ وَأَبِي يُوسُفَ وَمُحَمَّدٍ" "ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদের মতে মুকরাহ (জোরপূর্বক) ব্যক্তির তালাক পতিত হয় না।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৪৬)

ফাতাওয়া আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে:

"الْإِكْرَاهُ يَمْنَعُ وُقُوعَ الطَّلَاقِ" "ইকরাহ তালাক পতিত হওয়া থেকে বিরত রাখে।" — (ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৫৪)

ইকরাহর সংজ্ঞা ও শর্ত

ইকরাহ (জবরদস্তি) তখনই বিবেচিত হয় যখন:

  1. ভয় দেখানো হয় — প্রাণনাশ, অঙ্গহানি, গুরুতর শারীরিক ক্ষতি বা সম্মানহানির হুমকি।
  2. হুমকি তাৎক্ষণিক বা নিকটবর্তী হয় — দীর্ঘমেয়াদী নয়।
  3. হুমকিদাতা ক্ষমতাবান হয় — যিনি হুমকি দিচ্ছেন তিনি তা বাস্তবায়নে সক্ষম।
  4. বাধ্য ব্যক্তি নিরুপায় হয় — পালানোর বা প্রতিরোধের কোনো উপায় না থাকে।

আপনার বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে:

  • প্রাণনাশের হুমকি ছিল
  • মারধরের হুমকি ছিল
  • মিথ্যা মামলা ও জেলের হুমকি ছিল
  • পাসপোর্ট-ভিসা আটকে রাখা হয়েছিল
  • স্ত্রীর আত্মহত্যার হুমকি ছিল
  • পুলিশ ডেকে হেনস্তা করা হয়েছিল

এগুলো সবই ইকরাহর শর্ত পূরণ করে। তাই হানাফী মাযহাব অনুযায়ী আপনার তালাক কার্যকর হয়নি।


২. ইকরাহ হিসেবে গণ্য হবে কি না?

হ্যাঁ, আপনার পরিস্থিতি শরীয়তের দৃষ্টিতে ইকরাহ (জবরদস্তি) হিসেবে গণ্য হবে। কারণ:

  • প্রাণনাশের হুমকি — ইকরাহর সর্বোচ্চ স্তর।
  • শারীরিক ক্ষতির হুমকি — মারধর, অঙ্গহানি।
  • মিথ্যা মামলা ও জেলের হুমকি — সামাজিক ও আইনগত ক্ষতি।
  • সম্পত্তি আটকে রাখা — পাসপোর্ট, ভিসা আটকে রাখা।
  • স্ত্রীর আত্মহত্যার হুমকি — মানসিক চাপ ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা।

ইমাম সারাখসী (রহ.) লিখেন:

"الْإِكْرَاهُ يُؤَثِّرُ فِي الطَّلَاقِ لِأَنَّهُ لَيْسَ مِنْ أَهْلِ الِاخْتِيَارِ" "ইকরাহ তালাককে প্রভাবিত করে, কারণ মুকরাহ ব্যক্তি স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী নয়।" — (আল-মাবসূত, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৪৭)


৩. স্ত্রীর আত্মহত্যার হুমকির প্রভাব

স্ত্রীর আত্মহত্যার হুমকি ইকরাহর একটি অতিরিক্ত দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ:

  • এটি মানসিক চাপ ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে।
  • স্বামী নিজেকে দায়ী মনে করেন এবং ভয় পান।
  • এটি পরোক্ষভাবে তালাক দিতে বাধ্য করার শামিল।

ইমাম কাসানী (রহ.) লিখেন:

"الْإِكْرَاهُ قَدْ يَكُونُ بِالْقَوْلِ وَقَدْ يَكُونُ بِالْفِعْلِ" "ইকরাহ কখনো কথার মাধ্যমে হয়, কখনো কাজের মাধ্যমে হয়।" — (বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৭৫)

তবে মনে রাখবেন, আত্মহত্যা করা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। আপনার স্ত্রীর এই হুমকি দেওয়া উচিত হয়নি। তবে এটি আপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, যা ইকরাহর অন্তর্ভুক্ত।


৪. তালাক কার্যকর না হলে বিবাহ বহাল থাকবে কি?

হ্যাঁ, যদি হানাফী মাযহাব অনুযায়ী তালাক কার্যকর না হয়, তাহলে:

  • আপনার বিবাহ এখনো বহাল আছে।
  • আপনি ও আপনার স্ত্রী এখনো স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হবেন।
  • আপনাদের একসাথে সংসার করা জায়েয।
  • নতুন করে বিবাহ বা হিল্লার প্রয়োজন নেই।

আল্লামা ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেন:

"إِذَا لَمْ يَقَعِ الطَّلَاقُ بَقِيَ النِّكَاحُ عَلَى حَالِهِ" "তালাক পতিত না হলে বিবাহ পূর্বের অবস্থায় বহাল থাকে।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৪৭)


৫. যদি তালাক কার্যকর হয়ে থাকে (মতান্তরে)

যদি কোনো কারণে তালাক কার্যকর হয়েও থাকে (যেমন ইকরাহর শর্ত পূর্ণ না হলে), তাহলে:

তালাকের সংখ্যা

আপনি বলেছেন: "এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক" — এটি একটি বৈঠকে তিন তালাক।

হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, এক বৈঠকে তিন তালাক দিলে তিন তালাকই পতিত হয় এবং তালাক মুগাল্লাযা (চূড়ান্ত তালাক) হয়।

দলিল:

"الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ" "তালাক দুইবার; অতঃপর হয় সংগতভাবে রাখা, নয়তো সদয়ভাবে ছেড়ে দেওয়া।" (সূরা বাকারা: ২২৯)

"فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّىٰ تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ" "অতঃপর যদি সে তাকে তালাক দেয়, তবে সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামী গ্রহণ করে।" (সূরা বাকারা: ২৩০)

পুনরায় একসাথে থাকার পথ

যদি তিন তালাক পতিত হয়ে থাকে, তাহলে:

  1. হিল্লা (বৈধ পুনর্মিলন) প্রয়োজন।
  2. স্ত্রীকে অন্য একজন পুরুষের সাথে স্বাভাবিকভাবে বিবাহ করতে হবে।
  3. সেই বিবাহ প্রকৃত ইচ্ছায় হতে হবে, শর্তসাপেক্ষ বা সাজানো নয়।
  4. সেই স্বামীর সাথে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন যাপন করতে হবে।
  5. যদি সেই স্বামী মারা যান বা তালাক দেন, তাহলে ইদ্দত শেষে প্রথম স্বামীর সাথে নতুন বিবাহ করা যাবে।

আল্লামা ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেন:

"الْحِلَّةُ شَرْطٌ لِحِلِّ الْمُطَلَّقَةِ ثَلَاثًا لِزَوْجِهَا الْأَوَّلِ" "তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হওয়ার শর্ত হলো হিল্লা।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৭০)


৬. তৃতীয় স্বামী হওয়ার বিষয়

আপনার স্ত্রী যদি আপনাকে তৃতীয় বিবাহ করে থাকেন, তাহলে:

হানাফী মাযহাবের হুকুম

  • প্রতিটি বিবাহ আলাদাভাবে বিবেচিত হয়।
  • পূর্বের বিবাহের তালাকের সংখ্যা বর্তমান বিবাহে গণ্য হয় না।
  • বর্তমান স্বামীর দেওয়া তালাকের সংখ্যাই বিবেচ্য।

অর্থাৎ, আপনি তার তৃতীয় স্বামী হলেও, আপনার দেওয়া তালাকের সংখ্যা আলাদাভাবে গণ্য হবে। পূর্বের দুই স্বামীর তালাক আপনার সাথে সম্পর্কিত নয়।

দলিল:

"فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّىٰ تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ" "অতঃপর যদি সে তাকে তালাক দেয়, তবে সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামী গ্রহণ করে।" (সূরা বাকারা: ২৩০)

এই আয়াতে "অন্য স্বামী" বলতে নতুন বিবাহ বোঝানো হয়েছে। প্রতিটি বিবাহ স্বতন্ত্র।

ইমাম সারাখসী (রহ.) লিখেন:

"كُلُّ نِكَاحٍ يُعْتَبَرُ بِنَفْسِهِ فِي حُكْمِ الطَّلَاقِ" "তালাকের হুকুমে প্রতিটি বিবাহ স্বতন্ত্রভাবে বিবেচিত হয়।" — (আল-মাবসূত, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৯২)


সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ

আপনার প্রশ্নের উত্তর:

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. তালাক কার্যকর হয়েছে? | হানাফী মাযহাব অনুযায়ী না, কারণ এটি ইকরাহর মাধ্যমে হয়েছে। | | ২. ইকরাহ হিসেবে গণ্য হবে? | হ্যাঁ, প্রাণনাশ, মারধর, মামলা, জেল, কাগজপত্র আটকে রাখা — সবই ইকরাহর শর্ত পূরণ করে। | | ৩. স্ত্রীর আত্মহত্যার হুমকি বিবেচিত হবে? | হ্যাঁ, এটি অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও ইকরাহর দলিল। | | ৪. বিবাহ বহাল আছে? | হ্যাঁ, তালাক কার্যকর না হলে বিবাহ বহাল। | | ৫. তালাক কার্যকর হলে কতটি? | তিন তালাক (এক বৈঠকে তিন তালাক = তিন তালাক)। পুনর্মিলনের জন্য হিল্লা প্রয়োজন। | | ৬. তৃতীয় স্বামী হওয়ার হুকুম? | প্রতিটি বিবাহ স্বতন্ত্র; বর্তমান তালাকের সংখ্যাই বিবেচ্য। |

গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:

  1. স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতির কাছে সরাসরি যান — আপনার পরিস্থিতি জটিল, তাই সরাসরি পরামর্শ নিন।
  2. ইকরাহর প্রমাণ সংরক্ষণ করুন — হুমকির রেকর্ড, সাক্ষী, পুলিশ রিপোর্ট ইত্যাদি।
  3. আইনগত সহায়তা নিন — হুমকি ও হয়রানির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিন।
  4. ধৈর্য ও দুআ — আল্লাহর কাছে সাহায্য চান, তিনি সর্বোত্তম বিচারক।
  5. স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ — যদি সম্ভব হয়, নিরাপদ পরিবেশে তার সাথে আলোচনা করুন।

দুআ

"رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ" "হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন।" (সূরা বাকারা: ২০১)


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.