তালাকের নিয়ত ছাড়া বলা বাক্য দ্বারা তালাক পতিত হয় কি? "তোমার সাথে সংসার হবে না" বা "চলে যেতে পারো" বললে কি তালাক হয়?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6451
Questioner: Alamin Hossain
Question Asked: 05 Oct 2026, 11:59 PM
Reviewed & Published: 06 Oct 2026, 01:42 AM
Views: 9
Tokens: 4,833
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

2 টা জিনিষ ক্লিয়ার হতে চাই
1. স্ত্রী কে একদিন বলছিলাম যে তোমার সাথে আমার সংসার করা হবে না । মূলত এটা ভবিষ্যৎ এর বাক্য বলা হয়েছে তাই বলে যে পরে তালাক দিবো এরকম চিন্তাভাবনা ছিল না । মূলত অভিমান করে বলছিলাম
এক্ষেত্রে কি আমাদের বৈবাহিক জীবনে কোনো সমস্যা হবে।
2.অন্য একদিন বলছিলাম তোমার ভালো না লাগলে চলে যেতে পারো তখন ও তালাক এর চিন্তা বা নিয়ত ছিল না । আর এভাবে বললে কি স্ত্রী কে অর্পিত তালাক এর ক্ষমতা দেওয়া হয়ে যায় । আমি সেই সময় অর্পিত ক্ষমতা দিয়ে দেওয়া সম্পর্কে জানতাম না ।

Answer

প্রশ্নোত্তর: তালাক সংক্রান্ত দুটি বিষয়ের স্পষ্টীকরণ

ভূমিকা

আপনার প্রশ্নটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে। উভয় ক্ষেত্রেই আপনি স্পষ্ট করেছেন যে তালাকের নিয়ত বা চিন্তা আপনার ছিল না। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে তালাক একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়, যা নিয়ত ও স্পষ্ট শব্দের উপর নির্ভরশীল। নিচে ফিকহে হানাফীর আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


প্রথম বিষয়: "তোমার সাথে আমার সংসার করা হবে না"

বিশ্লেষণ

আপনি বলেছেন যে এটি ভবিষ্যতের বাক্য ছিল এবং অভিমানের বশে বলেছিলেন, তালাকের কোনো নিয়ত ছিল না।

হানাফী ফিকহের মূলনীতি হলো:

তালাক কেবল তখনই পতিত হয় যখন স্পষ্ট তালাকের শব্দ (সরীহ) উচ্চারণ করা হয় অথবা তালাকের নিয়তসহ ইঙ্গিতবাহী (কিনায়া) শব্দ বলা হয়।

আপনার বাক্যটি "তোমার সাথে আমার সংসার করা হবে না" — এটি তালাকের সরীহ শব্দ নয়, বরং এটি একটি কিনায়া (ইঙ্গিতবাহী) বাক্য। কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হতে হলে নিয়ত বা পরিস্থিতির দালালত (contextual indication) প্রয়োজন।

ফিকহী দলিল

রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) এ উল্লেখ আছে:

"কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হয় না, তবে নিয়ত বা হালের দালালত থাকলে পতিত হয়।" — রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুত তালাক

ফাতাওয়া আলমগিরি তে এসেছে:

"কিনায়া ألفاظ এ তালাকের নিয়ত না থাকলে তালাক পতিত হয় না।" — ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুত তালাক, খণ্ড ১

আপনার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত

যেহেতু আপনি স্পষ্টভাবে বলেছেন:

  • ✅ তালাকের নিয়ত ছিল না
  • ✅ এটি অভিমানের বশে বলা হয়েছিল
  • ✅ এটি ভবিষ্যতের বাক্য ছিল

সুতরাং, এই বাক্য দ্বারা কোনো তালাক পতিত হয়নি। আপনার বৈবাহিক জীবনে কোনো সমস্যা হবে না। ইনশাআল্লাহ, আপনার বিবাহ বহাল আছে।

তবে সতর্কতা: ভবিষ্যতে এমন বাক্য বলা থেকে বিরত থাকুন, কারণ শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে এবং পরবর্তীতে নিয়তের বিষয়টি সন্দেহজনক হয়ে যেতে পারে।


দ্বিতীয় বিষয়: "তোমার ভালো না লাগলে চলে যেতে পারো"

বিশ্লেষণ

আপনি বলেছেন যে এই বাক্যটি বলার সময়ও তালাকের নিয়ত ছিল না এবং আপনি অর্পিত তালাকের (তালাক-ই-তাফবিজ) বিষয়ে জানতেন না।

এখানে দুটি দিক বিবেচনা করতে হবে:

১. তালাক-ই-তাফবিজ (অর্পিত তালাক) কী?

