মৌখিক ইজাব-কবুল ছাড়া শুধু কাগজে স্বাক্ষরের হুকুম।

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6469
Questioner: Ibrahim
Question Asked: 06 Oct 2026, 12:53 PM
Reviewed & Published: 06 Oct 2026, 02:21 PM
Views: 17
Tokens: 8,707
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে ও মেয়ে কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সাক্ষীর সামনে একটি কাগজে “স্বামী” ও “স্ত্রী” লেখা স্থানে নিজেদের নাম লিখে স্বাক্ষর করে। প্রথমে ছেলে স্বাক্ষর করে, এরপর মেয়েকে বলে: “এখানে আসো, সাইন করো।” মেয়ে এসে স্বাক্ষর করে।

উভয়ের মনে বিবাহের নিয়ত ছিল এবং নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার উদ্দেশ্যেই কাগজে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু মুখে “আমি তোমাকে বিবাহ করলাম”, “আমি কবুল করলাম” বা এ ধরনের কোনো ইজাব-কবুলের বাক্য বলা হয়নি। ছেলে নিশ্চিত যে সে মেয়েকে মৌখিকভাবে বিয়ের প্রস্তাব দেয়নি; শুধু কাগজে সই করতে বলেছে। মেয়েও নিশ্চিত যে কোনো মৌখিক ইজাব-কবুল হয়নি।

পরবর্তীতে তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সহবাসও করেছে।

এখন প্রশ্ন:

১. উপরোক্ত পদ্ধতিতে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী তাদের নিকাহ সহিহভাবে সংঘটিত হয়েছিল কি না?

২. “স্বামী” ও “স্ত্রী” ঘরে নিজেদের নাম লেখা, উভয়ের স্বাক্ষর, বিবাহের নিয়ত এবং সাক্ষীদের উপস্থিতির মাধ্যমে কি মৌখিক ইজাব-কবুল ছাড়াই নিকাহ হয়ে যায়?

৩. পরবর্তীতে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সহবাস করার কারণে কি নিকাহের হুকুমে কোনো পরিবর্তন হবে?

৪. বর্তমানে মেয়েটির অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করা কি জায়েয হবে?

৫. অন্যত্র নিকাহ করার আগে কি প্রথম ছেলের কাছ থেকে তালাক নেওয়া বাধ্যতামূলক?

দয়া করে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী সমাধান দেবেন।

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

Answer

বিবাহের হুকুম: মৌখিক ইজাব-কবুল ছাড়া শুধু কাগজে স্বাক্ষরের বিধান

উত্তর (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)

بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، أما بعد

মূলনীতি: নিকাহর রুকন কী?

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী নিকাহ সংঘটিত হওয়ার জন্য দুটি রুকন (মৌলিক উপাদান) অপরিহার্য:

১. ইজাব (প্রস্তাব) — পাত্রপক্ষের পক্ষ থেকে বিবাহের প্রস্তাব। ২. কবুল (গ্রহণ) — পাত্রীপক্ষের পক্ষ থেকে তা গ্রহণ।

এই ইজাব-কবুল মৌখিকভাবে (বা অন্ততপক্ষে এমন শব্দ/ইশারা দ্বারা যা স্পষ্টভাবে বিবাহকে বোঝায়) হতে হবে এবং একই মজলিসে (একই বৈঠকে) দুই পক্ষের মধ্যে সম্পন্ন হতে হবে।

দলিল:

আল্লাহ তাআলা বলেন:

«فَانكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ» "তোমরা তাদের বিবাহ করো তাদের অভিভাবকদের অনুমতিক্রমে।" (সূরা নিসা: ২৫)

আরও ইরশাদ:

«وَأَنكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنكُمْ» "তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত তাদের বিবাহ দাও।" (সূরা নূর: ৩২)

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

«لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَيْنِ» "অভিভাবক ও দুইজন সাক্ষী ছাড়া কোনো নিকাহ নেই।" (সুনানে তিরমিজি: ১১০১, সুনানে আবু দাউদ: ২০৮৫)

হানাফি ফিকহের মূল গ্রন্থে বর্ণিত:

ইমাম মারগিনানি (রহ.) বলেন:

"النكاح ينعقد بالإيجاب والقبول؛ لأن الإيجاب والقبول هما الركنان في سائر العقود" "নিকাহ ইজাব ও কবুল দ্বারা সংঘটিত হয়; কারণ ইজাব ও কবুলই সকল চুক্তির রুকন।" (আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ)

ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) বলেন:

"الإيجاب والقبول شرطان في انعقاد النكاح، ولا ينعقد بدونهما بالإجماع" "ইজাব ও কবুল নিকাহ সংঘটনের শর্ত; এগুলো ছাড়া নিকাহ সংঘটিত হয় না — এ বিষয়ে ইজমা (ঐকমত্য) রয়েছে।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৯)


প্রশ্ন ১: উপরোক্ত পদ্ধতিতে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী তাদের নিকাহ সহিহভাবে সংঘটিত হয়েছিল কি?

