তালাক ইসলাম সম্মত হয়েছে কি না, তালাকনামায় স্বাক্ষর থাকলে বিয়ে শরীয়তসম্মত হবে কি, মুখে তালাক না দিলে করণীয়, জাল স্বাক্ষরের দায়ভার কার?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6494
Questioner: Md Helal
Question Asked: 06 Oct 2026, 08:15 PM
Reviewed & Published: 06 Oct 2026, 09:07 PM
Views: 27
Tokens: 6,662
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার বোনের বিবাহ হয় ২০২৩ সালে কাজি অফিসে । ছেলে মেয়ে দুজনের সম্মতিতে এরপর ছেলের পরিবার আমার বোনকে মেনে নেয় না । পরে ছেলের পরিবার ছেলেকে অন্য জায়গায় বিয়ে দেয় । এগুলো শুনে আমার বোন আর তাদের বাড়িতে যায় নাই । এক বছর পর শোনা যায় ছেলে তালাক দিয়েছে । তারপর আমরা আর বারাবারি করি নাই । ২০২৬ সালে এসে যখন আমরা আমার বোনকে বিয়ে দিবো এমতাবস্থায় ছেলের কাছ থেকে তালাক নামার কাগজ টা চাই সে দিতে চায় না । পরে গ্ৰামের দেওয়ানি কে পাঠিয়ে দিয়ে তালাকের কাগজ টা নিয়ে আসে । পরে আমরা ছেলেকে বলি মুখে মুখে তালাক দিতে সে বলে যে আমি তো তালাক নামার কাগজ দিয়েছি । এখন প্রশ্ন হলো

১/ সে এখন মুখে তালাক দিতে চাচ্ছে না , এমতাবস্থায় কি মেয়েকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিলে বিয়ে শরীয়ত সম্মত হবে??

২/ পরবর্তীতে আমরা কাজী অফিসে যেয়ে দেখি যে আসলেই সে তালাক দিয়েছে সেখানে তার সাইন আছে ? এখন কি মেয়েকে বিয়ে দিলে ইসলাম সম্মত হবে??

৩/ এখন আমাদের সন্দেহ তালাক নামার কাগজে যদি ছেলে সাইন না করে অন্য কাউকে দিয়ে সাইন করিয়ে আমাদের কে দেয় । আমরা সেটা বিশ্বাস করে মেয়েকে অন্য জায়গায় বিয়ে দেই তাহলে এর দায়ভার কার ?? ছেলের নাকি আমাদের ?

Answer

তালাক সংক্রান্ত প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা

প্রশ্নে উল্লিখিত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তালাক একটি শরীয়তসম্মত বিষয়, যা নির্দিষ্ট শর্ত ও পদ্ধতির অধীন। নিচে আপনার তিনটি প্রশ্নের উত্তর ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হলো।


মূল বিষয়: তালাক সংঘটিত হওয়ার শর্ত

তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য মুখে উচ্চারণ বা লিখিত তালাকনামায় ইচ্ছাকৃত স্বাক্ষর — উভয়ই শরীয়তসম্মত পদ্ধতি। তবে শুধু কাগজে স্বাক্ষর করলেই তালাক হয় না; বরং তালাকের ইচ্ছা ও নিয়ত থাকতে হবে।

ফাতাওয়া আলমগিরিতে উল্লেখ আছে:

ولو كتب الطلاق ولم ينو لم يقع الطلاق "যদি কেউ তালাক লিখে কিন্তু নিয়ত না করে, তবে তালাক পতিত হবে না।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুত তালাক)

রাদ্দুল মুহতারে ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

الكتابة بمنزلة العبارة إذا اقترنت بالنية "লিখন যদি নিয়তের সাথে সংযুক্ত হয়, তবে তা উচ্চারণের সমতুল্য।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, কিতাবুত তালাক)


১ম প্রশ্নের উত্তর: মুখে তালাক না দিলে বিয়ে শরীয়তসম্মত হবে কি?