তালাক-ই-তাফবিজ হলো যখন স্বামী স্ত্রীকে বলে:

  • "তুমি নিজেকে তালাক দিতে পারো"
  • "তোমার ইচ্ছায় তালাক হবে"
  • "যদি চলে যেতে চাও, তালাক হয়ে যাবে"

এই ধরনের বাক্যে স্ত্রী তালাক দেওয়ার ক্ষমতা পায়। তবে এর জন্য শর্ত হলো:

  • স্বামীর তাফবিজের নিয়ত থাকতে হবে, অথবা
  • বাক্যটি স্পষ্টভাবে তাফবিজ বোঝায়

২. আপনার বাক্যটির প্রকৃতি

আপনার বাক্য: "তোমার ভালো না লাগলে চলে যেতে পারো"

এই বাক্যটি বিশ্লেষণ করলে:

  • এটি তালাকের সরীহ শব্দ নয়
  • এটি তাফবিজের স্পষ্ট বাক্যও নয় (যেমন "তুমি তালাক দিতে পারো" বা "তোমার হাতে তালাক")
  • এটি মূলত অনুমতি বা স্বাধীনতার বাক্য — "চলে যেতে পারো" মানে "তুমি চাইলে চলে যেতে পারো"

ফিকহী মূলনীতি: তাফবিজ সংঘটিত হতে হলে স্পষ্ট তাফবিজের বাক্য অথবা তাফবিজের নিয়ত থাকতে হবে।

রাদ্দুল মুহতার এ এসেছে:

"তাফবিজ তখনই সাব্যস্ত হয় যখন স্বামী স্পষ্টভাবে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করে অথবা তাফবিজের নিয়ত করে।" — রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুত তালাক

ফাতাওয়া উসমানি তে মুফতি তাকি উসমানি সাহেব উল্লেখ করেছেন:

"তাফবিজের জন্য স্পষ্ট বাক্য বা নিয়ত অপরিহার্য। শুধু 'চলে যাও' বা 'যেতে পারো' বললে তাফবিজ সাব্যস্ত হয় না, যদি না তাফবিজের নিয়ত থাকে।" — ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, কিতাবুত তালাক

আপনার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত

যেহেতু:

  • ✅ আপনার তালাকের নিয়ত ছিল না
  • ✅ আপনার তাফবিজের নিয়ত ছিল না
  • ✅ আপনি তাফবিজ সম্পর্কে জানতেন না
  • ✅ বাক্যটি স্পষ্ট তাফবিজের বাক্য নয়

সুতরাং, এই বাক্য দ্বারা স্ত্রীকে অর্পিত তালাকের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। আপনার বিবাহ বহাল আছে এবং কোনো তালাক পতিত হয়নি।


সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বাক্য | তালাক পতিত? | কারণ | |------|------|-------------|------| | ১ | "তোমার সাথে আমার সংসার করা হবে না" | ❌ না | কিনায়া বাক্য, নিয়ত ছিল না | | ২ | "তোমার ভালো না লাগলে চলে যেতে পারো" | ❌ না | তাফবিজের নিয়ত বা স্পষ্ট বাক্য নেই |

উভয় ক্ষেত্রেই আপনার বিবাহ বহাল আছে। ইনশাআল্লাহ, কোনো সমস্যা নেই।


উপদেশ

১. ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন: তালাক, বিবাহ, বা স্ত্রীর অধিকার সংক্রান্ত কোনো বাক্য বলার সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকুন। অভিমানের বশে এমন বাক্য বলা থেকে বিরত থাকুন।

২. নিয়ত পরিষ্কার রাখুন: তালাকের নিয়ত কখনো মনে পোষণ করবেন না, কারণ এটি শয়তানের প্রবেশদ্বার।

৩. আল্লাহর উপর ভরসা করুন: পারিবারিক জীবনে ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বন করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আর তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা নিসা: ১৯)

৪. প্রয়োজনে মুফতি সাহেবের সাথে পরামর্শ করুন: যদি ভবিষ্যতে কোনো সন্দেহ হয়, তবে নির্ভরযোগ্য মুফতি সাহেবের কাছে সরাসরি মাসআলা জিজ্ঞেস করুন।


আরবি দোয়া

اللَّهُمَّ أَصْلِحْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ أَزْوَاجِنَا وَاجْعَلْ بَيْنَنَا مَوَدَّةً وَرَحْمَةً

"হে আল্লাহ! আমাদের এবং আমাদের স্ত্রীদের মধ্যে সংশোধন করে দাও, এবং আমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করে দাও।"


সংক্ষিপ্ত উত্তর

প্রশ্ন ১: "তোমার সাথে আমার সংসার করা হবে না" — এই বাক্যে তালাক পতিত হয়নি, কারণ এটি কিনায়া বাক্য এবং আপনার নিয়ত ছিল না। বিবাহ বহাল আছে।

প্রশ্ন ২: "তোমার ভালো না লাগলে চলে যেতে পারো" — এই বাক্যে তাফবিজ (অর্পিত তালাক) সাব্যস্ত হয়নি, কারণ আপনার তাফবিজের নিয়ত ছিল না এবং বাক্যটি স্পষ্ট তাফবিজের বাক্য নয়। বিবাহ বহাল আছে।

উভয় ক্ষেত্রেই আপনার বৈবাহিক জীবনে কোনো সমস্যা নেই। আল্লাহ আপনার পরিবারকে হেফাজত করুন। আমিন।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.