উত্তর: না। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী উক্ত পদ্ধতিতে নিকাহ সহিহভাবে সংঘটিত হয়নি।

কারণ:

  • নিকাহর জন্য মৌখিক ইজাব-কবুল বা স্পষ্ট শব্দ/ইশারা অপরিহার্য।
  • শুধু কাগজে "স্বামী" ও "স্ত্রী" লেখা স্থানে নাম লিখে স্বাক্ষর করা — এটি ইজাব-কবুলের স্পষ্ট বাক্য নয়।
  • ছেলে মেয়েকে "এখানে আসো, সাইন করো" বলেছে — এটি বিবাহের প্রস্তাব (ইজাব) নয়; বরং কাগজে সই করার নির্দেশ।
  • মেয়ে এসে সই করেছে — এটি কবুলের স্পষ্ট ঘোষণা নয়।
  • উভয়ের মনে বিবাহের নিয়ত ছিল — কিন্তু নিয়ত একা যথেষ্ট নয়; মুখে বা স্পষ্ট ইশারায় ইজাব-কবুল প্রকাশ করা আবশ্যক।

ফিকহি ব্যাখ্যা:

ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

"لا يكفي مجرد النية في انعقاد النكاح، بل لا بد من التلفظ بالإيجاب والقبول أو ما يقوم مقامهما من الكتابة أو الإشارة المفهمة" "নিকাহ সংঘটনে শুধু নিয়ত যথেষ্ট নয়; বরং ইজাব-কবুল উচ্চারণ করা বা তাের সমতুল্য লিখন বা বোধগম্য ইশারা আবশ্যক।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ১০)

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: যদি কাগজে লেখা স্বাক্ষরকে লিখিত ইজাব-কবুল হিসেবে গণ্য করা যায় — অর্থাৎ কাগজে স্পষ্টভাবে বিবাহের শব্দ লেখা থাকে এবং উভয়ে তা পড়ে/জেনে স্বাক্ষর করে — তাহলে হানাফি মাযহাবের কিছু ফকিহ লিখিত ইজাব-কবুলকে বৈধ বলেছেন। কিন্তু প্রশ্নে উল্লেখ আছে যে শুধু "স্বামী" ও "স্ত্রী" লেখা স্থানে নাম লেখা হয়েছে — এতে বিবাহের স্পষ্ট ইজাব-কবুলের বাক্য নেই। তাই নিকাহ সংঘটিত হয়নি।


প্রশ্ন ২: "স্বামী" ও "স্ত্রী" ঘরে নিজেদের নাম লেখা, উভয়ের স্বাক্ষর, বিবাহের নিয়ত এবং সাক্ষীদের উপস্থিতির মাধ্যমে কি মৌখিক ইজাব-কবুল ছাড়াই নিকাহ হয়ে যায়?

উত্তর: না। মৌখিক ইজাব-কবুল (বা তার সমতুল্য স্পষ্ট লিখন/ইশারা) ছাড়া নিকাহ হয় না।

দলিল:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

«إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ» "নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।" (সহিহ বুখারি: ১)

কিন্তু এই হাদিসটি ইবাদতের ক্ষেত্রে নিয়তের গুরুত্ব বোঝায় — চুক্তি সংঘটনের ক্ষেত্রে নিয়ত একা যথেষ্ট নয়; বরং ইজাব-কবুলের প্রকাশ আবশ্যক।

হানাফি ফকিহদের বক্তব্য:

ইমাম সারাখসি (রহ.) বলেন:

"النكاح لا ينعقد بمجرد التراضي من غير إيجاب وقبول؛ لأنه عقد يحتاج إلى الإيجاب والقبول كسائر العقود" "নিকাহ শুধু পারস্পরিক সম্মতিতে ইজাব-কবুল ছাড়া সংঘটিত হয় না; কারণ এটি একটি চুক্তি, যা অন্যান্য চুক্তির মতো ইজাব-কবুলের মুখাপেক্ষী।" (আল-মাবসুত, খণ্ড ৫, পৃ. ৯)

সাক্ষীদের উপস্থিতি: সাক্ষী থাকা নিকাহর শর্ত (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী ওয়াজিব/ফরজ পর্যায়ের), কিন্তু সাক্ষী থাকলেই ইজাব-কবুল ছাড়া নিকাহ হয় না। সাক্ষীরা ইজাব-কবুলের সাক্ষী হন — যদি ইজাব-কবুলই না হয়, তবে তারা কীসের সাক্ষী হবেন?

সুতরাং: "স্বামী" ও "স্ত্রী" লেখা, স্বাক্ষর, নিয়ত ও সাক্ষীর উপস্থিতি — এগুলো সব মিলেও মৌখিক ইজাব-কবুল ছাড়া নিকাহ সংঘটিত হয় না।


প্রশ্ন ৩: পরবর্তীতে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সহবাস করার কারণে কি নিকাহের হুকুমে কোনো পরিবর্তন হবে?

উত্তর: না। সহবাস করার কারণে নিকাহ সহিহ হয়ে যায় না।

কারণ:

  • নিকাহ সংঘটিত হওয়ার শর্ত হলো ইজাব-কবুল — যা এখানে অনুপস্থিত।
  • সহবাস নিকাহর ফলাফল — কারণ নয়। অর্থাৎ নিকাহ সহিহ হলে সহবাস হালাল হয়; কিন্তু সহবাস করলেই নিকাহ সহিহ হয়ে যায় না।
  • এখানে যে সহবাস হয়েছে, তা যিনা (ব্যভিচার) হিসেবে গণ্য হবে — কারণ তারা শরিয়তসম্মত স্বামী-স্ত্রী নয়।

দলিল:

আল্লাহ তাআলা বলেন:

«وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا» "তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।" (সূরা বনী ইসরাইল: ৩২)

«الزَّانِي لَا يَنكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَالزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ» "ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারিণী বা মুশরিকা নারীকেই বিবাহ করে..." (সূরা নূর: ৩)

ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

"الوطء لا يصير عقدًا، ولا ينعقد النكاح بالوطء بالإجماع" "সহবাস চুক্তি হয়ে যায় না, এবং সহবাস দ্বারা নিকাহ সংঘটিত হয় না — এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৪)

তবে করণীয়: যেহেতু তারা উভয়ে বিবাহের নিয়তে এই কাজ করেছে এবং এখন স্বামী-স্ত্রী হিসেবে থাকতে চায়, তাই তাদের এখনই শরিয়তসম্মতভাবে নিকাহ সম্পন্ন করা আবশ্যক — সঠিক পদ্ধতিতে (ইজাব-কবুল, অভিভাবক, দুইজন সাক্ষীসহ)। আর যেহেতু ইতিমধ্যে সহবাস হয়ে গেছে, তাই তাওবা-ইস্তিগফার করাও জরুরি।


প্রশ্ন ৪: বর্তমানে মেয়েটির অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করা কি জায়েয হবে?

উত্তর: যেহেতু প্রথম নিকাহ সহিহভাবে সংঘটিত হয়নি, তাই মেয়েটি প্রথম ছেলের স্ত্রী নয়। সুতরাং তার জন্য অন্য কোনো পুরুষকে শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে বিবাহ করা জায়েয।


প্রশ্ন ৫: অন্যত্র নিকাহ করার আগে কি প্রথম ছেলের কাছ থেকে তালাক নেওয়া বাধ্যতামূলক?

উত্তর: না। যেহেতু প্রথম নিকাহ সহিহভাবে সংঘটিত হয়নি, তাই তালাকের প্রয়োজন নেই। তালাক কেবল সহিহ নিকাহর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

তবে:

  • যদি কোনো কারণে (যেমন: লিখিত ইজাব-কবুলকে কেউ বৈধ মনে করে) নিকাহ সহিহ বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে তালাক আবশ্যক হবে।
  • কিন্তু হানাফি মাযহাবের স্পষ্ট অবস্থান হলো: মৌখিক ইজাব-কবুল ছাড়া নিকাহ হয় না — তাই এখানে তালাকের প্রশ্নই ওঠে না।
  • তবে ইদ্দত পালন করা আবশ্যক — যা উপরে বর্ণিত হয়েছে।

ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

"الطلاق لا يقع إلا في نكاح صحيح، فإذا لم يكن النكاح صحيحًا لا يقع الطلاق" "তালাক কেবল সহিহ নিকাহতে পতিত হয়; যদি নিকাহ সহিহ না হয়, তবে তালাক পতিত হয় না।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৩০)


সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. নিকাহ সহিহ হয়েছে কি? | না — মৌখিক ইজাব-কবুল ছাড়া নিকাহ হয়নি। | | ২. কাগজে স্বাক্ষর, নিয়ত, সাক্ষী দ্বারা নিকাহ হয় কি? | না — ইজাব-কবুল অপরিহার্য। | | ৩. সহবাসের কারণে পরিবর্তন হবে কি? | না — সহবাস নিকাহর কারণ নয়; এটি যিনা হিসেবে গণ্য। | | ৪. মেয়েটির অন্য পুরুষকে বিবাহ করা যাবে কি? | হ্যাঁ । | | ৫. তালাক নেওয়া বাধ্যতামূলক কি? | না — নিকাহ সহিহ না হওয়ায় তালাকের প্রশ্ন নেই; তবে ইদ্দত আবশ্যক। |


করণীয়

১. তাওবা-ইস্তিগফার: যেহেতু নিকাহ ছাড়া সহবাস হয়েছে, তাই উভয়ের জন্য আন্তরিক তাওবা করা আবশ্যক।

২. শরিয়তসম্মত নিকাহ: যদি তারা এখনও একসাথে থাকতে চায়, তবে অভিভাবকের অনুমতি, দুইজন মুসলিম সাক্ষীর উপস্থিতিতে স্পষ্ট ইজাব-কবুলের মাধ্যমে নিকাহ সম্পন্ন করতে হবে।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.