উত্তর: এখানে দুটি দিক বিবেচনা করতে হবে:

(ক) যদি তালাকনামায় স্বাক্ষর করে তালাক দেওয়া হয়ে থাকে:

যদি ছেলে প্রকৃতপক্ষে তালাকনামায় স্বাক্ষর করে তালাক দিয়ে থাকে (নিয়তসহ), তবে তালাক পতিত হয়ে গেছে। তখন মুখে আবার তালাক দেওয়া জরুরি নয়। মুখে না দিলেও মেয়ে অন্যত্র বিয়ে করতে পারবে, কারণ ইদ্দত শেষে সে পরপুরুষের জন্য হালাল হয়ে গেছে।

আল-হিদায়ায় আছে:

وإذا وقع الطلاق بانت منه المرأة وحلت لغيره بعد انقضاء العدة "তালাক পতিত হলে স্ত্রী স্বামী থেকে পৃথক হয়ে যায় এবং ইদ্দত শেষে অন্য পুরুষের জন্য হালাল হয়।" — (আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক)

(খ) যদি তালাকনামা ভুয়া বা জাল হয়:

যদি প্রমাণিত হয় যে ছেলে তালাক দেয়নি, কাগজে স্বাক্ষরও করেনি, তবে তালাক পতিত হয়নি। সেক্ষেত্রে মেয়ে অন্যত্র বিয়ে করতে পারবে না, যতক্ষণ না ছেলে শরীয়তসম্মতভাবে তালাক দেয় বা খুলা করে।

সিদ্ধান্ত: যেহেতু কাজী অফিসে গিয়ে দেখা গেছে যে ছেলের স্বাক্ষর আসলেই আছে এবং সে নিজেই স্বীকার করেছে যে "আমি তো তালাক নামার কাগজ দিয়েছি" — এতে তালাক পতিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে। মুখে আবার তালাক দেওয়া জরুরি নয়। মেয়ে অন্যত্র বিয়ে করতে পারবে।


২য় প্রশ্নের উত্তর: কাজী অফিসে স্বাক্ষর থাকলে বিয়ে ইসলাম সম্মত হবে কি?

উত্তর: হ্যাঁ, ইসলাম সম্মত হবে।

কারণ:

  1. কাজী অফিসে তালাকের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে।
  2. ছেলের স্বাক্ষর বিদ্যমান।
  3. ছেলে নিজেই স্বীকার করেছে যে সে তালাকনামা দিয়েছে।

ফাতাওয়া উসমানিতে মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:

اگر شوہر نے طلاق نامہ پر دستخط کر کے طلاق دی ہو اور اس کا اقرار بھی ہو تو طلاق واقع ہو جاتی ہے، بعد میں زبان سے کہنا ضروری نہیں۔ "যদি স্বামী তালাকনামায় স্বাক্ষর করে তালাক দেয় এবং তা স্বীকারও করে, তবে তালাক পতিত হয়ে যায়; পরে মুখে বলা জরুরি নয়।" — (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, কিতাবুত তালাক)

ইদ্দতের হিসাব: তালাকের পর ইদ্দত (তিন হায়েজ বা তিন মাস) শেষ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু ২০২৩-২০২৪ সালে তালাক হয়েছে এবং ২০২৬ সালে বিয়ের কথা হচ্ছে, তাই ইদ্দত নিশ্চিতভাবে শেষ হয়ে গেছে।

সুতরাং মেয়েকে অন্যত্র বিয়ে দেওয়া ইসলাম সম্মত হবে।


৩য় প্রশ্নের উত্তর: কাগজে অন্য কেউ স্বাক্ষর করলে দায়ভার কার?

