তালাক হয়েছে কি না? স্বামী তিনবার তালাক দিলে কী হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
উল্লেখ্য, আমার বিয়ে যখন হয় তখন আমি অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ি এবং সন্তানসম্ভবা যখন হই তখন মাস্টার্সে পড়ি। যেহেতু পড়ালেখার জন্য আমাকে স্বামী থেকে দূরে থাকতে হতো, আমি আমার স্বামীকে বলিযে সে চাইলে আমি পড়ালেখা বাদ দিয়ে তার কাছেই থাকবো তাকে সংশোধন হতে সাহায্য করবো। কিন্তু যেহেতু আমার বাবা ও শ্বশুর চাইতেন আমি পড়ালেখা করে চাকরি করি, তাই আমার স্বামী তাদের ভয়ে আমাকে পড়ালেখা বাদ দিতে দিতেন না।
সন্তানসম্ভবা হওয়ার জন্য আমার শারীরিক সমস্যার জন্য আমি বাবার বাসায় যাই। এর মাঝে সেই অবৈধ সম্পর্ক কে কেন্দ্র করে আমাদের অশান্তি মাঝে মাঝে চলতো, আর তিনি নিজেকে পরিবর্তন করার কথা মুখে বললেও আমার আড়ালে সেই ধর্ম বোনের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। আমি বাধা দিতাম, বুঝাতাম সেটা তিনি পছন্দ করতেন না। পরে তিনি আমাকে আবার ১ তালাক দেন। পরে সন্তান হয়, এর পাশাপাশি আরও অনেক অশান্তি হয়। ফলে একসময় প্রায় কয়েক মাস আমার স্বামীর সাথে আমার যোগাযোগ বন্ধ ছিলো, যেহেতু তিনি নিজেকে সংশোধন করছিলেন না, আর আমি এত মানসিক কষ্ট সহ্য করতে পারছিলাম না, পরে আমিও মনের কষ্টে তার সাথে অনেকদিন যোগাযোগ বন্ধ করে দেই। বাবা মাকে বলি সংসার না রাখার জন্য। বাবা মা ধৈর্য ধরতে বলেন। এর মাঝে কয়েক মাস পর পর তিনি বা আমি মাঝেমাঝে যোগাযোগ করতাম আমরা। পরে একসময় তিনি মাফ চেয়ে বলেন আর ভুল করবেন না। পরে আমি সন্তান নিয়ে আমার সংসারে যাই। কিছুদিন সংসার করতে গিয়ে আবার বুঝতে পারি সে তার ধর্ম বোনের সাথে প্রায়ই আমার আড়ালে যোগাযোগ করেন। পরে আমি বাবার বাসায় আসলে এসব কথায় তিনি ফোনে আমাকে মুখে মুখে বলেন তোকে আমি ১ ২ ৩ তালাকে বায়েন তালাক দিলাম। আমি বাসায় জানালে কেউ বিষয়টাকে গুরুত্ব না দিয়ে বলেন ধৈর্য ধরতে। পরে আমি আবার সংসারে ফেরত যাই। কিন্তু আমার স্বামীর আচার আচরণ নোংরা কথার জন্য বাবার বাসায় আলে আসি এবং বলেছি আর সংসার করবো না। তবু আমার বাবা মা আইনগতভাবে তালাকের কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। তাই আমি জানতে চাই ধর্মীয় ভাবে আমাদের তালাক হয়েছে কিনা?
