জান্নাতে পুরুষদের জন্য কি দুইজন দুনিয়াবি স্ত্রী থাকবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে উল্লিখিত দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ভ্রান্ত। জান্নাতে পুরুষদের জন্য দুনিয়াবি স্ত্রী দু'জন থাকবে—এমন কোনো বিশুদ্ধ দলিল নেই। বরং কুরআন-হাদিসের সুস্পষ্ট বর্ণনা হলো: জান্নাতে প্রত্যেক পুরুষের জন্য হুর থাকবে, আর দুনিয়ার স্ত্রীরা যদি জান্নাতে প্রবেশ করে, তবে তারাই তার স্ত্রী হিসেবে থাকবে—তাদের সংখ্যা দু'জন নয়, বরং যতজন দুনিয়ায় তার স্ত্রী ছিল এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে, সবাই।
১. কুরআনের দলিল
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُّطَهَّرَةٌ ۖ وَهُمْ فِيهَا خَالِدُونَ "আর তাদের জন্য সেখানে থাকবে পবিত্র স্ত্রীগণ, এবং তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে।" — সূরা আল-বাকারা: ২৫
فِيهِنَّ خَيْرَاتٌ حِسَانٌ "সেখানে থাকবে উত্তম ও সুন্দরী নারীরা।" — সূরা আর-রাহমান: ৭০
وَلَهُمْ فِيهَا مَا يَشَاءُونَ خَالِدِينَ "আর তাদের জন্য সেখানে থাকবে যা তারা চাইবে, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে।" — সূরা আল-ফুরকান: ১৬
এসব আয়াতে স্ত্রীর সংখ্যা দুই বলে কোনো সীমা নির্ধারণ করা হয়নি; বরং জান্নাতিরা যা চাইবে তা-ই পাবে।
২. হাদিসের দলিল
(ক) দুনিয়ার স্ত্রীই জান্নাতে স্ত্রী হবে
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
أَيُّمَا امْرَأَةٍ مَاتَتْ وَزَوْجُهَا رَاضٍ عَنْهَا دَخَلَتِ الْجَنَّةَ "যে নারী এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল যে, তার স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট ছিল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।" — সুনানে তিরমিজি: ১১৬১; সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৫৪
আর রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
وَالْمَرْأَةُ إِذَا مَاتَتْ وَزَوْجُهَا رَاضٍ عَنْهَا دَخَلَتِ الْجَنَّةَ — সুনানে তিরমিজি: ১১৬১
অর্থাৎ দুনিয়ার স্ত্রী জান্নাতে প্রবেশ করলে সে-ই তার স্বামীর স্ত্রী হবে। এখানে "দুইজন" হওয়ার কোনো ভিত্তি নেই।
(খ) জান্নাতে হুর থাকবে
كَذَلِكَ وَزَوَّجْنَاهُم بِحُورٍ عِينٍ "এমনই হবে, এবং আমি তাদেরকে ডাগর চোখবিশিষ্ট হুরদের সাথে বিবাহ দান করব।" — সূরা আদ-দুখান: ৫৪
وَحُورٌ عِينٌ • كَأَمْثَالِ اللُّؤْلُؤِ الْمَكْنُونِ "আর থাকবে ডাগর চোখবিশিষ্ট হুর, যারা সংরক্ষিত মুক্তার ন্যায়।" — সূরা আল-ওয়াকিয়া: ২২-২৩
(গ) জান্নাতিরা যা চাইবে তাই পাবে
وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيهِ الْأَنفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ ۖ وَأَنتُمْ فِيهَا خَالِدُونَ "আর সেখানে থাকবে যা মন চায় এবং চোখ যা উপভোগ করে, এবং তোমরা সেখানে চিরস্থায়ী হবে।" — সূরা আয-যুখরুফ: ৭১
৩. "নারীর সংখ্যা বেশি থাকার কারণে দুইজন হবে" — এই দাবির খণ্ডন
এই দাবিটি কোনো কুরআন-হাদিস বা নির্ভরযোগ্য ফিকহের কিতাবের দলিল দ্বারা প্রমাণিত নয়। বরং এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা, যা সম্ভবত কিছু বানোয়াট বা দুর্বল বর্ণনা থেকে ছড়িয়েছে।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) তাঁর বিখ্যাত কিতাব রাদ্দুল মুহতার-এ জান্নাতের বিবরণ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, জান্নাতের নিয়ামতসমূহ এমন যে, জান্নাতিরা যা চাইবে তা-ই পাবে; কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার সীমাবদ্ধতা নেই। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, কিতাবুল জান্নাহ প্রসঙ্গ)
আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) তাঁর তাফসিরে সূরা আর-রাহমানের আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, জান্নাতে হুর ও দুনিয়ার স্ত্রী উভয়ই থাকবে; দুনিয়ার স্ত্রীরা যদি জান্নাতে প্রবেশ করে, তবে তারা হুরদের চেয়ে উত্তম হবে। (তাফসির ইবনে কাসির, সূরা আর-রাহমান: ৭০-এর ব্যাখ্যা)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর মা'আরিফুল কুরআন-এ সূরা আর-রাহমানের আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, জান্নাতে হুর ও দুনিয়ার স্ত্রী উভয়ই থাকবে; তবে দুনিয়ার স্ত্রীরা জান্নাতে প্রবেশ করলে তাদের মর্যাদা হুরদের চেয়ে বেশি হবে। (মা'আরিফুল কুরআন, সূরা আর-রাহমান: ৭০-এর ব্যাখ্যা)
৪. ফিকহি সিদ্ধান্ত
হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো:
- জান্নাতে প্রত্যেক পুরুষের জন্য হুর থাকবে।
- দুনিয়ার স্ত্রী যদি জান্নাতে প্রবেশ করে, তবে সে-ই তার স্বামীর স্ত্রী হবে; এবং সে হুরদের চেয়ে উত্তম হবে।
- জান্নাতে স্ত্রীর সংখ্যা দুই—এটি কোনো বিশুদ্ধ দলিল দ্বারা প্রমাণিত নয়।
- জান্নাতিরা যা চাইবে তা-ই পাবে; আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের নিয়ামতকে কোনো সংখ্যায় সীমাবদ্ধ করেননি।
ইমাম আত-তাহাবি (রহ.) তাঁর আকিদাতুত তাহাবিয়া-তে বলেন, জান্নাতের নিয়ামতসমূহ চিরস্থায়ী এবং তা কোনো সীমা বা সংখ্যার অধীন নয়।
৫. সারসংক্ষেপ
| বিষয় | সঠিক আকিদা | |------|-----------| | জান্নাতে হুর থাকবে? | হ্যাঁ, কুরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত | | দুনিয়ার স্ত্রী জান্নাতে থাকবে? | হ্যাঁ, যদি সে জান্নাতে প্রবেশ করে | | পুরুষের জন্য দুইজন দুনিয়াবি স্ত্রী থাকবে? | ভিত্তিহীন দাবি | | স্ত্রীর সংখ্যা কত হবে? | জান্নাতি যা চাইবে, তা-ই পাবে; কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই |
উপদেশ
প্রশ্নে উল্লিখিত দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কোনো মুসলিমের উচিত নয় এমন দাবি বিশ্বাস করা বা প্রচার করা, যার কোনো দলিল নেই। জান্নাতের প্রকৃত বিবরণ কুরআন-হাদিসে যা এসেছে, তাতেই বিশ্বাস করা কর্তব্য। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে জান্নাতের প্রকৃত নিয়ামত লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب