ইস্তিখারার পর খারাপ স্বপ্ন, জ্বিন, রক্ত, লাশ বা নাপাক স্বপ্ন দেখলে কী করবো?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
প্রথমবার ঐ ব্যক্তির জন্য যখন ইস্তিখারা করি, তখন স্বপ্নে কিছু না বুঝলেও বাস্তবে খুবই প্রশান্ত লাগছিলএরপর নানান সমস্যা হয়, ওদিক থেকে এগোবে, এগোবেনা এমন, ওনার ইস্তিখারায় উনি কনফিউজড, তাই না করে দেয়।
এজন্য ৭/৮ বার ইস্তিখারা করি।
আমি ৪ বারের সময়ই দেখি ওনার কিছু রিসপন্ডস।
৮বারের মধ্যে একবার দেখেছি,আমি ওয়াশরুমে যাচ্ছি পানি নিয়ে,গ্রামের ওয়াশরুমে।
আরেকবার জ্বিনঘটিত ভয়,যে,আমার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে।
এর মধ্যেই এক বিকেলে দেখি, আমার কানের কাছে সামনের ব্যক্তির জ্বিন প্রবেশ করেছে, আর বলছে যে, দেখো তোমার পিছনে,দেখো ও দাড়ায় আছে,মানে কোনো খারাপ কিছু!
আমি তাকাইনি।
তবে এতো কাছে,খুবই ভয় পাই।
ঘুম ভাঙতেই মনে হচ্ছিল এখনও আমার ঘাড়ের কাছে সেই অনুভূতি।
তবে প্রত্যেক ইস্তিখারার পর-ই আমি স্বাভাবিক ই ছিলাম, কোনো নেগেটিভ ফিলিং আসেনি। বরং মনে হয়েছে সে ফিরবে আর এখানে হবে।
ইস্তিখারা অফ রাখি,এরপর একদিন দেখি। কোনো এক বাসায় কাউকে পারিবারিকভাবে খুঁজছি। এরই মধ্যে একটা ডাস্টবিনে চোখ পড়লো। ঐখান থেকে কীভাবে হঠাৎ রক্তমাখা জড়ায়ু থলি আমার হাতে এসে থাবা দিয়ে আটকে থাকে,আমি প্রচণ্ড ভয় পাই এবং শুনি যে ঐখানে কোনো মহিলার লাশ আছে। এরপর আমি ঝাড়া দিই,হাতে রক্ত লেগে থাকে। আমি অনুভব করতে পারছিলাম থলি টা। মা পাশে ছিল দাড়ানো আর চাচি সিড়ির উপরের দিকে বসে। এরপর দেখি আমার চাচী বলছে,হাত ধুয়ে আসো মীম, গম্ভীর আওয়াজে। মনে হচ্ছিল, উনি বুঝাচ্ছেন এটা খারাপ,আমার ক্ষতিরক কিছু এবং ঘুৃম ভেঙে যায়।
তবে গতকাল তিনি যোগাযোগ করেন,এবং আমি আবারও ইস্তিখারা করি। এবার স্বপ্নে দেখি,আমি কাম নিবৃত্তি করছি বাজেভাবে, নিজে থেকে। এবং তৃপ্তি বিষয়ক বাজে স্বপ্ন।
ঘুমে আমার শরীরও সেনসিটিভ ফিল হচ্ছিল।
তবে এসবের মানে কী!
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
ইস্তিখারার মূল ভিত্তি স্বপ্ন নয়; বরং আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা, পরামর্শ করা এবং অন্তরে প্রশান্তি বা অনীহা অনুভব করা। স্বপ্নে দেখা বিষয়গুলো শরীয়তের দলিল নয়। বিশেষ করে আপনার বর্ণিত স্বপ্নগুলো—জ্বিন, রক্ত, লাশ, নাপাক বা অশ্লীল দৃশ্য—এসব শয়তানি খোয়াব বা মনের চাপ, ভয়, দুশ্চিন্তা ও শারীরিক অবস্থার প্রভাব হতে পারে। এগুলোকে বিয়ের পক্ষে-বিপক্ষে চূড়ান্ত ইশারা হিসেবে ধরা যাবে না। বিয়ের সিদ্ধান্তের জন্য ইস্তিখারার সাথে সাথে দ্বীনদারি, চরিত্র, সামর্থ্য, পারিবারিক সম্মতি, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও অভিভাবকদের পরামর্শকে প্রধান মানদণ্ড বানাতে হবে।
বিস্তারিত:
১. ইস্তিখারা কী এবং এর সঠিক পদ্ধতি
ইস্তিখারা অর্থ আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া। নবী ﷺ থেকে শেখানো ইস্তিখারার দুআ হলো:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ، وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيمِ...
(সহিহ বুখারি: ১১৬৬)
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমি আপনার জ্ঞানের মাধ্যমে কল্যাণ চাই, আপনার কুদরতের মাধ্যমে সামর্থ্য চাই এবং আপনার মহান অনুগ্রহ প্রার্থনা করি...”