(গুছিয়ে লিখতে না পারার জন্য আফওয়ান)
Answer
তালাক হয়েছে কি না? — একটি ফিকহি বিশ্লেষণ
উত্তর (সংক্ষেপে):
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী আপনার স্বামী আপনাকে মোট তিনবার তালাক দিয়েছেন:
- প্রথম তালাক — শ্বশুরের বকুনির কারণে রাগে।
- দ্বিতীয় তালাক — ধর্মবোনের সাথে যোগাযোগ নিয়ে ঝগড়ার পর।
- তৃতীয় তালাক — ফোনে স্পষ্টভাবে বলেছেন: "তোকে আমি ১ ২ ৩ তালাকে বায়েন তালাক দিলাম।"
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, তিন তালাক সংঘটিত হয়ে গেছে এবং আপনার স্বামীর সাথে আপনার বিবাহ সম্পূর্ণরূপে ভেঙে গেছে (তালাকে মুগাল্লাযা)। এখন তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য হিলালা ছাড়া কোনো পথ নেই। অর্থাৎ, আপনি অন্য কোনো পুরুষকে শরীয়তসম্মতভাবে বিয়ে করে সেই সংসার স্বাভাবিকভাবে শেষ হওয়ার পর (বা তার মৃত্যু হলে) তবে পূর্বের স্বামীর সাথে নতুন করে বিয়ে করতে পারবেন।
বিস্তারিত ফিকহি আলোচনা
১. তালাকের সংখ্যা ও প্রকারভেদ
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী তালাক তিন প্রকার:
| প্রকার | বিবরণ | ফলাফল | |--------|--------|--------| | তালাকে রাজয়ী | এক বা দুই তালাক (ইদ্দতের মধ্যে) | ইদ্দতের মধ্যে স্বামী ফিরিয়ে নিতে পারে, নতুন আকদ লাগে না | | তালাকে বায়েন | এক বা দুই তালাক (ইদ্দত শেষ হলে) | নতুন আকদ ও নতুন মোহর ছাড়া ফেরা যায় না | | তালাকে মুগাল্লাযা | তিন তালাক | হিলালা ছাড়া ফেরা সম্পূর্ণ হারাম |
দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন:
الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ
"তালাক দুইবার। এরপর হয় যথাবিধি সংসার ধারণ করা, নয়তো সদ্ভাবে ছেড়ে দেওয়া।" — সূরা আল-বাকারা: ২২৯
فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ
"অতঃপর যদি সে তাকে তালাক দেয় (তৃতীয়বার), তবে সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামী গ্রহণ করে।" — সূরা আল-বাকারা: ২৩০
২. আপনার ক্ষেত্রে তালাক সংঘটিত হওয়ার বিশ্লেষণ
প্রথম তালাক: স্বামী রাগের বশে তালাক দিলে তা পতিত হয়। রাগ তালাক পতিত হওয়া থেকে বিরত রাখে না — এটি হানাফি মাযহাবের সুস্পষ্ট মাসআলা।
রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামি): "রাগের অবস্থায় দেওয়া তালাক পতিত হয়, যদি না রাগ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে ব্যক্তির জ্ঞান লোপ পায়।" — রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুত তালাক, খণ্ড ৩
দ্বিতীয় তালাক: এটিও পতিত হয়েছে। দুই তালাকের পর ইদ্দত শেষ হলে তালাকে বায়েন হয়ে যায়। তবে আপনার স্বামী আপনাকে ফিরিয়ে নিয়েছেন — সম্ভবত ইদ্দতের মধ্যেই, তাই নতুন আকদ ছাড়াই ফিরিয়ে নেওয়া বৈধ হয়েছে। কিন্তু দুই তালাকের হিসাব বহাল থেকেই যায় — ফিরিয়ে নিলে তালাকের সংখ্যা শূন্য হয় না।
তৃতীয় তালাক: স্বামী ফোনে স্পষ্টভাবে বলেছেন: "তোকে আমি ১ ২ ৩ তালাকে বায়েন তালাক দিলাম।"
এখানে দুটি বিষয় লক্ষণীয়:
- "১ ২ ৩" বলার অর্থ — তিনি তিন তালাকই একসাথে দিয়েছেন। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, একসাথে তিন তালাক দিলে তিনটিই পতিত হয় এবং তালাকে মুগাল্লাযা হয়ে যায়।
- "বায়েন তালাক" শব্দটি তালাককে সুস্পষ্ট করে দেয় — এটি কিনায়া (ইঙ্গিতবাহী) নয়, সরাসরি সারীহ (স্পষ্ট) তালাক।
আল-হিদায়া: "যদি কেউ তার স্ত্রীকে বলে 'তুমি তিন তালাকে তালাক' বা 'তোমাকে তিন তালাক দিলাম' — তবে তিন তালাকই পতিত হবে।" — আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক
ফাতাওয়া আলমগিরি: "এক مجلس তিন তালাক দিলে তিনটিই ওয়াজিব হয়।" — ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, কিতাবুত তালাক
৩. ফোনে তালাক দেওয়া কি বৈধ?
হ্যাঁ। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, ফোন, চিঠি, মেসেজ বা কোনো মাধ্যমেই তালাকের শব্দ স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করলে তালাক পতিত হয় — মুখোমুখি হওয়া শর্ত নয়।
রাদ্দুল মুহতার: "তালাকের শব্দ যদি স্পষ্ট হয়, তবে তা ফোনে, চিঠিতে বা দূতের মাধ্যমে পৌঁছালেও পতিত হবে।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, কিতাবুত তালাক
ফাতাওয়া উসমানি: "ফোনে তালাক দেওয়া মুখোমুখি তালাকের মতোই কার্যকর।" — ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, কিতাবুত তালাক
৪. আপনার স্বামীর "ধর্মবোন" প্রসঙ্গে
আপনার স্বামীর এই "ধর্মবোন" পাতানো এবং তার সাথে অবৈধ সম্পর্ক — এটি সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। ইসলামে "ধর্মবোন" বা "ধর্মভাই" নামে কোনো বৈধ সম্পর্কের ভিত্তি নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
"আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।" — সূরা আল-ইসরা: ৩২
মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শাফি): "নামাজ, রোজা ইত্যাদি ইবাদতের পাশাপাশি যদি কোনো ব্যক্তি বেগানা নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক রাখে, তবে তা তার ইবাদতকে ধ্বংস করে দেবে।" — মা'আরিফুল কুরআন, সূরা আল-ইসরা: ৩২-এর তাফসীর
আপনার স্বামী যদি এই সম্পর্ক থেকে তাওবা না করেন, তবে তার সাথে সংসার চালানো আপনার জন্য কঠিন। তবে তালাকের সিদ্ধান্ত আল্লাহর হাতে — আপনি ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
৫. আপনার করণীয়
- তালাক সংঘটিত হয়েছে — এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তিন তালাক পতিত হয়েছে।
- ইদ্দত পালন করুন — তালাকের পর ইদ্দত (তিন হায়েজ বা তিন মাস) পালন করা ফরজ। ইদ্দতের মধ্যে আপনি অন্য কোথাও বিয়ে করতে পারবেন না।
- হিলালা ছাড়া ফেরা সম্ভব নয় — আপনার স্বামী যদি আপনাকে ফিরিয়ে নিতে চান, তবে শরীয়তসম্মত হিলালা ছাড়া তা সম্ভব নয়।
- আইনগত ব্যবস্থা — বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, তালাক রেজিস্ট্রি করতে হবে। আপনার বাবা-মা আইনগত সিদ্ধান্ত না নিলেও, আপনি নিজে পারিবারিক আদালতে তালাকের নোটিশ দিতে পারেন।
- আল্লাহর কাছে তাওবা ও দুআ — আপনি নিজের ভুলের জন্য তাওবা করেছেন, আলহামদুলিল্লাহ। এখন আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং ধৈর্য ধরুন।
বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী): "তালাকের পর স্ত্রীর জন্য ইদ্দত পালন করা ওয়াজিব। ইদ্দতের মধ্যে সে অন্য কোথাও থাকতে পারবে না।" — বাহিশতী জেওর, তালাক অধ্যায়
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | তালাক হয়েছে কি? | হ্যাঁ, তিন তালাক পতিত হয়েছে | | তালাকের প্রকার? | তালাকে মুগাল্লাযা | | ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব? | হিলালা ছাড়া সম্ভব নয় | | ফোনে তালাক বৈধ? | হ্যাঁ, হানাফি মাযহাব অনুযায়ী বৈধ | | ইদ্দত পালন? | ফরজ | | আইনগত ব্যবস্থা? | পারিবারিক আদালতে তালাক রেজিস্ট্রি করা যাবে |
আল্লাহ তাআলা আপনার সমস্যা সমাধান করুন এবং আপনাকে ধৈর্য ও হেদায়েত দান করুন। আমিন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।