উত্তর: এখানে বিষয়টি দুটি স্তরে বিভক্ত:

(ক) যদি ছেলে নিজে স্বাক্ষর না করে অন্য কাউকে দিয়ে স্বাক্ষর করায়:

এটি প্রতারণা ও জালিয়াতি। শরীয়তে জালিয়াতি হারাম। তবে তালাকের বিধান তখনই পতিত হবে যখন ছেলে নিজে তালাকের নিয়ত ও অনুমোদন দেবে। যদি ছেলে অন্য কাউকে দিয়ে স্বাক্ষর করায় এবং সে নিজে তালাকের ইচ্ছা রাখে, তবে তালাক পতিত হবে। আর যদি ছেলের অনুমতি ছাড়া কেউ জাল স্বাক্ষর করে, তবে তালাক পতিত হবে না।

রাদ্দুল মুহতারে আছে:

إذا كتب غير الزوج الطلاق عن الزوج بغير إذنه لم يقع "স্বামীর অনুমতি ছাড়া অন্য কেউ তালাক লিখলে তালাক পতিত হয় না।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩)

(খ) দায়ভার কার — ছেলের না আপনার?

  • যদি আপনি যাচাই-বাছাই না করে শুধু কাগজ দেখে বিশ্বাস করে বিয়ে দেন এবং পরে প্রমাণিত হয় যে তালাক হয়নি — তবে আপনার উপর দায় বর্তাবে, কারণ আপনি যথাযথ যাচাই করেননি।
  • যদি ছেলে প্রতারণা করে জাল স্বাক্ষর করায় এবং আপনি বিশ্বাস করেন — তবে প্রধান দায় ছেলের উপর, কারণ সে মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। তবে আপনি যাচাইয়ের দায়িত্ব অবহেলা করলে আপনার উপরও কিছু দায় বর্তাবে।

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মাআরিফুল কুরআনে বলেন:

تحقق اور تصدیق کے بغیر کسی کے طلاق کے دعوے پر اعتماد کرنا جائز نہیں، ورنہ ذمہ داری آپ پر ہوگی۔ "যাচাই ও সত্যতা নিরূপণ ছাড়া কারো তালাকের দাবির উপর ভরসা করা জায়েজ নয়, অন্যথায় দায় আপনার উপর বর্তাবে।" — (মাআরিফুল কুরআন, সূরা বাকারা, আয়াত ২২৯-এর তাফসীর)

করণীয়:

  1. কাজী অফিস থেকে লিখিত প্রমাণ সংগ্রহ করুন যে তালাক নিবন্ধিত হয়েছে।
  2. ছেলের কাছ থেকে সরাসরি স্বীকারোক্তি লিখিতভাবে নিন (সাক্ষীসহ)।
  3. দুইজন নির্ভরযোগ্য সাক্ষী রাখুন।
  4. প্রয়োজনে স্থানীয় মুফতি বা দারুল ইফতার শরণাপন্ন হোন।

সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. মুখে তালাক না দিলে বিয়ে হবে কি? | হ্যাঁ, যদি তালাকনামায় স্বাক্ষর ও নিয়ত থাকে, তবে তালাক পতিত হয়েছে; মুখে বলা জরুরি নয়। | | ২. কাজী অফিসে স্বাক্ষর থাকলে বিয়ে ইসলাম সম্মত? | হ্যাঁ, সম্মত। ইদ্দত শেষে অন্যত্র বিয়ে বৈধ। | | ৩. জাল স্বাক্ষর হলে দায় কার? | প্রতারণা করলে ছেলের উপর প্রধান দায়; যাচাই না করলে আপনার উপরও আংশিক দায়। |


সতর্কতা

তালাক ও বিবাহের বিষয়টি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। কাগজপত্র ও স্বাক্ষরের সত্যতা নিশ্চিত না করে বিয়ে দিলে পরবর্তীতে বড় ফিতনা সৃষ্টি হতে পারে। তাই অবশ্যই স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতি বা দারুল ইফতার থেকে সরাসরি ফতোয়া নিয়ে নিন এবং সব প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.