ইস্তিখারার পর:
- যে দিকটি দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য কল্যাণকর হয়, আল্লাহ তা সহজ করে দেন।
- অন্তরে সে বিষয়ে প্রশান্তি বা অনীহা সৃষ্টি হতে পারে।
- স্বপ্ন দেখা শর্ত নয়; স্বপ্ন ইস্তিখারার দলিলও নয়।
ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে স্পষ্ট আছে, ইস্তিখারার ক্ষেত্রে স্বপ্নের উপর নির্ভর করা ঠিক নয়; বরং দুআর পর অন্তরের ঝোঁক, সহজতা এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শকে দেখা হবে।
২. স্বপ্নের শরয়ি অবস্থান
স্বপ্ন তিন প্রকার:
- রহমানি স্বপ্ন — সুসংবাদ বা সতর্কতা।
- শয়তানি স্বপ্ন — ভয়, দুঃস্বপ্ন, নাপাক দৃশ্য।
- নফসানি স্বপ্ন — মনের দুশ্চিন্তা, চাপ, চিন্তা, শারীরিক অবস্থা।
আপনার বর্ণনায়:
- জ্বিন, রক্ত, লাশ, ভয় — এগুলো শয়তানি বা নফসানি খোয়াব হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
- নাপাক/অশ্লীল স্বপ্ন এবং শরীর সেনসিটিভ হওয়া — এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা, মনের চাপ বা শারীরিক কারণ হতে পারে।
- ইস্তিখারার পর নেগেটিভ ফিলিং না আসা এবং মনে হওয়া “সে ফিরবে” — এটি ইস্তিখারার শরয়ি আলামত হিসেবে যথেষ্ট নয়; বরং এটি আপনার নিজের আশা বা আবেগও হতে পারে।
রাসূল ﷺ বলেছেন:
الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللَّهِ، وَالْحُلْمُ مِنَ الشَّيْطَانِ
(সহিহ বুখারি: ৬৯৯০)
অর্থ: “সৎ স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর দুঃস্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে।”
খারাপ স্বপ্ন দেখলে:
- বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলা,
- শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া,
- যে পাশে ছিলে সেদিক পরিবর্তন করা,
- কারও কাছে না বলা।
(সহিহ মুসলিম: ২২৬২)
৩. বিয়ের সিদ্ধান্তে করণীয়
বিয়ে শুধু স্বপ্নের ভিত্তিতে করা বা না করা উচিত নয়। বরং দেখুন:
- পাত্র/পাত্রীর দ্বীনদারি ও চরিত্র।
- পারিবারিক অবস্থা ও সম্মতি।
- পারস্পরিক বোঝাপড়া।
- আর্থিক ও সামাজিক সামর্থ্য।
- অভিভাবক ও বিশ্বস্ত মানুষের পরামর্শ।
- ইস্তিখারার দুআ করার পর অন্তরের সহজতা বা অনীহা।
যদি বারবার দ্বিধা, ভয়, অস্থিরতা ও খারাপ স্বপ্ন আসে, তাহলে শুধু স্বপ্নকে দোষারোপ না করে বাস্তব বিষয়গুলো যাচাই করুন। প্রয়োজনে অভিভাবকদের সাথে বসে সিদ্ধান্ত নিন। আর যদি সম্পর্কে দ্বীনি বা চারিত্রিক আপত্তি থাকে, তাহলে সেটাই বড় কারণ।
৪. আপনার স্বপ্নগুলোর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা
- ওয়াশরুম, পানি, গ্রামের ওয়াশরুম: সাধারণত মনের চাপ, পবিত্রতা নিয়ে দুশ্চিন্তা বা শারীরিক অবস্থার প্রতিফলন।
- জ্বিন প্রবেশ, ভয়: শয়তানি ওয়াসওয়াসা; ইস্তিখারার সাথে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই।
- রক্তমাখা জড়ায়ু থলি, লাশ: ভয় ও দুশ্চিন্তার প্রতিচ্ছবি; বিয়ের বিপক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
- নাপাক/অশ্লীল স্বপ্ন: শয়তানি বা শারীরিক; এ থেকে ইস্তিখারার সিদ্ধান্ত নেওয়া ভুল।
৫. করণীয়
- ইস্তিখারার দুআ চালিয়ে যান, তবে স্বপ্নকে চূড়ান্ত মানদণ্ড বানাবেন না।
- খারাপ স্বপ্ন দেখলে রাসূল ﷺ-এর শেখানো পদ্ধতি অনুসরণ করুন।
- বিয়ের বিষয়ে অভিভাবক ও দ্বীনদার বিশ্বস্ত মানুষের পরামর্শ নিন।
- পাত্র সম্পর্কে বাস্তব তথ্য যাচাই করুন—দ্বীন, চরিত্র, পরিবার, আচরণ।
- যদি বারবার ভয় ও অস্থিরতা হয়, তাহলে নিজের মানসিক শান্তির জন্য দুআ, কুরআন তিলাওয়াত, আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক-নাস পড়ুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- কোনো আমল বা স্বপ্নের ভিত্তিতে বিয়ে ঠিক বা বাতিল করবেন না; বরং শরীয়তের মানদণ্ড ও পরামর্শকে প্রাধান্য দিন।
মনে রাখবেন: ইস্তিখারা হলো আল্লাহর কাছে কল্যাণকর সিদ্ধান্ত চাওয়া, স্বপ্ন দেখা নয়। আপনার স্বপ্নগুলো ভয়, চাপ ও শয়তানি প্রভাবের কারণে হতে পারে। তাই এগুলোকে বিয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বানানো ঠিক হবে না। দ্বীনদারি, চরিত্র, সম্মতি ও পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিন; আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।